দেবনন্দনের আসার সময় হয়ে গিয়েছে। শুভদীপ একবার রাস্তার কাছে দাঁড়ায়। উল্লাস কশলকরের স্বর ভেসে আসছে এ পর্যন্ত। দেবনন্দন সারাদিনের জন্য একটি বড় গাড়ি ভাড়া করেছে। টাটা সুমো। অনেক জন ধরে যাবে। বিশ্বদীপ নিয়ে আসবে তাদের। শুভদীপের চন্দ্রাবলীকে মনে পড়ে যায়। বিয়ে করবার কী অসম্ভব ইচ্ছা যে ছিল তার। আজ যদি চন্দ্রাবলী থাকত, থাকা সম্ভব নয়, তবু যদি থাকত, হৈ-চৈ করে একাই মাতিয়ে রাখত সারা বাড়ি।
একদিন, তারা বসে ছিল জল থেকে চাঁদ উঠে আসা সেই উদ্যানে। জোড়া জোড়া নারী-পুরুষের মধ্যে ঠিক তাদের কাছেই এসে বসল দু’জন। মেয়েটিকে দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল চন্দ্রাবলী। তার চেনা!তার বহু পুরনো বান্ধবী। কলকল করে উঠেছিল দু’জনেই। চন্দ্রাবলী শুভদীপের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল বান্ধবীর। বলেছিল, একরছরের মধ্যেই তারা বিয়ে করবে। আইনগত বিচ্ছেদ হয়ে গেলেই। বিচ্ছেদের তখন আবেদন করা হয়ে গিয়েছিল চন্দ্রাবলীর, বোঝাপড়ার বিচ্ছেদ। বান্ধবীটি এবং তার সহচর অভিনন্দন জানিয়েছিল তাকে সে হেসেছিল বিনিময়ে এবং ভেতরে ভেতরে ক্রুদ্ধ হয়েছিল। নিজেদের জায়গায় ফিরে আসতেই সে চাষ গলায়, কড়াভাবে চন্দ্রাবলীকে বিয়ের স্বপ্ন দেখতে নিষেধ করে দেয়। নিষেধ করে দেয়, যখন-তখন যাকে-তাকে এইভাবে বিয়ের কথা বলে বেড়াতে। চন্দ্রাবলী সরলভাবে মনে করিয়ে দিয়েছিল তখন, মহুলি বিবাহিত। যেন মহুলি বিবাহিত বলেই শুভদীপের চন্দ্রাবলীকে বিয়ে করার ক্ষেত্রে আর কোনও বাধা থাকতে পারে না। শুভদীপ তখন ক্রোধের চরমে। দাঁতে দাঁত পিষে আরও একবার সাবধান করেছিল।
ঠিক তখনই বান্ধবীটি তার বন্ধুকে নিয়ে তাদের মুখোমুখি এসে বসেছিল। চন্দ্রাবলীকে একটি গান শোনাতে অনুরোধ করেছিল সে। কারণ তার বন্ধুকে সে অনেকবার গল্প করেছে কত ভাল গায় চন্দ্রাবলী।
চন্দ্রাবলী উদাস হয়ে জলের দিকে তাকিয়েছিল কিছুক্ষণ। তারপর গান ধরেছিল। ধরা গলায়।
চলি ম্যায় খোজ সেঁ পিয়াকি। সিটি নহি সোচ রহ জিয়কি?
রহ নিত পাস হি মেরে। ন পাউ যারকো হেরে।
—প্রিয়কে খুঁজে চলেছি। কী করে তাঁকে পাব এ ভাবনা আর গেল না। সে আমার নিত্য সহচর। তবু তাকে চোখে দেখতে পাই না।
বিকল বহু ওরকো ধাঁউ। তব ই নাহ কন্তকো পাঁউ ॥
ধরোঁ কহি ভাঁতিসোঁ ধীরা। গয়ৌ গির হাঁথসে হীরা ॥
–বিহ্বল হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছি কেবল। তবু তাকে পাচ্ছি না কোথাও। আর যে ধৈর্য থাকে না। আমার হীরা পড়ে গেল হাত থেকে।
কটি যব নৈনকি ঝাঁঈ। লখে অব গগনমে সাঈ ॥
কবীর শব্দ কহি হ্রাসা। নয়নমে যার কো বাসা ॥
—চোখের পর্দা সরে গেল যেইদিন, দেখি প্রভু রয়েছেন আকাশে, সহস্ৰারে। কবীর বলে, আমার নয়নেই তাঁর বাস। একথা উচ্চারণ করতেও ভয় হয়।
১৪. এই জায়গাটা আলাদা করে ঘেরা
এই জায়গাটা আলাদা করে ঘেরা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যে লক্ষ লক্ষ সেনা মারা গিয়েছিল তার কয়েকজন এখানে শুয়ে আছে।
ঘুরে ঘুরে দেখছিল সে। এ পথ দিয়ে যেতে যেতে হঠাৎ ঢুকে পড়েছে এখানে। এখানে কারও প্রবেশানুমতি লাগে না।
বিরাট জায়গা জুড়ে এই সমাধিক্ষেত্র। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে চারপাশে তাকালে মৃত্যুকে বড় পবিত্র মনে হয়। মনে হয়, এই যে ধবধবে সাদা সমাধিগুলি, এখানেই প্রকৃত শান্তি আছে। সমাধির তলায়। ওইখানে, সমাধির মধ্যে শুয়ে অনন্ত ঘুমে মানুষ অনন্তকাল সুস্বপ্ন দেখে। কারও কোথাও ছুটে যাবার নেই। কেউ কারওকে ছেড়ে যায় না। কেউ আর কষ্ট পায় না কারও জন্য। মৃতেরা কষ্ট পায় না। দেহান্তৰ্গত কষ্ট শুধু জীবিতের জন্য।
সে তো জীবন ছেড়ে মৃত্যুর কাছে চলে যাবে, স্থির করেছিল কবেই, কিন্তু যেতে পারছে না কেন?
সে দূর অবধি দেখে। সাদা সমাধিগুলোয় নানা ধরনের ফলক। ক্রশ বেশির ভাগ। এ ছাড়াও আছে পরি। আছে বই অথবা ছোট্ট ঘরের আদল। তার ওপর কালো দিয়ে সমাধিস্তোত্র লেখা।
অসামান্য পরিষ্কার, একটি বাড়তি পাতাও যেন পড়ে থাকছে না কোথাও। মালিরা কাজ করছেন আর সাদা-কালোর ফাঁকে, ঘাসের অফুরন্ত সবুজের ফাঁকে, তাঁদের হাতে ফুটে উঠছে অজস্র রঙিন ফুল।
মৃত্যুর জন্য এখানে কোথাও চিৎকৃত শোক নেই। শোক এখানে সংহত। সমাহিত। বিষাদের কালো রং শুধু সমাধিস্তোত্রে ফুটে উঠে মিলিয়ে গিয়েছে। মিশে গিয়েছে ঘাসে আর ফুলেদের ছোট ছোট গাছে।
বড় গাছ অল্পই এখানে। বৃক্ষ দু’একটা। তাই শোক ও বিষণ্ণতার গাঢ় ঘোর ঘনতর ছায়া হয়ে লুটিয়ে পড়েনি। স্তব্ধতা ভেঙে পাখিদের ডাক বেহিসাবি প্রায়। সব মিলিয়ে এখানে শোক ও বিষাদকে জয় করার শক্তি মূর্ত আছে। আর আছে বৈরাগ্য।
তবু সে নিজের ভেতর বিষাদ টের পায়। এই সমাধিগুলির উজ্জ্বলতার ভিতর, শান্তি প্রতিজ্ঞার ভিতর সে বিষণ্ণতা মেলে দিয়েঅত্যুলিপি পাঠ করতে থাকে।
তার কোনও গভীর শোক নেই। তার কোনও গভীর সন্তাপ নেই। তার কোনও গভীর যন্ত্রণা নেই। যে-জীবন সে যস্ট্রিম করে তেমন এই দেশ ভারতবর্ষে হাজার মানুষের জীবন। লক্ষ কোটি মানুষের জীবন। অতএব এই দরিদ্র দিনযাপনের জন্য তার কোনও গভীর লজ্জাও নেই। তবু, সব মিলে, তার শোক-সন্তাপ, তার লজ্জা-যন্ত্রণা আকাশপ্রমাণ। সে বড় কাতর। বড় দুঃখী। এই যে উদ্ভাসিত বৈরাগ্য—এর ভাগিদার সে হতে চায়, পারে না। সে তার শোক-তাপ নিয়ে একেবারে শেষ হয়ে যেতে চায়। সে মৃত্যু চায়। মৃত্যু! প্রিয় পবিত্র মৃত্যু। সে সুন্দরী মৃত্যুর কোলে মাঝ রাখবে একদিন। শীঘ্র। অতি শীঘ্র। আর জ্বলতে জ্বলতে শেষ হয়ে যাবে। ফুরিয়ে যাবে।
