—যে-জীবন সে যাপন করেছে, সুন্দর সে-জীবন। যা কিছু সে ভালবেসেছিল, তারই জন্য সব পুণ্যময়।
স্নেহশীলা, মমতাময়ী বয়স্কা মহিলারাও একে একে এসে পড়ছেন এবার। এই বসন্তের বিকেলে চমকার সাজ-পোশাক তাঁদের। কোনও ব্যস্ততা নেই। সংসারের সকল কাজ সেরে তারা এসেছেন বৈকালিক বাতাস গায়ে মেখে নিতে।
আর শুভদীপ গন্ধ পাচ্ছে তখন। সেই আশ্চর্য গন্ধ। সুগন্ধ নয়। দুর্গন্ধও নয়। নয় মাদকতাময়। গভীর এই ঘ্রাণ।
সে দেখে। চারিদিক অবলোকন করে এবং তরুণ রমণীদের ইতস্তত দেখতে পায়। কেউ কারও সঙ্গে বিশ্রম্ভালাপ করছেন না। যে-যার নিজের মতো সমাধির পর সমাধি পেরিয়ে হেঁটে চলেছেন।
কত অসামান্য মানুষ সব, আর কী বিশাল এই সমাধিক্ষেত্র। এই সব নারী—তাঁরা প্রত্যেকেই সারাদিনের কাজের পর বসন্তের বাস-মেখেছেন গায়ে। এই অসামান্য গন্ধ—যা সে পেয়েছে আগেও–সে নিশ্চিত হয়—এ-কোনও নারীরই গন্ধ বলে। এমনকী মৃত্যু যে নারী, হতে পারে সেই নির্লোভ, নিরপেক্ষ, শান্ত নারীর এ গন্ধ। কিন্তু এখন সে বিশ্বাস করতে চায় এ গন্ধ এই সব রক্তময় মাংসবতী দেহ থেকে আগত এবং তখন, এই সব অপার্থিব গন্ধ ছাপিয়ে তার নাকে লাগে মন্থলির গায়ের গন্ধ। ম্যাকসি তুলতেই ঝাপটা লেগেছিল নাকে আর. আর…সে সবিস্ময় আবিষ্কার করেছিল কোনও অন্তর্বাস নেই। মহুলির কোনও অন্তর্বাস নেই।
সে তখন উন্মত্তের মতো কামড়ে ধরেছিল ঊরু আর হাত রেখেছিল যোনিতে। আর মহুলি তার মাথা চেপে ধরেছিল।
শুনতে শুনতে, এইসব শুনতে শুনতে চন্দ্রাবলী গাড়ির দেওয়ালে মাথা রেখেছিল। দৃষ্টি বাইরে। উদাস। গালের প্রতিটি রেখা যন্ত্রণাময়। চোখের প্রতিটি কাঁপন কষ্টে ভারী। সে, শুভদীপ, তখন উল্লসিত হচ্ছিল মনে মনে এবং অগ্রসরমাণ।
মহুলি তার মাথা চেপে ধরেছিল আর সে তখন চূড়ান্ত, সে তখন কাণ্ডজ্ঞানহীন, মহুলিকে বিছানায় শুইয়ে দেয়, শুইয়ে দেয় আর নিজেকে মুক্ত করে এবং… এবং মহুলি তাকে নিরস্ত করে। হাঁপাতে হাঁপাতে, উত্তেজিত থাকতে থাকতে নিরস্ত করে এই বলে যে সে এখন সম্পূর্ণ নিরাপদ নেই।
নিরস্ত। নিরস্ত বলেছিল সে চন্দ্রাবলীকে। প্রকৃতপক্ষে নিরস্ত নয়, বরং নিষেধ। কর্কশ নিষেধ। আচমকাই উঠে বসে তাকে এক ধাক্কায় ছিটকে ফেলেছিল মহুলি, আর সে, যেমন করে মানুষ গায়ে পড়া টিকটিকিকে ছিটকে ফেলে দেয়, তেমনি চিৎ হয়ে পড়ে গিয়েছিল। টিকটিকির মতো তারও সাদা পেট উন্মুক্ত ছিল। মুহূর্তে তার সমস্ত কাম জল হয়ে যায়। লজ্জায় শিশ্ন নুয়ে পড়ে।
এই সব বলেনি সে। বলেনি। কেবল বলেছিল নিরস্ত। বলেছিল চূড়ান্ত হতাশায় মহুলি সেদিন মদ্যপান করতে চায়। আর সেদিন ছিল এক বৃহস্পতিবার। সুরা বিপণি বন্ধ থাকবার দিন। তখন মহুলি দ্রুত পোশাক পরে নেয়, এবং তাকে নিয়ে যায় অপরিচিত অন্ধকারে। নিজে আলোয় দাঁড়িয়ে থেকে তাকে ঠেলে দেয় তর্জনী তুলে এক নিবিষ্ট অন্ধকারে, যেখানে, বেআইনি মদ বিক্রি হয়।
14762720 (Private)
A. Right
Royal Army Service Corps
Died on lth July, 1945, Age 22
In memory of a dear son.
He heard the voice of Jesus say;
Come on to me and rest.
—আমাদের ছেলে। যিশু ওকে ডেকেছেন। বলছেন : এসো, আমার কাছে এসো, বিশ্রাম নাও।
বিকেল গড়িয়ে হলুদ আলোয় ধুয়ে দিচ্ছে পৃথিবী। বায়ুর সঙ্গে উড়ে আসছে ধুলোর গন্ধ এবং সেই আশ্চর্য গন্ধের রেশ। এত লোক অথচ কোনও শব্দ নেই। পাখিরাও সব শিস মেরে গেছে। কোনও শিশুকে এত নিঃশব্দে খেলা করতে দেখেনি সে। কোনও বৃদ্ধ আর বৃদ্ধাদের দেখেনি একটিও কথা বিনিময় না করে ভ্রমণ করতে এতক্ষণ। তরুণীরা এত উদাস–যেন কিছুতেই কিছু এসে যায় না তাদের। এই সমাধিস্থলের সম্মানে প্রত্যেকেইনীরর। নিরুৎসুক। একা-একা বায়ু বয়ে যায় আর গাছের পাতারা শুধু কাঁপে। মালিরা কাটা ঘাসের ঝুড়ি বোঝাই করে কোণের দিকে চলে যায়। আর সে, এতক্ষণ পর, কবরগুলির মধ্যে বিষণ্ণতা দেখতে পায়। নিজের বিষণ্ণতার সঙ্গে ওই সমস্ত সমাধির বিষণ্ণতাকে মিশিয়ে সে সামনের দিকে হেঁটে যায় অতি ধীরে। তার জুতোয় ঘাসের ওপর শব্দ ওঠে মশমশ। একটি ছোট্ট লাল ফুল তার পায়ের কাছে ঝরে পড়ে। সে মাড়িয়ে দেয় না, বরং তুলে পকেটে রেখে দেয়। এবং আবার তার নাকে সেই আশ্চর্য গন্ধের ঝাপট এসে লাগে। তার সব জট পাকিয়ে যায়। মদের গন্ধ, ফুলের গন্ধ, মহুলির গন্ধ।
সে অতএব চন্দ্রাবলীকে বলে যায়–সেদিনের কথা বলে যায়, যেদিন সে জীবনে প্রথম খরিদ করে মদ এবং বেআইনিভাবে।
চন্দ্রাবলী প্রকৃতির দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে তার দিকে তাকায়। এবং মন্তব্য করে। মন্তব্য করে যে সে ঠিক কাজ করেনি। তার উচিত হয়নি বেআইনিভাবে মদ কেনা। সে হাসে। হেসে চন্দ্রাবলীর মক্তব্য জানালা দিয়ে উড়িয়ে দেয়। উড়িয়ে দেয় এবং চুপ করে যায়। কী হল বলে না। তারপর কী হল বলে না। চন্দ্রাবলীও চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। তার আপাত ঔদাস্যের অন্তরালে তীব্র ঔৎসুক্য পাক খায় এবং একসময় সে জানতে চেয়ে ফেলে। এরপর কী হল জানত চেয়ে ফেলে।
548366 Corporal
Royal Air Force
Died on 29 th June 1945, Age 27.
Passing time only depends on fondest memories in God’s keeping.
এইবার আসে সমর্থ পুরুষেরা। তরুণ, যুবক। অধিকাংশের পরিধান সৈনিকের পোশাক। সে আশ্চর্য হয়ে দেখে। সমাধিগুলি দেখে এবং সৈনিকদের। কাছাকাছি রয়েছে কোনও সৈনিকের আবাসন–এমনই ধারণা করে সে। বাচ্চারা কেউ কেউ তখন ছুটে গিয়েছে তরুণী মায়ের কাছে। কেউ ধরেছে দাদু-দিদিমার হাত। কোনও তরুণ পিতার কোমর ধরে ঝুলে পড়ল কেউ। সে নিশ্চিত হয় তখন। বৈকালিক ভ্রমণে আসে গোটা পরিবার। এবং এখানে, এই পবিত্র, শান্তিময় সমাধিক্ষেত্রে, নিঃশব্দে রচিত হয় মিলনক্ষেত্র। এমনকী বাচ্চারাও প্রকাশ করে না উচ্ছাস, শিষ্টতায়, যখন তারা বাবা-মায়ের সংলগ্ন।
