যে-জায়গায় সে এসে দাঁড়িয়েছে এখন, আলাদা করে ঘিরে দেওয়া, এখানে ঘুমিয়ে আছে সৈনিকেরা।.সার সার অজস্র ফলক। সমান উচ্চতার, অভিন্ন আকৃতির। এখানেও পাখিরা নিরন্তর গান শোনায় সৈনিকদের। আঠারো থেকে চল্লিশ—নানা বয়সের, নানা স্তরের সৈনিক। কে জানে, তাদের দেহ সম্পূর্ণ ফিরেছিল কি না। কে জানে, তাদের একটি মাত্র অঙ্গই হয়তো পেয়েছিল প্রিয়জনেরা আর সমাধিস্থ করেছিল। কে জানে, হয়তো বোমা পড়ে ছিন্নভিন্ন তালগোল দেহটিই পৌঁছেছিল যা কেউ দেখতেও সাহস করেনি।
বীর সৈনিকেরা সব। সে তো মরতে পারছে না মৃত্যুকেই একমাত্র সৎ ও শান্তিময়ী মনে করবার পরও।
ফুল এসে জড়িয়ে রেখেছে, ছোট ছোট ডালপালা আগলে রেখেছে সমাধিগুলি। সে ঘুরে ঘুরে দেখছে। ফাল্গুনের হাওয়া হাহাকার নিয়ে আছড়ে পড়ছে গায়ে। তার চুল উড়ছে। বসন্তে বড় কষ্ট হয়। বড় কষ্ট হয়। বসন্তে তারা গিয়েছিল মাইথন।
4753356 (Private) in Middleton,
York and Lancashire Regiment
Died on June 1945. Age 30.
Its heart to picture your face in
hiding and to think. We could not say Good Bye.
—হৃদয়ে আঁকা ছিল তোমার মুখ। তোমাকে ভেবেছিল সেই হৃদয়।
আমরা তাই কোনও বিদায় বলতে পারিনি।
এই বসন্তে, এই ঘোর বসন্তে তারা গিয়েছিল মাইথন। সে যেমন ভেবেছিল, তেমন ছিল না সে-জায়গা। যাবার সময় কল্যাণেশ্বরীর মন্দিরে থেমে পুজো দিয়েছিল সে। বলেছিল, এই মন্দিরে মানত করলে মনস্কামনা পূর্ণ হয়। সিদুরের টানা টিপ পরেছিল সে। আর শুভদীপ সেই সিঁদুর মুছে ফেলতে আদেশ করেছিল। তার মনে হয়েছিল, অতিথিশালায় এ-এক ভণ্ডামি হবে। সবাই মনে করবে তারা স্বামী-স্ত্রী।
সে এমনকী ভুল করেও কারওকে মনে করাতে চায়নি যে তারা স্বামীস্ত্রী। কিন্তু সে, ওইটুকু সময়, শুধু সিঁদুর পরার মধ্যে যে স্বামী-স্ত্রী হয়ে ওঠা—সেটুকু আঁকড়ে রাখতে চেয়েছিল। শুভদীপকে স্মরণ করেই সে এই সিঁদুর পরেছে। অতএব সে মুছতে চায়নি। শুভদীপ নিজে তার মনের আড়ালে রাখা অনিচ্ছার স্বার্থে রুমাল দিয়ে সিঁদুর মুছে দেয়। চন্দ্রাবলী কথা বলেনি তারপর অনেকক্ষণ। বড় উদাসী দেখাচ্ছিল তাকে। বড় দুঃখী। আর এই উদাস থাকাকে, দুঃখী থাকাকে সে সহ্য করতে পারছিল না। তার ক্রোধ জন্মাচ্ছিল। তখন, সেই বসন্তের সকালে রুক্ষ লালাভ মাটির ওপর শুয়ে থাকা রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে, বসন্তের লীলায়িত বায়ুতে সে কামগন্ধ পাচ্ছিল। প্রকৃতির কাম ধীরে ধীরে তারও মধ্যে সঞ্চারিত হয়। তখন সে ক্রোধাগ্নির সঙ্গে কামাগ্নির সংঘর্ষ ঘটিয়ে ফেলে এবং এ কাজ অত্যন্ত সহজ কারণ কামের পরেই ক্রোধের স্থান, অতএব সম্মিলিত আগুনে, কাম ও ক্রোধের সম্মিলিত অগ্নিস্রোতে উত্তপ্ত হয়ে যাওয়া হাত সে রাখে চন্দ্রাবলীর হাতে। চন্দ্রাবলী হাত সরিয়ে নেয় না। কিন্তু ঔদাস্য থেকে ফিরে আসে না কিছুতে। তখনও দুঃখের আবরণে ঢেকে মুখে।
যে প্রকৃতি জীবিতবৎ কামগন্ধী হয়ে তাকে উত্তেজিত করেছিল সেই প্রকৃতিকেই তার লাগে জড়পদার্থ এবং বস্তুতই প্রকৃতি প্রকৃতপক্ষে অসীম শক্তিধর জড়বস্তু এবং এই জড়বস্তুর প্রতি নিবিষ্ট হয়ে থাকা স্তব্ধ চন্দ্রাবলীকে সে ঘৃণা করে তখন, তাকে লাগে সহাতীত এবং এই ঘৃণার ও অসহিষ্ণুতার প্ররোচনায় সে চন্দ্রাবলীকে যন্ত্রণা দিতে চায়। যন্ত্রণায় বিদ্ধ করতে চায় এবং মহুলির কথা শুরু করে। )
Francis Cameron
Sergent Royal Engineer
Died on 13th August 1940. Age 40
Have mercy upon me O God!
According to thy loving kindness.
—আমাকে দয়া করো হে ঈশ্বর! তোমার প্রেমময় অসীম করুণায়।
পাখিটা শিস দিতে দিতে তার মাথা স্পর্শ করে উড়ে যায়। নরম করবীর ডালে বসে দোল খায়। দুপুরের রোদুর আলতো করে নেমে যাচ্ছে বিকেলের দিকে। বৃদ্ধ মানুষেরা হেঁটে আসছেন কবরের পর কবর পার হয়ে। ছোট ছেলেমেয়েরা ছুটে ছুটে আসছে। কেউ একটিও গাছের পাতা ছিড়ছে না। ফুল ছিড়ছে না। কবরে বসে হুটোপাটি লাগিয়ে দিচ্ছে না। সকলের মুখে কী আশ্চর্য প্রশান্তি। কী আশ্চর্য আনন্দ। তাকে কেউ কিছু জিজ্ঞাসাও করছে না। মালিরাও কাজ করে যাচ্ছে একমনে। এত বড় বাগান, তারা কাজ করবে সন্ধে পর্যন্ত।
পাখিটা শিস দিয়ে যায়। চন্দ্রাবলী সুর মেলাত এই শিসের সঙ্গে। স্বর মেলাত। চন্দ্রাবলী চন্দ্রাবলী। সে ভাবে—চন্দ্রাবলী চন্দ্রাবলী। সে চন্দ্রাবলীকে যন্ত্রণা দেবার জন্য মহুলির কথা তুলেছিল।
মহুলির প্রসঙ্গ এলেই চন্দ্রাবলী ক্লিষ্ট হয়ে যায়। তার সারা মুখ কষ্টে ভরে ওঠে। কিন্তু সে শুনতে আপত্তি করে না। করেনি কোনও দিন। কারণ সে উপযাচক হয়ে গিয়েছিল। উপযাচক হয়ে কবুল করেছিল শুভদীপকে ছাড়া বাঁচবে না বলে সে মহুলিকেও মেনে নেবে। অতএব মহুলিকে সে সারাক্ষণ মেনে নেয়। সারাক্ষণ মহুলির সঙ্গে সঙ্গে বাঁচৌ’আর শুভদীপ জানে বলেই, মহুলির দ্বারা চন্দ্রাবলী যন্ত্রণা পায় জানে বলেই, তার প্রসঙ্গ তোলে। চন্দ্রাবলীর কানের কাছে মুখ নিয়ে প্রেমের আলাপের মতো বলে যায় কিছু দিন আগে মহুলির আহ্বানে সেগুলির বাড়িতে গিয়েছিল। সন্ধ্যায়। মহুলি একাই ছিল সেদিন। তার স্বামী গিয়েছিল বাণিজ্যিক ভ্রমণে। এবং একাকীত্বের কারণে মহুলির মন ভাল ছিল না। এবং মন ভাল করার জন্য শুভদীপকে বুকে টেনে নেয় সে। আস্তে আস্তে পোশাক খুলে স্তনে মুখ রাখতে দেয়। ওই নির্জনতায় শুভদীপ তখন অধিকতর চঞ্চল হয়ে ওঠে। সে তখন মহুলির ঢেলা ম্যাকসি পায়ের দিক থেকে তুলে দেয় ওপরের দিকে এবং আবিষ্কার করে, অভিভূত হয়ে আবিষ্কার করে–
- S. Scale
Royal Air Force
Died on 14th August 1945, Age 29
Life is all the sweeter that he lived
All he loved more sacred for his sake.
