গারো পাহাড়ের তলায় আমার পাহাড়তলির শহর, মগরা নদীর পাকে পাকে জড়ানো। সারাবছরে আট মাস তার বর্ষার সঙ্গে মিতালি। যখন মগরায় ঢল নামে, মানুষের হাঁস ভাসিয়ে নিয়ে যায়। মাঝে মাঝে ঘরবাড়ি ভেসে আসে, দু-একটা ছাগল গোরুও আসে। টিপটিপ বৃষ্টি পড়ে, জলের ওপর ফুটকি ওঠে। কালীবাড়ির ঘাটে জল তোলপাড় করে ঝাঁপাই সাঁতরাই। বাংলার উত্তর-পূর্বতম প্রান্তে লাল সুরকির পথে যেখানে দাঁড়ালে গারো পাহাড়ের নীলাঞ্জন রেখা সবুজ হয়ে দেখা দেয় সেইখানে পাখপাখালি আর ফলন্ত ফসলের দেশে আমার ছোট্ট মহকুমা শহর, নেত্রকোণা। মেঠো পথ ভেঙে পাহাড়ি আনারস, কমলালেবু, আর চাল নিয়ে যে গাঁয়ের মানুষেরা আসে শনি-মঙ্গলের হাটে তারা বলে, কালীগঞ্জের শহর। নদীর ঘাটে পাটের বোঝা খালি করে দিয়ে রাত্রে নৌকোর মাঝিরা ভাটির দেশের গান গায়। অন্ধকারে জোনাকির তারার মতো ওদের কেরোসিনের পিদিম জ্বলে–ওরা বলে ‘কুপি’। নদীর ধারে দাঁড়িয়ে ওদের ‘ব্যাপারী নাও’-এর কাজ-কারবার কত দেখেছি। ওরা আরও ভাটির দেশের গল্প শোনাত, যেখানে আরও জল, আরও ধান আর ‘উড়া হাঁস’। রাত্রে সেই জলের মধ্যে ‘জিনের বাতি জ্বলে, তখন পিরের নাম স্মরণ করতে হয়, পাঁচ আনার সিন্নি মানতে হয়। না হলে ওই জিনের ‘ভুলা বাতি’ ঘুরিয়ে মারে, চোখে দিশা লাগে। আমাদের এই দেশে বর্ষার প্রকোপটা কিছু যখন কমে, আকাশের বর্ষণ থামে আর মাঠে-ঘাটে যখন জল কলকল করে ছোটে তখন পাহাড় ডিঙিয়ে দূর দেশ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে বুনো হাঁস আকাশে ছায়া ফেলে আসে। গাঁয়ের মানুষ বলে, ‘উড়া হাঁস’।
তাই যদিও আমাদের ওই শহরে তিনটে ছেলে আর একটা মেয়ে-ইস্কুল আছে, আদালত কাছারি আর দু-দুটো ছোটো রেল স্টেশন আছে–যদিও মিটার গেজ লাইনে দিনে দু-বার আসা যাওয়ার ট্রেনে মাছ আর পাট চালান যায়, তবু নেত্রকোণা শহর হয়ে উঠতে পারেনি।
চেষ্টার অন্ত ছিল না। কে কে সেনের মতো জবরদস্ত আই. সি. এস. অনেক মহৎ উন্নয়ন আন্দোলন করলেন, কিন্তু নেত্রকোণার মানুষের গেঁয়োমি কাটল না। মহকুমা হাকিম বৈদ্যনাথন যেদিন শহরের রাস্তায় প্রথম প্রচন্ড লাল ধুলো উড়িয়ে মোটর চালালেন সেদিন বড়োদের আর বিরক্তির সীমা ছিল না। শহরের স্বাস্থ্য সম্পর্কে সেদিন উকিল মহলে ঘোরতর দুশ্চিন্তার কারণ ঘটেছিল। অতঃপর এমনতর দুর্বিপাক আর শহরের ধার ঘেঁষতে পারেনি।
এখানকার মানুষের নিত্যদিন চর্চায় দশটা-পাঁচটার বন্ধন ছিল নগণ্য–তার ভারবাহী ছিল অসহায় ছাত্ৰকুল আর আমমোক্তার মুহুরি-উকিলবাহিনী। আদালত আর ফৌজদারি এজলাসে দিন ছিল অফিসি ঢঙ-এ বাঁধা। আর কোনো অফিস-কাছারির স্থান তখন নেত্রকোণায় ছিল না। যুদ্ধ-দেবতার সন্তান হিসেবে সাপ্লাই আর কন্ট্রোল এবং আরও এবম্বিধ অফিস যখন পক্ষ বিস্তার করল, সে অনেক পরের কথা। সেই নগণ্য সংখ্যকের বাইরে আমরা ছিলাম ভোরবেলা ফেন-ভাত-খাওয়া মানুষ, দ্বিপ্রহরের ভোজনপর্ব সমাধা করতে দেড়টার ট্রেন এসে পড়ত, শুরু হত সায়াহ্নের প্রারম্ভকাল। আহার্যের প্রাচুর্যে যেমন অনটন ছিল না, সময়ের বিস্তৃতিকে সুখের আড্ডায় রসিয়ে তোলারও তেমনি কৃপণতার প্রয়োজন হয়নি। ছোটোবেলায় ইস্কুল যাতায়াতের পথে দেখতাম তেরিবাজারের তেমাথায় অভয়দার চায়ের দোকানে বয়স্ক মহলের ভিড়। সাদা পিরিনে সোনালি পানীয় চা-এর সঙ্গে আমাদের তখনও আলাপ হয়নি। সেখানে কখনো কখনো বৃষ্টি পড়তে আশ্রয় নিয়েছি, দেখতাম নুয়ে-পড়া ঘরের আবছায়া কোণে একদিকে কেটলি ধূমায়মান, অন্যদিকে অভয়দার প্রশস্ত তক্তপোশে গুটিসুটি বসে বারোইয়ারি আলাপে মত্ত বয়োজ্যেষ্ঠ দল। তাঁদের আলোচনার অর্থ বুঝতাম না। কিন্তু তখনই, নেত্রকোণার ছেলে আমরা, বুঝতে শিখেছি যে, এ-রসের তুলনা নেই। যে কহে আর যে শোনে সবাই পুণ্যবান। এঁরা কেউ অভয়দার কাঁথা টেনে, কেউ সিগারেট ধরিয়ে বসেছেন বর্ষার প্রায়ান্ধকার সন্ধ্যায়, নিম্নস্বর গুজব-আলাপনে। ঘর গুলজার। এই অভয়দার চায়ের দোকানের সামনে ছিল আমগাছ একটি, তাতে কদাপি ফল ধরেছে। আমের নামে না থোক, আমতলা ছিল অন্য কারণে শহরের সকল জীবনের কেন্দ্রস্থল। এই অভয়দার ঘরের ভেতরে শীতের রাত্রি আর বর্ষায়, গ্রীষ্মে ও শরতে সম্মুখবর্তী আমতলায় বিশ্ব-রাজনীতি ও ঘরোয়া নীতি নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছে। পরবর্তী বয়সে আমরা আমতলা আর অভয়দার দোকানের উত্তরাধিকার পেয়েছিলাম। কিন্তু তারও পূর্বে আড্ডার অমৃত সুখ আমরা উপভোগ করেছি। কালীবাড়ির দো-মাথার কাছে আমাদের বাড়ির পশ্চিমে রাস্তার পাশেই কাঁঠাল গাছের ছায়ায় ছিল সুখলালের বাঁশের মাচা। আমরা বলতাম,–সুখলালের চাঙাড়ি। সেইখানে নিত্য সকালে আমাদেরও আসর জমত, প্রথম প্রথম সুখলাল তাড়া করত। অবশেষে সেখানে আমাদের অধিকার পাকা হল। সামনের দোকানে পোদ্দার মশাই হাতুড়ি ঠুকতেন, তাঁর ঘর নদীর ঢালু পাড়ে কাত হয়ে পড়েছে। তাঁর ছেলে শ্রীমান রামু ছিল আমাদেরই শাগরেদ। কী যে কথার ভান্ডার ছিল জানি নে, কিন্তু ছুটির দিনে আমাদেরও সেই বেলা একটা। সেখানে খেলার মাঠের দল পাকানো, কাঁচা আম ও লিচু চুরির জল্পনা, সুধীর মুজমদারের গোঁফ, এমনকী যুগান্তরের দাদাদের সেই সব রোমাঞ্চকর আগ্নেয় অভিযানের বিষয়ও ছিল আলোচ্য বস্তুর তালিকায়। রাজনীতি ক্ষেত্রে তখনই আমাদের মতো দশ-বারো বৎসরের অবোধদের প্রবেশাধিকার মিলেছে। সুধীর মজুমদার মশাই হিজলি না বক্সার কোন জেল থেকে সাত-আট বৎসরের সাধনায় বিরাট এবং সামরিক ধরনের একটা গোঁফ নিয়ে ফিরেছেন। তাঁর নেতৃত্বের আর বাধা রইল না। পাড়া জুড়ে সাড়া পড়ল। সাজ, সাজ, সাজ। তখন পর্যন্ত শ্বেতাঙ্গ দর্শনের সৌভাগ্য প্রায় কারুরই হয়নি। কিন্তু হলে কী হবে, নেতাজি সুভাষচন্দ্র হঠাৎ কোথা থেকে একবার এসে পড়লেন, শহরে সে কী হইহই কান্ড! তখন জানা গেল শ্বেতাঙ্গ নামক একদল রক্তপায়ী পশু সত্যই দেশে আছে। আমার কাকু এবং পাড়ার গণেশদা বিপ্লবীদের দু-একটা সত্যি কাহিনি আমাদের শোনাতে শুরু করেছেন। কোথাও কোনো অপরাধ করলে কিংবা লুকিয়ে পান খেলে অথবা তাস খেললে তাঁদের কাছে বকুনি ও উপদেশের সীমা থাকত না। বাড়ির অভিভাবকেরাও তখন ছেলেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে পাড়ার দাদা তথা রাজনীতির দাদাদের কাছেই নালিশ জানাতেন। সব মিলে আমাদের ছোটো শহরের তিনটি জিনিস ওই বয়সেই প্রধান হয়ে উঠল–আচ্ছা, পাড়া ও রাজনীতি। পাড়ার দাদারা ছিলেন বাড়ির এবং রাজনীতি ক্ষেত্রের অভিভাবক। কিছুদিন পরে আরও আট-দশজন দাদা কারাবন্ধন ঘুচিয়ে বেরিয়ে এলেন–দেখতে দেখতে আমতলার আড্ডা গরম হয়ে উঠল! আমাদের ইস্কুল যাওয়ার পথের পাশে তেরিবাজার ও মেছুয়াবাজারের মাঝামাঝি জায়গায় একটা কংগ্রেসের কার্যালয়ও জেঁকে উঠল। কালীবাড়ির নাটমন্দিরে মেয়েদের একটা সভা ডেকে কীসব প্রস্তাব গৃহীত হয়ে গেল। সে সময়ে লাল সুরকির পথের পাশে একদিকে ছিল নদী, অন্য দিকে একসারি বাড়ি, তার পেছনে ধানখেত। আমাদের শহরটা একপ্রস্থ বাড়ি ছাড়িয়ে আর ঘনত্বে বাড়ল না, কেবলই বিস্তৃত হয়ে চলেছিল! এই বাড়িগুলোর পেছন দিকে ছিল আর একটা শানপাতা ছোটো পথ, ধানখেতের পাশ দিয়ে। সে পথটা মহিলাদের অন্তঃপুর থেকে অন্তঃপুরে গতায়াতের যোগসূত্র। ধীরে ধীরে সে পথ ছেড়ে মহিলারা ক্রমশ বেরোলেন সামনের সদর রাস্তায়।
