গ্রামের দক্ষিণে গভীর জঙ্গল। সেখানে ছোটো-বড়ো এলোমেলো ছায়াঘন গাছের অন্ত নেই। জায়গাটিকে বলে ‘পরান শীলের বাড়ি। এখানে প্রাচীন হরীতকী গাছের তলায় মস্ত উইটিপি আর আশপাশে ঘুরে ঘুরে পাহারা দেয় মস্ত মস্ত সাপ। কোন কালের সঞ্চিত ধনসম্পত্তি নাকি আছে ওই উইঢিপির মধ্যে। বর্ষাকালে এখানে বড়ো বড়ো বাঘের থাবার চিহ্ন পড়ে।
শীত আসে। শেষরাত্রে পাতায় পাতায়, টিনের চালের এখানে-ওখানে থেমে থেমে, মোটা মোটা টুপ টাপ টং টং শিশির ঝরার শব্দ শোনায়। ঘাসের শিশিরে দু-পা ভিজে যায়। নীরব সন্ধ্যায় ল্যাজঝোলা ‘শিয়ালি’ কোথায় যেন টুক টুক টুক টুক করে খেজুর গাছ কাটে! খালের স্বচ্ছ জলে গাছের সারি চুপচাপ মুখ দেখে, আর কেউ কোনো নৌকা বেয়ে গেলে তাদের ছায়াগুলো যেন খিলখিল করে হেসে ওঠে। ক্রমে রাত্রি হয়, মাঝে মাঝে ‘আওলা দানো’ বা আলেয়া ভূত নামে।
শীতের মাঝামাঝি গ্রামে বাঘ-পুজো হয়। জঙ্গলের পথে পথে সন্ধের পর মশাল জ্বেলে ছেলে-মেয়েরা বেরোয়, আর বুধাই শীলের পাঠশালার নামতা পড়ার মতো সুর করে একজন আগে বলে ও পড়ে আর সবাই—
আইলাম রে শরণে,
লক্ষ্মীদেবীর বরণে,
লক্ষ্মীদেবী দিলেন বর,
চাউল কড়ি বিস্তর।
চাউল না দিয়া দিবেন কড়ি,
ঠিক দুয়ারে সোনার লরি;
সোনার লরি রূপার মালা,
পাঁচ কাঠালে সোনার ছালা।
একটি টাকা পাই রে–
বানিয়া বাড়ি যাই রে।
এর পর তারা বারো বাঘের ছড়া বলে,
এক বাঘ রে এক বাঘ রাইঙ্গা,
ঘর ফালাইল রে ঘর ফালাইল ভাইঙ্গা;
আর বাঘ রে আর বাঘ চৈতা,
বাওন মারইয়া রে বাওনের নিল পৈতা,
আর বাঘ রে আর বাঘ নৈচৈ
গোয়াল মারইয়ার গোয়াল মাইরা খাইল দই।–ইত্যাদি।
পুজোর দিন উঠোনে, বড়ো বড়ো বাঘা-বাঘিনি এঁকে মেয়েরা হলুদগুঁড়ো চালগুঁড়ো সরষে কালোজিরে–এসব দিয়ে বাঘের গা করত চিত্ৰবিচিত্র। সে-দিন ঘরে ঘরে আলো জ্বালা হত না। সবাই পুজোর চিড়ে পেটভরে খেয়ে রাত কাটাত।
কোজাগরী লক্ষ্মী পুজোর দিন এবাড়ির ওবাড়ির মা কাকিমা বউদি বোনদের সারাদিন উপুড় হয়ে ঘরজোড়া রুচিশুভ্র আলপনা দেওয়া দেখতাম। দেশের মা দুর্গার কী টানা টানা চোখ! আমরা কুমোরদের বলি ‘গুণরাজ’। আমাদের জানকী গুণরাজ কালা। জোরে না বললে সে শোনে না, কিন্তু কথা নিজে বলে খুবই আস্তে। সে এমনি কাটা মোষের মাথা তৈরি করে উঠোনে রাখত যা দেখে শকুনি উড়ে পড়ত। নিজের হাতের কনুইয়ের কাছটা ঠোঁটে লাগিয়ে জানকী ইশারায় তামাক চাইত। পুলঘাটায় গুণরাজের মাটির নৌকো আসে। সেখানে ছেলেদের কী জমাট জমায়েত। পুলের কাছেই বোসেদের দিঘি আর হাটখোলা। দূরে দূরে কলাপাতার ঘোমটাটকা লাজুক সব কুটির। ও-পাড়ে ময়াল সাপের মতো শেকড়-জড়ানো ভ্রূকুটি-কুটিল বাদামগাছের ডালে ডালে শকুনিরা চোখ বুজে ঝিমোয়। বাড়ি আসার সময় এখানে নেমে কোনো গ্রাম্য বৃদ্ধকে দেখে প্রণাম করতে হত। এখানে নেমেই মনের পর্দায় ভেসে ওঠে,–মা ভিজে চুল পিঠে মেলে উনুনে ফুঁ দিচ্ছেন। কাকিমা আর বউদি টেকি পাড় দিতে দিতে হাসছেন। পিসিমা উঠোন ঝাঁট দিতে দিতে সবে কোমর সোজা করে দাঁড়ালেন, সোনাভাই দাঁতহীন ঠোঁট নেড়ে পুকুরের জলে জবাফুলের পর জবাফুল ভাসিয়ে চলেছেন, কামিনী আর স্থলপদ্ম গাছের ফাঁকে ফাঁকে। আমাদের কোথাও যাত্রাকালে এই পুলঘাটা অবধি ঠাকুরদাদা মন্ত্র উচ্চারণ করতে করতে আসতেন–’ধেনুর্বৎস প্রযুক্তা, বৃষগজতুরগা দক্ষিণাবর্ত বহ্নি’…
চা খাওয়ার রেওয়াজ আমাদের গ্রামে নেই। কিন্তু প্রত্যেক বাড়ির বাইরের বারান্দায়, এক তাওয়া আগুন, একতাল তামাক, কয়েকটি করে কলকে আর কো–এ থাকবেই। তাওয়াটিতে চব্বিশ ঘণ্টাই আগুন থাকে। মেয়েরা গন্ধক কাঠি তৈরি করে রাখে এবং দেশলাইয়ের পরিবর্তে ওই গন্ধক কাঠির সাহায্যে তাওয়ার আগুনে আলো জ্বালানোর কাজ চলে।
অতিথিপরায়ণতা গ্রামবাসীদের মজ্জাগত। কৃচিৎ কোনো লোকের সঙ্গে দেখা হলে তার চোদ্দো-গোষ্ঠীর সংবাদ জিজ্ঞেস করা এদের স্বভাব। নেহাত অতিথি হিসেবে সে যদি নাও থাকতে চায় অন্তত একছিলিম তামাক তাকে খেতেই হবে। ভাড়ার নৌকোকে আমাদের ওদিকে বলে ‘কেরায়া নাও”। এই কেরায়া নাও-এর যাত্রীদেরও এ ব্যাপারে রেহাই নেই। এসব মনগুলো শহর কলকাতায় এসে যে কী অবস্থায় পড়ে কী রূপ পরিগ্রহ করবে, তা ভাবতে গিয়ে থেকে থেকে একটা কান্নার দমকা আমার বুক-গলা পর্যন্ত ঠেলে ওঠে, চোখ ভিজে আসে।
সেসব থেকে থেকে পাখি-ডাকা গভীর রাত্রের নীরব শিহরন আর আমাদের কানে আসবে না। ‘অক্কু’র ডাকে ডাকে রাত্রির যাম আর গুনতে হবে না। চিলের মতো এক প্রকার পাখি অকু। পুকুর পাড়ের উঁচু তালগাছে থাকে। ঝড়-ঝঞ্ঝা বাদল-বৃষ্টি যাই হোক-না-কেন সন্ধের পর থেকে প্রতি চার প্রহর পর পর এরা ডাক শোনাবেই। এদের কণ্ঠ সবার ওপরে। দিনের বেলা ছায়া মেপে সময় নির্ণয় করার প্রথা আমাদের ওদিকে বিশেষ প্রচলিত। ছায়া মেপেই ঘড়ি ঠিক রাখতে হয়।
পদেতে মাপিলে ছায়া যত পদ হবে,
দ্বিগুণ করিয়া তাহে চৌদ্দ মিশাইবে।
এর পরের লাইন দুটি মনে নেই, তাতে বিশেষ ক্ষতিও নেই। ছায়া যত পা, তাকে দুই দিয়ে গুণ করে চোদ্দো যোগ করে তাই দিয়ে ২৯২কে ভাগ দিলে দন্ড হয়, আড়াই দন্ডে এক ঘণ্টা।
