একদিন বড়দা তুলে রাখতে ভুলে গেল আর সে হাতে পেয়ে গেল রেডিও। এবং তাড়াহুড়ো করে নাড়িয়ে কঁকিয়ে দেখতে গিয়ে হাত থেকে মেঝেয় ফেলে দিল। কথা বলছিল রেডিও। স্তব্ধ হয়ে গেল হঠাৎ,
দারুণ ভয় পেয়ে গেল সে। বড়দাদা এসে দেখতে পেলে রাগে অন্ধ হয়ে যাবে। মেরে ছাল তুলে নেবে তার। হাড় ফাটিয়ে দেবে। সে তখন কারওকে কিছু না বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায় এবং ঘুরতে ঘুরতে ইস্টিশানে এসে পড়ে। শাস্তির হাত থেকে বাঁচতে সে রেলগাড়িতে চেপে বসে।
আগে কখনও রেলগাড়িতে চাপেনি সেগতি আর নতুনত্বের প্রাবল্যে অপূর্ব প্রসন্নতায় কুঁদ হয়ে ছিল সারাক্ষণ। ভয় করেনি। কষ্ট পায়নি বাড়ির জন্য। একের পর এক ইস্টিশান পেরুতে লাগল গাড়ি। কোথাও থামল। কোথাও থামল না। এইরকম করতে করতে যেখানে এসে একেবারেই থেমে গেল, সেই বিরাট বড় ইস্টিশানের নাম সে পরে জেনেছিল হাওড়া।
চমকে উঠল ছেলেটি। বাইরে দারুণ চিৎকার। দুটি পুরুষের ক্রুদ্ধ গলা। মেয়েদের সমবেত রব। একজন আরেক জনকে খানকিপুত্র বলে সম্বোধন করল। অন্যজন সঙ্গে সঙ্গে অপর জনের মাতা সম্পর্কে অশ্লীল উক্তি করল। গেল-গেল। ধরধর পড়-পড়। ছেলেটি সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল দেখে হেসে ফেলল সে। আশ্বাস দিল, এখানে এরকম প্রায়ই হয়। রোজকার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই সব। পারিশ্রমিক নিয়ে মারামারি। লভ্যাংশ নিয়ে হাতাহাতি। এ ছাড়া আছে পরস্পরের প্রতি সন্দেহ আর অবিশ্বাস। খদ্দেরের সঙ্গেও লেগে যায় কখনও কখনও। অনেকে মাতাল হয়ে হইচই করে।
পুলিশ থাকে কিনা প্রশ্ন করে ছেলেটি। সে উঠে পড়ে। কিছু কাগজপত্র ছেলেটির হাতে দেয়। তথ্য। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলি পড়তে দিয়েছে তাকে। এগুলোর ওপর চোখ বোলাতে বলে সে দরজার দিকে যায়। ছোটখাটো ঝামেলা সে-ও মিটিয়ে দিতে পারে। পুলিশ লাগে না। পুলিশ শুধু পাপের মূল্য নিতে আসে।
বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে সে বেরিয়ে যায়। ছেলেটি ইংরাজি ভাষা পড়তে পারবে নিশ্চয়ই। যদিও সে পড়েছে বাংলা তর্জমা।
মারামারি চলছে তখনও। দু’জনকেই সে চেনে। এ পাড়ারই সন্তান। এখন কাস্টমার ধরে আনে। একজন বার করেছে ছোট ছুরি। অন্যজনের সঙ্গে কিছু নেই। তবুও সে পিছু হঠছে না। সে দু’জনের মাঝখানে এসে পড়ে। দুজনকেই দু’হাতে ধরে সমিতির দিকে নিয়ে যায়। সমিতিতে, সারাক্ষণ তাদের দু’জন থাকে, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার দুজন, অসুখ-বিসুখ থেকে মারামারি—সব রকমের ঝামেলা সামলায়। তবুও খুন হয়ে যায় মাঝে মাঝে। তবুও গোপন রোগে আত্মহত্যা করে বালুখ বুজে সহ করতে করতে মরে যায় কত মেয়ে।
সমিতির কাজ এখনও সম্পূর্ণ সফল নয়.সে জানে। এ পাড়ায় রাতদিনের তফাত নেই। কিন্তু সমিতি রাত্রিকারোটায় বন্ধ হয়ে যায়, খোলে আবার সকাল এগারোটায়। এর মাঝখানে অনেক কিছু ঘটে। তার রেশ থাকে দিনের পর দিন।
সমিতিকে চালু রাখতে গেলে মেয়েদের সহযোগিতা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। কিন্তু তারা এড়িয়ে যায়। ভয়ে এড়িয়ে যায়। বাড়িওয়ালিরা ভয় দেখায় তাদের। মৃত্যুভয়। শাস্তিভয়। গুণ্ডা লাগিয়ে জান নিয়ে নেবার ভয়ে, পুলিশের হাতে বন্দি থাকার ভয়ে কাটা হয়ে থাকে সব।
সমিতি থাকলে সবচেয়ে বেশি অসুবিধা পুলিশের। কারণ ঝঞ্জাট হলে মিটিয়ে নেবার ছলনায় তারা অর্থ নিষ্কাশন করতে পারে না। মেয়েরাও একটা নির্ভরযোগ্য জায়গা পেয়ে গেলে ন্যায়-অন্যায়ের বিষয়ে হয়ে উঠতে পারে অনেক বেশি সচেতন। তখন পুলিশের নৈমিত্তিক প্রাপ্তির ঘরে টান পড়ে।
অতএব, পুলিশ চায় না সমিতি থাক। পুলিশকে খুশি করতে গিয়ে বাড়িওয়ালিরা চায় না সমিতি থাক। মেয়েরা সচেতন হলে মুশকিল তাদেরও বাড়ছে বৈ কমছে না। আর মেয়েরা কোনটা ভাল সঠিক বুঝতে না পেরে গতানুগতিক প্রক্রিয়াকেই আঁকড়ে থাকে।
সে দু’জনকে সঙ্গে নিয়ে সমিতির দিকে যাচ্ছে দেখে কয়েকজন সঙ্গ নিল। কিন্তু সমিতির ঘরে পৌঁছে সে আর দাঁড়াল না। ঘরে ক্লায়েন্ট আছে বলে বেরিয়ে এল তাড়াতাড়ি।
ছেলেটির মুখ মনে পড়ল তার। করুণ। উদাস। আর সুন্দর। ভারী সুন্দর। কিন্তু ওই অদ্ভুত জায়গায় ছেলেটি গিয়েছিল কেন বুঝতে পারছে না সে। পারতপক্ষে তারা ওই পথ দিয়ে সন্ধ্যাবেলা যায় না। অনেকে দুপুরেও ভয় পেয়েছে এখানে। তার নিজের খুব ভয়-ডর নেই। রাস্তা সংক্ষেপ করতে সাহস করে ওই পথ ধরেছিল। কিন্তু আজ পেছনে পায়ের শব্দ পেয়ে সে ভয় পেয়েছিল এমন যে গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যায়।
দরজা খুলে ঘরে আসে সে। দেখে ছেলেটি কাগজগুলোর ওপর উপুড় হয়ে আছে। এত মন দিয়ে পড়ছে যে তার আগমন টের পায়নি। আগেকার মতো গুছিয়ে বসে সে। বোতল থেকে জল খায়।
“আজকের যুব সম্প্রদায়ের নাম দেওয়া যেতে পারে এডস প্রজন্ম। এই রোগে এরই মধ্যে মারা গিয়েছে লক্ষাধিক মানুষ। গত কুড়ি বছরে এইচ আই ভি দ্বারা আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় সত্তর লক্ষ। অধিকাংশের সংক্রমণ ঘটেছে পনেরো থেকে চব্বিশ বছর বয়সের মধ্যে।”
ছেলেটি মুখ তোলে। সে আবার কথা শুরু করে। ছেলেটি শুনতে আগ্রহী কিনা পুনর্বার জানতে চায় না। সে হাওড়া ইস্টিশানের কথা বলে। রেলগাড়ি থেকে নেমে সে হতভম্ব হয়ে যায়। অত লোক, অত গাড়ি, অত হাঁক-ডাক কোলাহল সব মিলে ভয় পেয়ে যায় সে। অসম্ভব একা এবং অসহায় লাগে তার। কী করবে বুঝতে না পেরে একজন টিকেট পরীক্ষকের কাছে গ্রামের নাম বলে গাড়ির হদিশ জানতে চায়। সেদিন আর গাড়ি ছিল না। তিনি জানান গাড়ি পাওয়া যাবে পরের দিন সকালে। বলতে বলতে কিছু সন্দেহ হয় তার। তার সঙ্গে আর কেউ আছে কিনা জিজ্ঞেস করেন তিনি। কী যে হয়ে যায় তার, একা আছে বললে যদি কিছু হয়, সে মিথ্যে করে বলে দেয় সঙ্গে তার বাবা আছে। তখন, একজন মধ্যবয়সি লোক তার কাঁধে হাত রাখে।
