কলকাতায়, শুধু কলকাতায় কেন, বাংলাদেশের সর্বত্রই চাঁদসীর ক্ষত চিকিৎসকরা খ্যাতি অর্জন করেছেন। এই চাঁদসী পূর্ব বাংলার বরিশাল জেলার একটি গ্রাম, সে-গ্রামই আমার জন্মভূমি। দেশ-বদলের পালায় সে-গ্রামকে ছেড়ে এসেছি, কিন্তু শত দুঃখের দিনেও চাঁদসীর মানুষ বলে নিজে গর্ব অনুভব করি, দেশের কথা মনে হলে কেমন একটা প্রশান্তিতে ভরে যায় এই হতাশার মুহূর্তগুলো। গ্রাম তো শুধু আমার একার নয়, হাজার মানুষের গ্রাম চাঁদসী। শুধু আজকের নয়, কতকাল ধরে কত মানুষের পদচিহ্নে এ গ্রাম ধন্য। সে-ইতিহাস আজ হয়তো সকলের মনে নেই, কিন্তু সে-গ্রাম আজও রয়েছে অতীতের নীরব সাক্ষ্যের বাণী বহন করে। গ্রামের কথা লিখতে বসে সে ইতিহাসের পূর্ণ পরিচয় দেবার সামর্থ্য আমার নেই, কিন্তু আমার নিজের সঙ্গে গ্রামের যে মধুর পরিচয়টুকু জড়িয়ে আছে সে-কাহিনিই আজ জানিয়ে যাই।
অনেকদিন ছেড়ে এসেছি গ্রামকে। কিন্তু সেখানকার প্রতিটি দিনের কাহিনি আজও আমার সারামন জুড়ে রয়েছে। গরমের ছুটিতে কলেজ ছুটি হলেই গ্রামে যাওয়ার জন্যে মন ব্যাকুল হয়ে উঠত। জলের দেশ বরিশাল। স্টিমার কতক্ষণে গিয়ে পৌঁছোবে গৌরনদী স্টেশনে, সেজন্যে কী ব্যাকুলতা। ঘাটে পৌঁছেলেই সোনামদ্দি মাঝি চিরপরিচিত হাসি হেসে প্রশ্ন করত—‘কর্তা, আইলেন নাকি, চলেন, নৌকা আনছি। আপনারা যে আজি আইবেন হেই তো আমি জানতামই। আমিও আপনাগো মতো দিন গুনি কবে আপনেরা আইবেন। তা কর্তা, গায়-গতরে ভালো আছেন তো?’
এইরকম কতশত প্রশ্ন করত সোনামাঝি। সে বুঝত বাড়ি পৌঁছোবার জন্যে আমাদের আগ্রহ। তাই খুব তাড়াতাড়িই নৌকো চালাত সে, বলত, ‘ওই যে কর্তা লোহার পোল দেহা যায়।’ এই পুলটি ছিল আমাদের বিশ্রামের জায়গা। সেখানে বর্ষার দিনে দেশ-দেশান্তরের নৌকা এসে ভিড়ত পণ্য বহন করে। আর একটু এগোলেই কাঁপালীবাড়ি, আমাদের গ্রামে ঢুকবার দক্ষিণ প্রান্তের প্রবেশমুখ। আর একটু এগিয়ে যান, দেখতে পাবেন একটি কাঠের পুল, তার পাশেই ঝাঁকড়ামাথা একটা আমগাছ। খবরদার, রাত্রিবেলা অন্ধকারে সেদিকে যাবেন না। গেলেই হয়তো গাছের ডাল থেকে ঝুলে-পড়া কোনো নারীমূর্তি দেখে আপনি চমকে উঠবেন। স্বামীর অত্যাচারে এক বাজনদারের বউ ওই গাছটায় গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে আত্মহত্যা করেছিল। খুব ভয় করত বই কী সে-গাছের তলা দিয়ে যেতে। এমনি ভয় করত কালীবাড়ি ও জয়দুর্গা খোলা দিয়ে যাবার সময়ও। যাই হোক, ঝাঁকড়া আমগাছটা পেরিয়ে বাজনদার বাড়ি ছাড়িয়ে গেলেই চোখে পড়বে বিখ্যাত দিঘির ঘাট। এই দিঘির ঘাটটা ছিল আমাদের লেক। গ্রীষ্মের কত সন্ধের মধুর স্মৃতি জড়িয়ে আছে সেই দিঘির পাড়ে, কাকচক্ষুর মতো স্বচ্ছ জল। তার কিছুটা দূরেই গ্রামের ডাকঘর। সেখানে প্রতিদিন সকালবেলা গ্রামের লোক সব জড়ো হত। চলত আলাপ-আলোচনা, চলত খবরের কাগজ পড়া। ওরই দক্ষিণে গুহদের বাড়ি। কত জাঁকজমক ছিল ওবাড়ির, গমগম করত দিনরাত। পুজোর সময় গ্রামের সকলেই এসে জমত এবাড়িতে। তার দক্ষিণে মজুমদার বাড়ি; আরও এগিয়ে যান। কালীবাড়ি, দশমহাবিদ্যা বাড়ি, কেদারবাবুর বাড়ি হয়ে চলে আসুন তালুকদার বাড়ি, গ্রামের একেবারে শেষসীমান্তে। পায়ের জুতো খুলে দেখুন একুটও কাদা লাগবে না, বর্ষাকালেও না। এত সুন্দর ও চমৎকার এ গ্রামের পথঘাট।
গ্রামটি ছোটো হলেও এখানে চার-চারটি থিয়েটার পার্টি ছিল। বিষহরি নাট্য সমিতি, দশমহাবিদ্যা নাট্য সমিতি, সিদ্ধেশ্বরী নাট্য সমিতি ও চাঁদসী আর্ট প্রোডিউসার্স–সংক্ষেপে সি. এ. পি.! এই শেষোক্ত পার্টিই ছিল গ্রামের মধ্যে সেরা। এদের দলেই গ্রামের শিক্ষিত যুবকবৃন্দ অংশগ্রহণ করত। পুজোর সময় থিয়েটার নিয়ে কী মাতামাতিই না হত! কত দলাদলি, ঘোঁট পাকানো, জব্দ করার ফন্দি, এসব মত্ততার মধ্য দিয়েই পুজোর কটা দিন কেটে যেত। পুজোয় দেশে যাওয়ার আনন্দই ছিল ওর মধ্যে। এই থিয়েটারে অভিনয়ে যাঁরা অংশগ্রহণ করেতেন তাঁদের মধ্যে দুই সহোদরের কথাই বিশেষ করে মনে পড়ে, হবিবর রহমান ও লুৎফর রহমান ওরফে বাদশা মিঞা। বাদশা মিঞা আজ পরলোকগত। এমন সুন্দর চেহারা, শিক্ষিত ও অমায়িক লোক খুব কমই দেখেছি। এরা দুজনে সমস্ত অভিনয়েই অংশগ্রহণ করতেন এবং তাও প্রায়ই হিন্দু-দেবতার ভূমিকায়! আজ একথা শুনলে ইসলাম ভক্তরা চোখ কপালে তুলবেন জানি, কিন্তু সেদিন এ ছিল সত্য, স্বপ্ন নয়। মধু শেখ গ্রামের সকলেরই কাছে ছিল অতিপরিচিত, আপন বন্ধুজন। তার একটি বিশেষ গুণ ছিল। সে সমস্ত পশুপাখির ডাক নকল করতে পারত আর তা শোনাবার জন্যে গ্রামের সমস্ত মেয়েমহলেও তার ডাক পড়ত। সেও আজ পরলোকগত। কত লোকের কথাই তো আজ মনে এসে ভিড় করছে কার কথা লিখব, রজনী গুহমশায়ের বাড়ির কথা কী ভোলা যায়, না ভোলা যায় তাঁর বাড়ির সকলের অমায়িক ব্যবহারের কথা? এই বাড়িতেই চলত থিয়েটারের মহড়া দিনরাত। চলত গান-বাজনা। কারণ গান-বাজনার সমজদার ছিলেন এ বাড়ির সকলেই, আর সকলেই ছিলেন সুকণ্ঠ। নিম্নশ্রেণির মধ্যে আরও অনেকের গান আমাদের মুগ্ধ করত। দিনের কর্মাবসানে এরা একত্রে মিলিত হত। রাত্রিতে অনেকের বাড়িতে ‘ত্রিনাথ’-এর মেলা বসত। খোল, করতাল, মৃদঙ্গ সহযোগে চলত ঠাকুর ত্রিনাথের ভজন। কী সুন্দর তার মূৰ্ছনা! কোনো এক আত্মভোলাকে দেখেছি জ্যোৎস্না রাতে নির্জন স্থানে বসে একটি একতারা সহযোগে অপূর্ব সুরজাল সৃষ্টি করে বাউল সংগীত গেয়ে চলেছে। সে-সংগীত শুনে ঘর ছেড়ে তার পাশটিতে এসে চুপ করে বসে থাকতে হত। চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ত শ্রোতা ও গায়ক উভয়েরই। সংগীত শেষ হলে মনে হত কোন স্বর্গলোক ভ্রমণ করে এলাম এতক্ষণ। সেই আত্মভোলা আর তার সংগীত কি আজও বেঁচে আছে!
