এককালে কোনো শক্ত জমিদার এই কয়েকখানি গ্রাম বসবাসের জন্যে নির্দিষ্ট করেছিলেন। তাই কয়েকটি খুব বড়ো বড়ো দিঘি দেখতে পাওয়া যায়। চন্ডীদাসের দিঘি সবচেয়ে বড়ো। তার চারদিকে এখন গা-ছম ছম-করা অরণ্য আর শীতল স্তব্ধতা। দূর কুটিরের টেকিপারের ঠুকঠুক শব্দ-লাগা প্রচন্ড দুপুর ঝিমুতে ঝিমুতে কেঁপে কেঁপে ওঠে। খেজুর ফুলের গন্ধভরা নিরিবিলি পায়েচলা পথ রোদে ঝাঁঝরা শেওলাখোলার পাশ দিয়ে চন্ডীদিঘির ছায়া মেখে কোথায় যেন চলে গেছে! এ দিঘির পারে বসে শ্রান্ত পথিক তার কো-কলকেটি বের করে নিয়ে বুটুর বুটুর তামাকটানা সুর শোনায়। তারপর রাজাবাড়ির দিঘি। এখানে বড়ো বড়ো মেঘডম্বুর সাপ অনেক মারা হয়েছে। দিঘিটি জমাট ঝোপে ঢাকা। তার ওপর গোরু চরে বেড়ায়। কিন্তু পৌষসংক্রান্তির দিন থেকে এক পক্ষকালের জন্যে সব ঝোঁপ তল পড়ে। এর বৈজ্ঞানিক কারণ কী তা জানা যায়নি। তবে ঘটনাটি অনেকবার দেখা। তৃতীয়টি সম্প্রতি আঁধি। চারধারে হোগলা, ভেতরে ফণাধরা সাপ আর জলপদ্ম। পাড় খুব উঁচু, সেখানে ছেলেদের খেলবার মাঠ। সুপুরির সময় এখানে চটি পড়ে। শ-খানেক গোল গোল চকচকে বঁটি, আঙুলে ন্যাকড়া জড়িয়ে লুকা জ্বালিয়ে চটির লোকরা কাজ করে আর গান গায়। এক-একটি বড়ো বড়ো চালান শেষ হবার অবসরে গান হত ‘গুণাবিবির পালা। রাত-মাতানো হইহই আর কী বেদনা সে-কণ্ঠে,
ও নাথ, গুপ্ত হন গুপ্ত হন
পুলিশ এসেছে,
আপনার চাচা ধলু মেয়া এজাহার দিছে।
আবার গেয়েছে,
ও–গুণা, গুণা গো,
আর কেন্দো না, কেন্দো না, দেশে চলে যাও,
নয়লাখ টাকার জমিদারি বেচে বেচে খাও।
গ্রামের ছেলে-মেয়েদের মুখে মুখে কিছুকাল পর্যন্ত এসব গানই চলতে থাকে। শোনা যায়, এককালে এ গ্রামের ভোজ উৎসবের সব বাসনপত্র এই দিঘির জলে ভেজানো পাওয়া যেত, ভোজশেষে তা আবার দিঘিকে ফিরিয়ে দিয়ে যাবার প্রথা ছিল। কিন্তু কোনো শাশুড়ির শ্রাদ্ধের নেমন্তন্নের পর কোনো বউ নাকি দু-একটি বাসন লুকিয়ে রেখেছিল, তারপর থেকে আর কেউ কিছু পায় না। এই জলে নাকি এক-একরকম মাছ দেখা যায়, তাদের মাথায় ধূপদানি, কপালে টকটকে লাল সিঁদুর।
কেউ কেউ বলে, এসব গ্রামে আগে নাকি গভীর অরণ্য ছিল, আর একদল ডাকাতই ছিল এখানকার আদিম বাসিন্দা। কথাটা হয়তো মিথ্যে নয়। কারণ সমস্ত গ্রামটিতে দুর্গা পূজা অপেক্ষা কালীপূজারই বেশি ধুম। প্রায় বাড়িতেই, আমাদের বাড়িতেও, প্রাচীন আমলের বড়ো বড়ো ঢাল সড়কি এখনও অনেকগুলোই আছে। ঠাকুরদাদা হাঁটু ভেঙে একহাতে বড়ো বড়ো মোষ বলি দিতেন। সুগভীর রাত্রিতে ঘড়ি-ঘণ্টায় ঘুম ভেঙে পুজোমন্ডপ থেকে ঠাকুরদাদার কালীপুজোর মন্ত্র উচ্চারণ শুনতাম। ওঁ হ্রীw প্রভৃতি এক-একটি শব্দের ঝংকারে ঘরের কড়িকাঠগুলো যেন ঝন ঝন করে কেঁপে উঠত। গ্রামের নর বা ঢোলবাদকরা একত্রে এক এক বাড়ি করে বাজনা বাজায় ও আলতি হয়। যারা শোলার ফুল তৈরি করে, তাদের বলে বনমালি। বনমালি সব বাড়ি বাড়ি আলতির সময়ে ভাঙের ব্যবস্থা নিয়ে আসে। সমস্ত গ্রামের লোক একত্রে এক-এক বাড়ির প্রতিমা বিসর্জন দেয়। পুজোয় কে কত বড়ো শিংওয়ালা ছাগ বলি দিল এ ব্যাপারটি ছাড়া আর সব ব্যাপারেই সারাগ্রামের অদ্ভুত একতা। কোনো বাড়ির নেমন্তন্নর ব্যাপারে প্রত্যেক বাড়ির পুকুর থেকেই নির্বিবাদে চলত মাছ ধরার উৎসব। কোনো বাড়ির জামাই এল তো এ যেন সারাগ্রামখানারই জামাই এল, তখন গ্রামসুদ্ধ প্রত্যেক বাড়িতেই একটা সুন্দর সুলজ্জ পরিচ্ছন্নতা দেখা যেত।
গ্রামের কালীবাড়িটি গভীর অরণ্যের মধ্যে। প্রতিবছর পুজোর পাঁচ-সাত দিন আগে থেকে জঙ্গলে আগুন লাগানো হত। নির্দিষ্ট দিনে পূর্ববছরের প্রতিমা ভাসান দেওয়ার বিধি। পুজো হয় পূর্ণিমার দিন। গাঁয়ের ‘তিন মাথা লোকেরা এই পুজোর দিন ঠিক করেন। শতাধিক বছর আগের কালীমন্দির! বট-অশ্বথের শেকড় জড়ানো তার আপাদমস্তক। কালের হাওয়ায় সর্বাঙ্গের ইটচুন গেছে খসে, তাই ইদানীং সেটি একটি সুদৃশ্য শেকড়ের মন্দির-গুহার রূপ ধারণ করেছে। তার মধ্যেই আবার বেল গাছ, জবাফুল গাছ, কচি দূর্বার ছড়াছড়ি।
গ্রাম্য ব্রাহ্মণ কায়স্থ শূদ্র সবাই গোঁড়া puritan, কিন্তু এই পুজোর দিনের প্রথা অনুসারে, বাল-বৃদ্ধ পন্ডিত-মূর্খ ব্রাহ্মণ-শূদ্র সবাই একত্রে গা ছুঁইয়ে প্রসাদ খেতে বসে। মাংস দিয়ে খিচুড়ি আর পায়েস। সেদিন গ্রামের কোনো বাড়িতেই রান্না হয় না। সবাই উবু হয়ে খেতে বসে। প্রথমবারের পরিবেশন হলেই ঘোষাল একটা উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে হাঁক দিয়ে বলে–‘ও ভাই সাধু!’ সবাই তখন সমস্ত শরীরে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বলে- ‘হেঁইও’, ঘোষাল বলে–’ডাইল খাইলা’, সবাই—’হেঁইও’, ঘোষাল—’তরকারি খাইলা’, সবাই—‘হেঁইও’, এইভাবে।
আরও খাইলা ভা–জি,
হেঁইও, হেঁইও, হেঁইও!
মহামায়ার,
হেঁইও!
পেরসাদ খাইয়া,
হেঁইও!
মন করিলা রাজি–
হেঁইও, হেঁইও, হেঁইও।
এই হইহুল্লোড় হাসাহাসিতে পেটেরটা হজম হয়ে যায়। তখন আবার পরিবেশন চলতে থাকে। এর কারণ, এই প্রসাদ কেউ পাতে ফেলতে পারবে না, আবার সম্পূর্ণ পেট না ভরে খেলেও চলবে না। তাতে নাকি বংশে কলেরা হওয়ার সম্ভাবনা আছে, অন্তত এর পরবর্তী ছড়াটি তো তাই বলে।
