সেবারের শীতকালের একটি মজার ব্যাপার বলবার লোভ সামলাতে পারছি না। ডিসেম্বরের কনকনে শীত; সকলে মিলে বকুলতলার খালে মাছ ধরা হচ্ছে, এই মাছ ধরা ছিল আমাদের বড়দিনের উৎসবের একটি অঙ্গ। হঠাৎ খবর এল গ্রামে বাঘ এসেছে। দল বেঁধে চললাম সেই অকুস্থলে। চাক্ষুষ দেখার পর স্থির করলাম, তিনি একটি ক্ষুদ্র সংস্করণের নেকড়ে ছাড়া আর কিছুই নন। কিন্তু সেই ক্ষুদে নেকড়েই আমাদের গ্রামে যে নাটক অভিনয় করে গেলেন তার মধ্যে করুণ ও হাস্যরস দুই-ই ছিল, আঠারোটি লোক ঘায়েল হয়েছিল তার সঙ্গে লড়াইয়ে। মরতে মরতে বেঁচে গেছে তারা। এটাই ছিল করুণরস। হাস্যরসের কথা উল্লেখ করতে সত্যি আজ হাসি পায়। চার-পাঁচজন বীরপুঙ্গব যারা তাদের পাকা শিকারি বলে গ্রামে জাহির করত, তারা তাদের সম্মিলিত চেষ্টা দ্বারাও শেরের বাচ্চার কিছুমাত্র ক্ষতি করতে পারেনি, যতবারই তারা দু-তিনজন একসঙ্গে গুলি চালিয়েছে বাঘের গায়ে, ততবারই দেখা গেছে ব্যাঘ্রমশায় তার লাঙুলটি নাড়তে নাড়তে বহাল তবিয়তে অন্য ঝোপে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। সারাদিন ধরে সংঘবদ্ধভাবে আক্রমণ করা হল কিন্তু সবই ব্যর্থ, সবই বৃথা। শেষদিকে কয়জন শিকারি বাঘের হাতে সাংঘাতিকরকম জখম হয়ে বাঘ মারার বাহাদুরি নেওয়ার আশায় জলাঞ্জলি দিয়ে হাসপাতালে আশ্রয় গ্রহণ করল! আর সন্ধের অন্ধকারে ব্যাঘ্র মামাও তার এ গ্রামের লীলা সাঙ্গ করে বহাল তবিয়তে অন্য গ্রামে গিয়ে লীলাখেলা আরম্ভ করলেন!
এমনি কত ঘটনা আজ মনে পড়ছে। ‘নীল খেলার মাঠে’ ফুটবল খেলা, সন্ধের অন্ধকারে ‘ধরের ভিটা’য় দল বেঁধে ডাব চুরি করতে যাওয়া, আরও কত কী! বেচারাম ধুপী চৌকিদারি করত, শাসাত। কিন্তু ডাব নিয়ে যেতে বাধা দিত না বড়ো একটা। শৈশবের এসব কাহিনি ভুলতে পারি না। মনে পড়ছে গ্রীষ্মের দুপুরে বটগাছের ডালে বসে টোটাল পাখি একটানা সুরে টুপ টুপ করে গেয়ে যাচ্ছে। ঘুঘু-ডাকা অলস দুপুর। গ্রামের ছায়া-সুনিবিড় এক-একটা বাড়ি। তেমনি নীরব নিরালা বাড়িতে বসে সে-ডাক শুনতে কী ভালোই না লাগত! আজ সেসব হারিয়ে শহরে এসে মাথা গুঁজবার ঠাঁই খুঁজছি, তাও মেলে না। এই অনাদৃতদের আবার ঘরে ডেকে নেবে কে? অসহ্য বেদনায় আজ কেবল কবি বিহারীলালের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে বলতে ইচ্ছে হচ্ছে,
সর্বদাই হুহু করে মন,
বিশ্ব যেন মরুর মতন,
চারিদিকে ঝালাফালা
উঃ কী জ্বলন্ত জ্বালা!
অগ্নিকুন্ডে পতঙ্গ পতন।
এ অগ্নিকুন্ড থেকে আমাদের কি উদ্ধার নেই? পতঙ্গের মতোই কি আমরা শুধু আত্মাহুতি দিয়ে যাব? কিন্তু কোন মহত্তর কল্যাণের জন্যে এই মৃত্যুযজ্ঞ? সমগ্র দেশের ভিত যে কেঁপে উঠছে এ বীভৎসতায়!
.
সৈওর
সুগন্ধা নদী। সুদর্শন চক্রে গৌরীর খন্ডিত নাকটি এই নদীগর্ভে পড়েছিল। ভোর হয়ে আসে। দাঁড়কাকের টানা-টানা থামা-থামা ব্যথা-গম্ভীর ডাক, কোকিলের অশান্ত কাকলি। আকাশছোঁয়া টেলিগ্রাফের তার। বাঁ-দিকে ‘সুতালরি’র মাথা ভাঙা মঠ। সুতালরির পোশাকি নাম ‘সূত্রলহরি’। মাথা ভাঙা কেন? কোন সন্তান মায়ের চিতায় এই মঠ তোলা শেষ হলে বলেছিল, শোধ করলাম মাতৃঋণ, অমনি ভেঙে পড়ল মঠের মাথা। সত্যিই তো, মাতৃঋণ কী কেউ কখনো শোধ করতে পারে?
আমাদের গ্রামটি যেন স্বয়ংসম্পূর্ণ। সেখান থেকে কখনো কেউ বিলেত যায়নি, সে-গ্রামে কোনো কোঠাবাড়ি নেই, এম. বি. ডাক্তার নেই, কোনো বাড়িতে চাকর পর্যন্ত নেই, কোনো ক্লাব নেই, লাইব্রেরি নেই, পলিটিক্যাল পার্টি নেই। এমন একটি গ্রামের কথা বলতে বসেছি, যে গ্রামের লোকদের মন আজও শহর থেকে অনেক অনেক দূরে।
সামনেই নলচিটি। ছবির মতো ছোট্ট পন্টুনখানা। নদী এখানে আরও চওড়া। পাড়ে পাড়ে স্টিমারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে, আলো-নেভা লণ্ঠন, সড়কি-বলয় আর চিঠির ঝোলা কাঁধে ‘রাণার ছুটেছে, রাণার’। স্টেশনের ওপারে ষাটপাইকা গ্রাম। ওখানে নাকি একদা ষাটজন বিখ্যাত পাইকের বাস ছিল।
এখানে নেমেই ধরতে হয় আমাদের গ্রামের পথ। কিছুটা পথ হেঁটে অথবা বর্ষাকালে নৌকায় যেতে হয়। অন্য সময় খালগুলো কচুরিপানায় ঠাসা থাকে। যারা গ্রামে যায়নি, ফুটে থাকা কচুরি ফুলের খবর তারা জানে না। পার্ক স্ট্রিট রিফিউজি ক্যাম্পে থাকার সময়, সাহেবদের বাড়ি সাজানোর জন্যে মাঝে মাঝে কয়েকটি করে কচুরি ফুল বিক্রি হতে দেখতাম।
নৌকা গ্রামের খালে এলেই, দু-দিকের সারি সারি ধানের খেতে খেতে, দূরের আম সুপুরি-তাল-নারকেল গাছগুলোর ডগায় ডগায়, উড়ে যাওয়া কাকের বকের পাখায় পাখায়, দূর-দূরান্তব্যাপী নীল আকাশে, এককথায় পথের সর্বত্র যেন পেতাম কেমন একটা স্নেহস্পর্শ। সেখানে লজ্জা নেই, সংকোচ নেই, একেবারে খাঁটি উন্মুক্ততা। লগির খোঁচা খাওয়া নৌকায় তলাকার জলের মতোই মন তখন আনন্দে ছলছলিয়ে উঠতে থাকে।
হাঁটাপথে নলছিটির পর নরসিংহপুর, বৈচন্ডি, আখখারপাড়া, হয়বাৎপুর বা হবিৎপুর, তারপর আমাদের গ্রাম সৈওর। সৈওর গ্রামটি এদের মধ্যে সবচেয়ে ছোটো। স্টিমারের সঙ্গে যেমন গাদাবোট থাকে, হবিৎপুরের সঙ্গে সৈওর গ্রামটিও ঠিক তেমনি। আমাদের গ্রাম বলতে আমরা বুঝি হবিৎপুরকে, বলেও থাকি তাই। হাট, বাজার, পোস্ট অফিস, হাই স্কুল, খেলার মাঠ সবই হবিৎপুর ও আখোরপাড়ার। এখানে মুসলমানেরা সংখ্যায় অনেক। আমাদের ঢোলবাদক আর কুমোররা বরিশালের মধ্যে বিখ্যাত। জামাইবাবু, পিসেমশাই ও মামারা আমাদের গ্রামকে পান্ডব বর্জিত দেশ বলতেন। অফুরন্ত মাছধরা আর গোয়ালের গোরুগুলো না থাকলে তাঁরা নাকি আমাদের ওদিকে যেতেনই না। অবশ্য কলকাতার খবরের কাগজ শহরের আগেই আমরা পেতাম। নলছিটি বরিশালের আগের স্টেশন, মাত্র ছ-ক্রোশ পথ।
