কালী পুজোর পর দু-দিন ধরে দত্তবাড়ি এবং পালবাড়িতে যাত্রাগান হত। ভোরে উঠে আগের দিনের প্রসাদ নিয়ে হাজির হতুম। দু-বাড়ির আসর এবং সাজঘর সব আমাদের দেখা চাই। আসরের মহারানি সাজঘরে বিড়ি খাচ্ছেন, এইটে দেখার খুব আগ্রহ ছিল আমাদের। আমাদের গ্রামেও যাত্রার দল ছিল। প্রথম অভিনয়ের পরেই ওর অভিনেতাদের নতুন নামকরণ হয়ে গেল। পুজোর পর কালীপুজো অবধি পর পর থিয়েটার চলত। ওই কটা দিন গ্রাম থাকত কোলাহলমুখর! প্রবাস থেকে আসত মানুষ, মফসসলের জমিন থেকে আসত ফসল।
রাধা করাতির নীল পুজোর গান আমাদের মুখস্থ ছিল। মহাদেব-গৌরীর পেছন পেছন আমরা ছুটতুম এই বলে,–‘শঙ্খ পরিতে গৌরীর মনে হইল সাধ।’ সন্ন্যাসের দিন আমাদের আনন্দের সীমা থাকত না। বাস্তুপুজো উপলক্ষ্যে আমরা গান গেয়ে ভিখ নিতুম—’আইলাম লো শরণে, লক্ষ্মীদেবীর বরণে।’ ‘বারোবাঘের লেখাপড়ি’ আমরা খুশিমতো রচনা করতুম। সারাবছর যাঁদের ওপর রাগ থাকত বাঘ বানাতুম তাঁদেরই। দোলপূর্ণিমার আগের দিন ‘বুড়ির ঘর’ পোড়ানো ছিল সবচেয়ে মজার ব্যাপার। সহজদাহ্য সব কিছু লাগত আমাদের এ ‘উৎসবে’। বাগান সাফ হয়ে যেত। বুড়ির ঘরের উচ্চতার পাল্লা দেখে বৃদ্ধরা শিউরে উঠতেন, বলতেন, ‘শেষে এক কান্ড বাধিয়ে বসবি!’
চৈত্র সংক্রান্তির দিন থেকে সপ্তাহখানেক ধরে বিভিন্ন জায়গায় মেলা বসত। মেলা বুঝে আমাদের ‘থৌল-খরচ’ বরাদ্দ ছিল। দক্ষিণপাড়ায় কালীতলার মেলায় মা-জ্যাঠাইমারাও যেতেন। বছরের মশলাপাতি কেনা হত ওইখানে। বছরের পয়লা আমাদের একটা বার্ষিক কর্ম ছিল। গানের বৈঠক বসত।
দেশভাগের কয়েক বছর আগে কলকাতায় নলচিড়া সম্মিলনী গ্রামের সমস্ত কল্যাণকর্মের দায়িত্ব নিল। ষোলো বছর পর জেল থেকে বেরিয়ে শচীন কর সংগঠনের কাজে লেগে গেলেন। সাহেবের চরের বিশ্রামাগার, মেয়েদের হাই স্কুল, মেয়েদের কংগ্রেস, কারিগরি শিক্ষাকেন্দ্র সব গড়ে উঠল। ভেঙেও পড়ল সব কটি বছরের মধ্যেই! রাষ্ট্রদ্রোহী’ শচীন করকে যথাকালে পালিয়ে আসতে হল। স্কুল বিল্ডিং ফাণ্ডের টাকা সেদিন ফিরিয়ে দেওয়া হল। একটি অবৈতনিক পাঠশালা গড়ে উঠেছিল। মাস কয়েক ওতে পড়িয়েছিলুম। ছুটির সময় হলে ছেলেরা বলত, ‘মাস্টারমশায়, জল খেয়ে আসি-ই।’ সে স্মৃতিটুকু সোনা হয়ে রয়েছে।
দেশভাগের পরেও অনেকদিন আদর্শ পাঠশালা, মহেন্দ্র-স্মৃতি পাঠাগার এবং রেডক্রস নিয়ে মেতেছিলুম। একদিন তাড়াহুড়ো করে সব ছেড়ে চলে আসতে হল। সন্ধেবেলা এলাম সাহেবের ঘাটে। স্টিমার এল শেষরাতে। অতক্ষণ আমি কী করেছি? সে সময়কার মনের অবস্থার বর্ণনা দেওয়া সম্ভব নয়। বোধহয় ফাঁসির আগের রাতে অমন হয়।
সেদিন কলকাতায় আমাদের গ্রামের পোস্টমাস্টারমশায়ের সঙ্গে দেখা! উনি আমাদের স্কুলেরও মাস্টার ছিলেন। এক কোম্পানিতে কেরানির কাজ করছেন এখন। সেদিন ওঁর অফিসে গিয়ে দেখি পুরোনো সমস্ত কাগজপত্রে লাল কালির দাগ দিয়ে রেখেছেন, বললেন,–ইংরেজি ভুল। ডিগ্রিবিহীন এ সনাতন শিক্ষকটির স্থান কোথায়?
অগোছালো কথা এখানেই শেষ করি। …বেশি ভাড়া দিয়ে একদিন এক্সপ্রেস বাসে ওঠা গেল। প্রচন্ড বর্ষা। এমনিতেই সতর্কবাণী–বাইরে হাত দিয়ো না। সাবধানিরা জানলার কপাট তুলে দিলেন। ইচ্ছে করেই দাঁড়ালুম পা-দানির ওপর। হঠাৎ একটা স্মৃতির বিদ্যুৎ খেলে গেল মনের আকাশে ভাদ্রমাসে একটা ভরা খাল দিয়ে বাইচের নৌকা বেয়ে চলেছি। বাঁ-হাতে আর পায় ঠেকিয়ে বইঠা, ডান হাতে টেনে তুলছি কলমি শাকের ফুল। বুকটা মোচড় খেয়ে উঠল। অবাক হয়ে ভাবলুম, তাহলে আমার মোট ক্ষতির পরিমাণ কত?
ভূমিকা ও প্রকাশকের নিবেদন – ছেড়ে আসা গ্রাম
সমগ্র বঙ্গদেশ ও বাঙালিকে যাঁরা ভালোবাসেন তাঁদের হাতে
.
প্রকাশকের নিবেদন
ছিন্নমূল মানুষের দুর্বিপাকের কাহিনি নতুন কিছু নয়। সেই মোজেসের কিংবদন্তি থেকে শুরু করে মায়ানমারের রোহিঙ্গাদের ভাগ্যবিপর্যয় অবধি এই ট্র্যাজেডি বহমান। কিন্তু ছিন্নমূল তামিল অথবা ইহুদিদের নিয়ে ইতিহাস যতটা উদবিগ্ন, ততটাই উদাসীন খন্ডিত বঙ্গদেশের উৎপাটিত বাঙালি সম্পর্কে।
১৯৪৭-এর দেশবিভাগ বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনা। ১৯৪৭-১৯৫০ এই তিন বছরে এবং পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টি হওয়ার পরেও প্রত্যেক বছরে যেভাবে লক্ষ লক্ষ বাঙালি বঙ্গদেশের পূর্ব অংশ থেকে পশ্চিমাংশে চলে আসতে বাধ্য হয়েছেন, বিতাড়িত হয়েছেন, তার প্রকৃত ইতিহাস আজও লিপিবদ্ধ হয়নি। শুধু ভারতবর্ষের ইতিহাসে নয়, পৃথিবীর ইতিহাসেও এমন মর্মন্তুদ অপসারণের উদাহরণ আর নেই।
সীমান্তের অপর পারে, নতুন দেশে, তাঁরা হারালেন অতীত স্বীকৃতি, সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ পড়ে রইল স্মৃতি–যে স্মৃতি অশ্রুসজল। শুধু ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হয়ে আসার বেদনা নয়, তাঁদের হৃদয় শোকসন্তপ্ত হয়ে রইল প্রিয়জনকে চিরকালের মতো ছেড়ে চলে আসার দুঃসহ কষ্টে।
দক্ষিণারঞ্জন বসু প্রণীত এই গ্রন্থ পূর্ববঙ্গের আঠারোটি জেলার চৌষট্টিটি গ্রাম থেকে ভূমিপুত্র-কন্যাদের চলে আসার বৃত্তান্তকে ধরে রাখার চেষ্টা করেছে।
গ্রন্থের দুটি খন্ড প্রকাশিত হওয়ার অব্যবহিত পরেই নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়েছিল তদানীন্তন পাকিস্তানে। পরে জিজ্ঞাসা দুটি খন্ডকে একত্রিত করে ১৩৮২ বঙ্গাব্দে প্রকাশ করে। এর চল্লিশ বছর পর এই ২০১৫ সালে পারুল প্রকাশনীর উদ্যোগে পুনঃপ্রকাশিত হল এই মহাগ্রন্থ। তাৎপর্যমন্ডিত এই পুনঃপ্রকাশ নিঃসন্দেহে স্মৃতিমেদুর করে তুলবে পশ্চিমবঙ্গ ও স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ–উভয় বাংলার বাঙালিকেই।
