মহেন্দ্রস্মৃতি পাঠাগারের বর্তমান বয়েস বারো-চোদ্দো বছরের বেশি নয়। গ্রাম ছেড়ে আসার দিনও দেখেছি হাজার দেড়েক বই এবং আনুষঙ্গিক সব কিছু নিয়ে সার্থক হয়ে উঠেছে। পাঠাগারটি। কোনো বিশেষ একজন এ প্রতিষ্ঠান গড়ে দেননি, এটি ছিল সর্বজনের হাতে গড়া। একে কেন্দ্র করেই আমরা ছেলের দল গ্রামের রাস্তাঘাট পরিষ্কার রাখতুম, ছোটোখাটো সড়ক বাঁধতুম। ছোটোবেলা থেকেই ‘সরকারের দিঘি’-র পাড়ে জঙ্গলের মধ্যে একটা ‘কঙ্কালঘর’ দেখতুম। এটাই ছিল বিবেক আশ্রম। শংকর মঠ’-এর আদর্শে ধর্মচর্চার জন্যে এর পত্তন করলেন শচীন কর। তারপরে এল শরীরচর্চা। তারপর সারাদেশের সঙ্গে সৎ ও শক্ত আশ্রমবাসীরা দীক্ষা নিলেন অগ্নিমন্ত্রে। রায়ের ভিটা’-র জঙ্গলে প্রতিষ্ঠিত হল মহেন্দ্র রায়ের বোমার উৎসভূমি। এর পরের কাহিনি গল্পের মতো। শেষপর্যন্ত মহেন্দ্র রায় ধরা পড়লেন মেছোবাজার বোমার মামলায়। কারাগৃহেই তাঁর প্রাণ গেল। …একদিন হঠাৎ স্কুলের মাঠ থেকে সবাইকে তাড়িয়ে নিয়ে এলেন মন্তুদা ‘সরকারের দিঘি’-র পাড়ে। কাঠামোটা না ভেঙে আমরা সবসুদ্ধ আশ্রমগৃহটি মাথায় করে নিয়ে এলুম শিববাড়ি। এ দৃশ্যটি আজও মনে পড়ে। এইটেই আমাদের মহেন্দ্র পাঠাগার। বড়ো পাঠাগার আরও দুটি আছে–একটি নিম-নদিয়া গ্রন্থাগার আর একটি ইউনিয়ন বোর্ডের লাইব্রেরি।
এখন আর একটি কথা ভাবতে বুকটা ফুলে ওঠে। আমাদের চন্ডীমন্ডপে একটি খুঁটির সঙ্গে বড়ো একটা পেরেক ছিল। ন্যাশনাল স্কুলের ব্ল্যাকবোর্ড টাঙানো হত ওইখানে। দুর্গাঠাকুর রং করবার সময় সমস্ত রঙের সেরা রক্তচিহ্ন রেখে দিতুম ওই পেরেকটির চারদিকে একেবারে ছোটোবেলা থেকে। দশভুজার মন্ডপে ওই শক্ত মানুষগুলোকেই মানাত।
ডাকঘরের কথা বলছিলুম। আমরা ছোটোবেলা থেকে ওই ঘরটি একজনের তত্ত্বাবধানেই দেখেছি। এর ‘প্রবেশ নিষেধ’-এর সতর্কবাণীটি অনেককালই মুছে গিয়েছিল। দেখো তো মাস্টার’, বলে মনি অর্ডার প্রত্যাশী অনেকেই ঘরে ঢুকে পড়তেন। ঘরের কর্তা আপত্তি করতেন না।
শিববাড়ির কাছেই নলচিড়া স্কুল। পাশাপাশি চারটি গ্রামের ছেলেদের নিয়ে এ অঞ্চলে এই প্রথম ‘হাই স্কুল স্থাপিত হয়েছিল। প্রায় চল্লিশ বছর আগে ডাক্তার সুরেন্দ্রনাথ সেন এর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তারপর অবশ্য আলাদা আলাদা স্কুল হয়েছে। আমাদের আমলে বিজ্ঞান আবশ্যিক পাঠ্য হল। উদ্ভিদ এবং প্রাণীবিদ্যার আংশিক সরঞ্জাম গ্রামেই জুটে গেল। পদার্থ রসায়নের কিছু যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের তাগিদে। সারাবছর ধরে দেখলাম ওর আলমারি তালাবন্ধই থাকল চাবি খারাপ বলে। ওর একটা জিনিস নষ্ট হলে নলচিড়া স্কুলের পক্ষে যে ভারি বিপদের কথা!
‘সরকারের দিঘি’-র উত্তর-পূর্ব কোনায় জলের মধ্যে অবিরত বুদবুদ উঠত। ওই নিয়ে অনেক কাহিনি আমরা ছেলেবেলায় শুনতাম। তারপর স্কুলে নলকূপ বসাতে গিয়ে গন্ধকের সন্ধান পাওয়া গেল মাটির তলায়। নলকূপের গর্তটার মুখে ফুটো সরা বসিয়ে দেশলাই জ্বেলে দিতুম। খুব জোরে হাওয়া না দেওয়া পর্যন্ত নীল আলো জ্বলত। শাপলার ডাঁটা দিয়ে ওই আলো আমরা স্কুল অবধি নিয়ে যেতুম। অক্সফোর্ড গ্র্যাজুয়েট বিমলদা আমাদের সব পাগলামোর বুদ্ধি জোগাতেন। ভূতুড়ে ব্যাপারটির কিছু হদিশ মিলল বটে। কিন্তু খুব আতঙ্ক এল সবার মনে। গন্ধকের খনি ফেটে নলচিড়া উড়ে যাবে, নয়তো সরকার গন্ধক তুলতে গিয়ে গ্রাম উঠিয়ে দেবেন। বৃদ্ধদের পরামর্শে গর্তের মুখে মাটি চাপা দিতে হল।
আমাদের বাঁশতলার নতুন আমগাছে আষাঢ় মাসে ফল ধরল। জ্যাঠাইমা প্রথম ফলটি দিয়ে পাঠালেন কুতুব শার দরগায়। বড়ো হয়ে দেখেছি গ্রামসুদ্ধ লোক প্রথম ফসল উৎসর্গ করেন ওই দরগার কুতুব শার আশীর্বাদ প্রার্থনা করে। ওই দরগায় একখানা পাথরখন্ডের তলা থেকে কুতুব শার আজান শুনতাম আমরা। কাজে-অকাজে আমাদের ডাক পড়ত। ফাল্গুনী পূর্ণিমায় ওই দরগায় বিরাট মেলা বসত। খেতের ফসল, গাছের ফলমূল, গাই-এর দুধ, যে-যেমন পারত নিয়ে আসত। সব মিলিয়ে জ্বাল দেওয়া হত বিরাট একটা মাটির পাত্রে। ওই প্রসাদ সবাই নিত অসংকোচে। বিজয়া এবং রাসপূর্ণিমার পরদিন ‘সন্তেশ (সন্দেশ)-কলা’ পেতে এবং রাধাকৃষ্ণের দেহাবশেষ’ কুড়োতে আসত হিন্দু-মুসলমান সব ছেলে-মেয়ে।
প্রত্যক্ষ দেবতার ঠাঁইতে পৌঁছেলেই হাতদুটো আপনার থেকেই যুক্ত হয়ে আসত। ঠাকুরের খোলা, রক্ষাচন্ডীর খোলা, হরগৌরীর ভিটে এসবের কথা মনে দাগ কেটে আছে। দেবীদাস বকসির কালীমার ভোগের ‘পাথর’ পুকুরে পড়েছিল কয়েক পুরুষ আগে। পুকুর। সংস্কার করতে গিয়ে এক এয়োতির হাতে পড়ল ওই থালা। মা স্বপ্ন দেখালেন। মানল না ও। তিনরাত না পোয়াতে পরিবারসুদ্ধ নিশ্চিহ্ন হল! প্রতিটি দেবতাকে কেন্দ্র করে এমনি সব অতীত ও চলতি কাহিনির অন্ত ছিল না। অলীক হলেও এসবে লোকের অবিশ্বাস নেই!
‘কালীসাধক মঠে’-র ঠাকরুনকে ভারি ভয় করতুম। বাড়িতে এলে মাঝ উঠোনে উনি বসতেন। বাড়িসুদ্ধ লোক পায়ে পড়ে প্রণাম করতাম। ছোটোবেলা থেকে ওঁকে একইরকম দেখেছি। মাঝে মাঝে ওঁর শিষ্যদের কাছে আমাকে দিয়ে চিঠি লেখাতেন। অরণ্যে রোদন’ কথাটি ব্যবহার করতে হত অনেকবার।
ঠাকরুনের কালীসাধনার গান শুনে ভয় লাগত। কিন্তু লক্ষ্মীকান্তের পদাবলি গান আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। ওঁর চওড়া বুকখানায় অনেকগুলো পদক শোভা পেত। বাংলার জেলায় জেলায় তিনি সম্মান পেয়েছেন। গ্রামে একবার ওঁর কীর্তন হলে অনেকদিন ধরে আমাদের মুখে মুখে তার অনুসরণ চলত-শোনো বুড়িমাই, তোমাকে জানাই আমার মরম কথা। লক্ষ্মীকান্তের মৃত্যুর পরেও এই কীর্তনের দল ভেঙে যায়নি। এই সঙ্গে মনে পড়ে বৈকুণ্ঠ ঢুলিকে। কোনো এক উৎসবে মাছরঙের বিখ্যাত বাজনদাররা এসেছেন। আসর খুব জমে উঠেছে। বৈকুণ্ঠ ঢুলি হাতজোড় করে বললেন,–একটি টোকা কম পড়ছে। পরে দেখা গেল ওর বাঁ-হাতের একটি আঙুল কাটা। পরদেশি বাজনদার গুরু বলে মেনে নিল বৈকুণ্ঠকে। ভ্রমর বয়াতির জারিগান শুনতে চারপাশের গ্রাম পর্যন্ত ভেঙে পড়ত। বাঁশের সাঁকো সেদিন শিথিল হয়ে যেত।
