সাম্প্রদায়িক গোলযোগ আমাদের গ্রামে কোনোকালেই ছিল না, আজও নেই। প্রথম দাঙ্গা আরম্ভের পর, কলকাতার খবর পেয়ে আমাদের গ্রামে গ্রাম্যভাষায় সত্যপীরের পাঁচালির সুরে ছড়া লেখা হয়েছিল। পাঁচালিটি বেশ বড়ো সুতরাং মাঝখান থেকেই একটু বলি,
তোমার ঘরে পানি নেওনা আমি যদি ছুঁই,
গো-জবাইতে বাধা দিলে কাফের কইতাম মুই।
অশিক্ষা কুশিক্ষা আলহে তোমাতে আমাতে
তমো মোরা দুইজনেই আলহাম হাতে হাতে।
রাজায় রাজত্ব হরে পেরজার চৌহে ঝরে পানি,
অধর্মেরই ছুরি খাইয়া অইলাম রে অয়রানি।
তবু সে আজ আমাদের ছেড়েআসা গ্রাম। সে-গ্রাম ছেড়ে আসতে পা কি চলতে চায়, বার বার পেছন ফিরে ঝাপসা চোখে চেয়ে চেয়ে দেখেছি, কেবল দেখেছি। দু-একজন মুসলমান প্রজা সঙ্গে সঙ্গে স্টেশন অবধি এসেছিল। খালাসিরা সিঁড়ি ফেলল। ওপারে ধানের খেত। নৌকাগুলো ঢেউয়ের আঘাতে আছাড় খাচ্ছে, মাঝিদের কোলাহল, সন্ধে আকাশে একঝাঁক পাখি কোথায় উড়ে গেল, দিগন্তে পান্ডুর সূর্যাস্ত। কেঁপে কেঁপে স্টিমারের বিদায়ের বাঁশি বেজে ওঠে। ঘাট নোঙর ছেড়ে দেয়। দু-ফোঁটা চোখের জল, বুকভরা অশান্ত কান্না। তারপর শহর। এখানে আমরা যেন কোনো ভিন্ন জাতি, সভ্যতার একটুকু বিলাসবসনের চিহ্ন যাদের দেহে নেই, তাদের সারামুখে দেখা দেয় একটা অপমৃত্যুর বিভীষিকার ছায়া। আর সেখানে দু-শো বছরের পুরোনো বটকে যেন কেউ সমূলে উপড়ে ফেলেছে, সেখানে খাঁ খাঁ করে একটা বিরাট শূন্যতার গহর। সেখানকার সন্ধের নিশাচর বাদুড়েরা গ্রামের ওপর দিয়ে উড়ে যেতে যেতে আর কোনো কচি কচি গলার সুরে শোনে না,
বাদুড় ভাই, বাদুড় ভাই, তুমি আমার মিতা,
আমারে ফেলাইয়া যে ফল খাবা,
সে ফল তোমার তিতা তিতা তিতা!
সত্যি, আমার গাঁয়ের প্রিয় পশুপাখিরা কীভাবে আমাদের কথা, তারা কি আজও মনে রেখেছে আমাদের? আমরা যে কিছুতেই ভুলতে পারি না তাদের, ভুলতে পারি না আমার গাঁয়ের সে মাটি, সে জল, সে গাছপালা ও সে মিষ্টি বাতাসকে! আবার কবে ফিরে যেতে পারব তাদের মধ্যে?
.
নলচিড়া
‘মোট ক্ষতির পরিমাণ কত?’ প্রশ্ন করেছেন সরকার। উদবাস্তু শরণার্থীদের ছেড়ে-আসা ভিটেমাটিতে মোট ক্ষতির পরিমাণ কত তা জানাতে হবে সরকারকে। গণিতের হিসেবে চিরকাল আমি কাঁচা। সাহায্য নিয়েছিলুম কোনো বন্ধুর। সত্যি, কত নম্বর মৌজায়, কত নম্বর খেবটে আমার কী ধরনের স্বত্ব, সে-খবর কোনোদিন রাখিনি। আমার সম্পত্তির অবস্থান এবং আমার স্বত্ব বোঝাতে গেলে যতখানি জ্ঞানবুদ্ধি প্রয়োজন, আমার তা কোনোদিনই ছিল না। কিন্তু গোটা নলচিড়াকে এত ভালো করে চিনি যে তার সম্পর্কে কিছুমাত্র ভুল হয় না।
আড়িয়ালখাঁর দক্ষিণ তীরে সাহেবের চর থেকে আমাদের এই গ্রামের পত্তন। সদর থেকে মাইল কুড়ি উত্তরে। পড়শি গ্রামের সঙ্গে আমাদের সীমানা ছোটোখাটো নিশানা দিয়ে। আমাদের গ্রাম থেকে মাহিলাড়া পেরিয়ে অশ্বিনী দত্তের বাটাজোড় মাইল পাঁচেক হবে। অনেক উপলক্ষ্যেই যাওয়া হত সেখানে। সবচেয়ে উৎসাহ পেতাম লক্ষ্মীপুজোর দিন জলপদ্ম আনতে গিয়ে। জেলাববার্ডের সড়কে দু-মাইল এগিয়ে একটা সোতা পেতুম। পার হয়ে বলতুম, পৌঁছোলাম ভিন গাঁয়ে। এমনি সব সীমানা।
একেবারে অচিন গাঁয়ের অধিবাসী আমরা নই। তিমির তীর্থের সাহিত্যিক যে দেশের মাটিতে প্রণাম রেখেছেন, সে আমাদের সবার তীর্থভূমি। বাইরের সঙ্গে তাঁর গ্রামকে একালে তিনিই যুক্ত করে দিয়েছেন। আমাদের ইতিহাসের কথা আমরা মুখে মুখে রক্ষা করেছি। সংস্কৃতচর্চার একটি কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল নলচিড়া। এক ভটচায্যি বাড়িতেই চোদ্দোটি টোল ছিল। নবদ্বীপে না গিয়ে অনেকে আসতেন এ গাঁয়ের দিগবিজয়ী পন্ডিত জগন্নাথ তর্কপঞ্চাননের কাছে। বিশেষ করে তাঁরই গৌরবে নলচিড়া ‘নিম্ন-নবদ্বীপ’ বলে খ্যাতি পেয়েছিল। গোটা গোটা আমলকীর লোভে আমরা যেতুম ‘নাক কাটা বাসুদেব’-এর বাড়ি। ও বাড়ির পুকুর পাড়ে একটি খন্ডিত বাসুদেব মূর্তি ছিল। শুনেছি নলচিড়ার এমন আরও কয়েকটি শিলামূর্তি এবং শিলালিপি ঢাকা মিউজিয়মে রক্ষিত হয়েছে। এসব অতীত ইতিহাস নিয়ে গৌরব করতাম। কিন্তু যে ক্ষতি সহ্য করছি তা প্রকাশের মতো ভাষা কোথায়? আমাদের সর্বাঙ্গে মাখানো থাকত গ্রাম-মায়ের স্নেহের পরশ। এখনও মাঝে মাঝে হাবার মতো কলকাতার রাজপথে তাই খুঁজে খুঁজে বেড়াই।
সদর থেকে ডিঙিনৌকা অবশ্য বাড়ির ঘাটেই পৌঁছে দিত। কিন্তু ‘গয়না’-র নৌকা দাঁড়াত শিববাড়ি ঘাটে। সমস্ত গ্রামখানার মধ্যে এই এলাকাটুকুরই একটা বিশেষ আকর্ষণ ছিল। একটি শিবমন্দির, খানকয়েক মুদি দোকান, একটি ডাকঘর এবং একটি পাঠাগার। এর যেকোনো একটিকে উপলক্ষ্য করেই গাঁয়ের লোক এখানে জড়ো হতেন, রসিকজন বিনা উপলক্ষ্যেও আসতেন। শিবমন্দিরটির মূলকাঠামো জ্যান্ত বটগাছের না ইটপাথরের বোঝা যেত না। ছেলেদের বসবার জায়গা ছিল ওর ফলন্ত ডালগুলো আর না হয় গাছটার বাড়ন্ত শিকড়গুলো। বুড়োরা এ খালপারের তেঁতুল গাছটিকে নিষ্ফলাই বলতেন। ছেলেদের দৌরাত্মে এর ফলের মাহাত্ম্য তাঁরা টের পেতেন না। মুদি দোকানের বৈঠক কখনো ক্ষান্ত হতে দেখিনি। গ্রামের সালিশি থেকে আরম্ভ করে কীর্তনের মহড়া সবই চলত এইখানে। গ্রামের সব কথার মোহানা এই শিবতলায়। বিকেলের দিকে অনেকে বসতেন পাঠাগারের সামনে। দু-দিনের বাসি খবরের কাগজ পৌঁছোত। আর তাই নিয়েই চলত যত পঠনপাঠন সমালোচনা।
