রোদ্দুর এখন আলো হয়ে বিছিয়ে আছে শুধু। শুধু, সোনালি নরম আলো। দিবসাবসান সাদা সমাধিগুলির ওপর এঁকে দিচ্ছে সামান্য রঙের আলপনা। বড় যত্নে। বড় মমতায়। টুঁই-ট্টিট, টুঁই-ট্টিট শব্দে ডেকে যাচ্ছে পাখি। সমস্ত ক্লান্ত পাখিরবের কিচির-মিচির ছাপিয়ে সেই শব্দ মিষ্টি, করুণ এবং একটানা। সে পাখিটিকে খোঁজে। দেখতে পায় না। বুকের মধ্যে কী যেন এক ছটফটায়। ঘাসের ওপর বসে পড়ে সে। বহুক্ষণ ধরে ঘুরেছে। দাঁড়িয়ে আছে এত সময় মনে পড়েনি। সে যেমন একদিন অন্য এক সমাধিক্ষেত্রে ঢুকে পড়েছিল আর নিঃশব্দ সেই ঘন গাছে ঘেরা শান্তিস্থলের বাঁধানো পুকুরপারে শুয়ে পড়েছিল, এখানে তেমনটা সম্ভব হয় না। পুকুর নেই বলেই নয়। এই যে বিস্তীর্ণ সমান সবুজ ঘাস তার ওপর শয়ন সম্ভব। কিন্তু সম্ভবও নয়। শান্তির সঙ্গে, সুন্দরের সঙ্গে, আভিজাত্যের জটিল দুরত্ব এখানে রচিত আছে। এ জায়গা, মানুষকে দিয়ে শিষ্ট, পরিশীলিত আচরণ করিয়ে নেয় নিজেই। এই তফাত হল দেশ-গাঁয়ের বাড়ির সঙ্গে শহরের ফ্ল্যাটবাড়ির তফাত। সেখানে কাদা-পায়ে ঢুকে পড়া যায়, মাথায় তেল দিয়ে পুকুরে ডুবে সেরে ফেলা যায় স্নান। গামছায় পিঠ রগড়ে তুলে ফেলা যায় গায়ের ময়লা, কোনও কিছুই চোখে লাগে না, কোনও কিছু বেমানান ও অশিষ্ট বলে মনে হয় না। কিন্তু শহরের ফ্লাটে জুতোজোড়া আড়ালে রাখতে হয়। ধুলো ঢাকা পড়ে কার্পেটে। শহবত ও শিষ্টাচারের পরীক্ষা পদে পদে। সে ঘাসের গায়ে হাত বুলোয়। সমান করে ছাঁটা ঘাস।
চন্দ্রাবলী চেয়েছিল শহরের বৃহৎ ময়দানের ওপর দিয়ে খালি পায়ে হেঁটে যাবে একদিন। চেয়েছিল বড় বড় স্মৃতিসৌধের পাশের পথ দিয়ে এক্কাগাড়ি চেপে ঘুরবে সমস্ত সন্ধ্যা। দেখতে চেয়েছিল সে, খোলা মঞ্চে বসে ভীমসেন যোশী মিঞা-কি-মল্লার গাইছেন আর কালো মেঘে ভরে গিয়েছে আকাশ, আর ভীমসেন যোশী ভিজতে ভিজতে, তামাম দর্শককে ভিজিয়ে দিতে দিতে গাইছেন–ছোটি ছোটি বুন্দন বরসে মেহা। আর মধ্যরাত্রি পূর্ণ হচ্ছে তখন। অন্ধকার আকাশ মেঘে মেঘে আরও আরও অন্ধকার হয়ে নেমে আসছে কোলের কাছে।
আর মহুলি কী চেয়েছিল, মহুলি? তার মনে নেই, মহুলির কোনও চাওয়া মনে নেই।
একদিন সকালে, যে-সময় তাদের দু’জনের ছিল শুধু, মহুলির ও তার, সে সময় এক যুবক এসে যায়। বিভ্রান্ত। আরক্ত চোখ। খোঁচা খোঁচা দাড়ি। চুলে চিরুনি পড়েনি। আলুথালু বেশবাস। পরিকল্পনাহীন ঝোড়ো বাতাসের মতো সে ঢুকে পড়ে ঘরে এবং তার উপস্থিতি অগ্রাহ্য করে মহুলির হাত চেপে অনুনয় করতে থাকে। কাতর অনুনয় করে যে মহুলি তাকে ছেড়ে চলে না যায়। মহুলির এতটুকু প্রেম সে ভিক্ষা করে তখন। মহুলির দয়া ভিক্ষা করে। আর মহুলি নির্মম অতি নির্মম তাকে চলে যেতে বলে তৎক্ষণাৎ। যুবকটি প্রলাপের মতো বলে যায় সব। তাদুেরু সোনালি সময়ের কথা। রক্তকরবীর মতো ফুটে থাকা প্রেম সেলে যায়। আর মহুলি শুভদীপকে দেখিয়ে দেয় তখন। বলে, সে আর কিছুক্ষণ বসার চেষ্টা করলেই শুভদীপ তাকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বার করে দেবে। যুবকটি তখন যতটুকু প্রাণশক্তি ছিল তাই নিয়ে উঠে পড়ে। টলতে টলতে উঠে পড়ে। আর শুভদীপ অসহায় দেখতে থাকে তার বরত হয়ে যাওয়া। নিজের অজান্তে, অজ্ঞাতে ব্যবহৃত হয়ে যাওয়া। সে তখন কৈফিয়ত চায় এবং মহুলি চন্দ্রাবলী তোলে। ওই মোটা বেঁটে কালো কুচ্ছিত মেয়েটাকে তাদের সম্পর্কের মাঝখানে দাঁড় করিয়ে দেয়। তাকে পরিত্যাগ করুক শুভদীপ–এমন দাবি তোলে।
সে চন্দ্রাবলীকে যেমন বলেছিল, ভালবাসে মহুলিকে, তেমনি মহুলিকেও বলেছিল চন্দ্রাবলী সম্পর্কে কতখানি নির্মোহ সে, কতখানি নিপ্রেম। শরীর বলেনি। শুধু দায়বদ্ধতা। বাবা-মা নেই। স্বামী তাকে ছেড়ে দিয়েছে। একা, অসহায় এই দায়বদ্ধতা। মহুলি কি বিশ্বাস করেনি?
সে তখন নারাজ হয়ে যায়। চন্দ্রাবলীর প্রতি টানে হয়তো নয়। হয়তো আহত অহং-এ। এবং মহুলি সম্পর্ক অস্বীকার করে। ভালবাসা অস্বীকার করে। যদি চন্দ্রাবলী থাকে তবে সে নেই, জানিয়ে দেয় সাফ।
চন্দ্রাবলী পেরেছিল। মহুলি পারেনি। চন্দ্রাবলী নিয়েছিল। মহুলি নেয়নি। কেন নেবে। নেবার তো কথা নয়। কথা হল, মহুলির হাজার প্রেমিক ছিল। চন্দ্রাবলীর সে-ই ছিল শুধু।
তার কোনও তত্ত্বদর্শন নেই। সে তত্ত্বদর্শী নয়। একাধিক প্রেমিক থাকা ভাল কি মন্দ জানে না সে। শুধু আশ্চর্যের সহস্র উপকরণ মহুলিকে হারিয়ে তাকে দুঃখিত হতে দেয় না। সে বরং মহুলিকে প্রবঞ্চক ভাবে এবং মালবিকা সিনহার পাশে জুড়ে দেয়।
এই সব বলেনি সে। চন্দ্রাবলীকে বলেনি। শুধু বলেছিল অন্য সব। সব। বলেছিল, সেদিন থাকবার কথা ছিল মহুলির বাড়ি। থাকেনি সে। কিন্তু সম্পূর্ণ সত্য ছিল না এ বিবৃতি। সত্য এইটুকু যে সেদিন রাতে মহুলির বাড়িতে তার থাকবার কথা ছিল। কিন্তু মহুলি তাকে রাত্রি এগারোটায় রাস্তায় বার করে দেয়। বার করে দেয় কারণ তার একা-একা থাকবার বেগ পেয়েছিল। দু’পাত্র হুইস্কি খেয়ে তার দুঃখ কষ্টে তোলপাড় হৃদয় একা হতে চেয়ছিল অপূর্ব হিসেবে। আর শুভদীপ রাত্রি এগারোটায় পথে নেমেছিল। কী করবে, কোথায়, কী ভাবে যাবে! সে তখন ট্রামে চড়ে বসে। চেষ্টা করলে যেতে পারত বাড়ি। কিন্তু যায় না। ট্রামে চেপে চলে যায় শহরের বড় ইস্টিশনে। আর বসে বসে কাটিয়ে দেয় সারা রাত। আর ভোর ফুটলে তার ইচ্ছে করে প্রথমেই মহুলির কাছে যেতে। কেন-না আশঙ্কা করে সে। ভয় পায়, মদ্যপান করে, দুঃখেরঅভিঘাতে মহুলি কিছু ঘটিয়ে ফেলবে না তো! সে ভয় পায় আর.স্বেদবিন্দু ফোঁটা ফোঁটা নামে। সে, ক্লান্ত, নিদ্রাহীন মহুলির বাড়িতে চলে যায়। দেখে, মহুলি ঘুমিয়েছিল রাতে, আর ঘুমনোর আগে মশারি টাঙিয়েছিল।
