আঁচলে হাত মুছতে মুছতে মা এসে বসে। শুচু চলে যায়। মা আসন্ন আলোচনার প্রাক্কালে বিষাদ অনুভব করে। যে কাজ তার বড় ছেলে করতে যাচ্ছে এখন, সেই কাজ করার কথা ছিল যার, সে এখন অদ্ভুত অসুখে সব কিছু থেকে ছুটি নিয়ে টিভি দেখছে ঘরে। সে বড় বেদনায়, বড় বিচলনে বলে ফেলে বিশ্বদীপ, শুভদীপের বাবাকে একবার ডাকা হবে কি না। শুভদীপ কিছু বলার আগেই বিশ্বদীপ নাকচ করে দেয়। শুভদীপনীরব সমর্থন করে। মা আর কথা বাড়ায় না। মনে মনে লজ্জিত হয়। এই আসরে স্বামীকে আনার কথা বলা কোনও প্রগলভতা হয়ে গেল কি না সে বুঝতে পারে না। জড়সড় হয়ে সে শুভদীপের মাথার কাছে বসে।
দেবনন্দন বিয়েটা কবে নাগাদ করতে চায়, এই প্রশ্ন দিয়েই শুরু করে শুভদীপ। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব, জানায় দেবনন্দন। যদি তারা রাজি থাকে তবে সে কালই শুচুকে বিয়ে করে নিতে চায়। এই শীঘ্রতার কারণ সে নিজেই ব্যাখ্যা করে। শুচুর সময় কম সে জানে সময় অনিশ্চিত তা-ও সে জানে। তাই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সে শুচুকে প্রতিষ্ঠিত করে দিতে চায়। মা জিগ্যেস করে এ বিষয়ে দেবনন্দনের আত্মীয়দের মতামত আছে কি না। দেবনন্দন সরাসরি তাকায়। জানিয়ে দেয়, আত্মীয়দের মতামত অপেক্ষা করে না সে। পরোয়াও করে না। তার বাবা-মা যখন চলে গেল পর পর, সে তখন একুশ পেরোয়নি, শ্রাদ্ধ শান্তি চুকে গেল যেই, আত্মীয়রা পাততাড়ি গুটোল, এমনকী বছরে একবার খোঁজ নিত কি না সন্দেহ নেই। কারণও অবশ্য ছিল, বাবার রেখে যাওয়া টাকা ও বাড়ির বিষয়ে কাকা, মামা ও পিসিদের আগ্রহ দেখে সে শক্ত ব্যবহার করেছিল। সে একাই সামলাতে পারবে সব—এমন ঔদ্ধত্য অনায়াসে দেখিয়েছিল। সে মনে করিয়ে দেয়, তার যখন টায়ফয়েড হয়েছিল, হাসপাতালে নিতে হয় তাকে, খবর দেওয়া সত্ত্বেও দেখতে আসেনি কেউ। তখন শুভদীপ ও শ্যামলিম তার দেখাশুনো করে। জলবসন্ত হল যেবার, সেবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।
মা মনে করতে পারে সবই। সেই সময় তারা এমনকী আলোচনাও করেছিল নিজেদের মধ্যে যে দেবনন্দনের আত্মীয়রা ভাল নয়।
দেবনন্দন বলে যায়, বিয়ে হলে সে এমনকী জানাবেও না কারওকে। লৌকিকতা বলতে বন্ধুদের খাইয়ে দেবে একদিন। শুভদীপ অভিভাবকসুলভ গাম্ভীর্যে মনে করিয়ে দেয় তখন। শুচু কোনও ভারী কাজ করতে অক্ষম। এমনকী রান্নাও সে করতে পারবে না। সাধারণ দুকাপ চাও না। উনুনের পারে থাকা নিষিদ্ধ তার পক্ষে। তাকে নিয়মিত নিয়ে যেতে হয় হাসপাতালে। চিকিৎসকের কাছে। নিয়মিত দিতে হয় ওষুধ। তার প্রতি নজর রাখতে হয়, কখন বেড়ে ওঠে রোগ। আর বলতে বলতে উত্তেজিত হয়ে যায় সে। এখানে যেমন আছে শুচু, যতখানি যত্নে ও আদরেততখানি পারবে কি দিতে, দেবনন্দন, এমন প্রশ্নও করে বসে।
প্রত্যেকেই তার এই স্পষ্টভাষে স্তব্ধ হয়ে যায়। কিন্তু মনে মনে এই ভাষ্যের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করতে পারে না। দেবনন্দন মাথা নিচু করে থাকে। বহুক্ষণ। তারপর মুখ তোলে। আলোর আভায় করুণ দেখায় সেই মুখ। সে শান্তভাবে বলে, সে জানে, সমস্তই জানে। সে তো শুচুকে দেখে আসছে প্রায় তার বালিকাবেলা ৰ্থেকেই। শুচুর অনাদর সে হতে দেবে না এতটুকু, এমন কথাও সে দিয়ে বসে। যেন অপরাধী হিসেবে শনাক্ত সে আর তাকে দিয়ে কবুল করিয়ে নেওয়া হচ্ছে নানান প্রতিজ্ঞা।
মা তখন সান্ত্বনাবাক্য বলে বলে যে তারা সবাই সম্পূর্ণ আস্থা রাখে দেবনন্দনের ওপর। তবু শুচুর দাদা হিসেবে এই কর্তব্য করে নিচ্ছে শুভদীপ। বন্ধুত্বের খাতিরে করে নিচ্ছে, আত্মীয়তার খাতিরে করে নিচ্ছে।
দেবনন্দন মুখ ঘুরিয়ে নেয়। কিছু-বা অভিমানী দেখায় তার মুখ। মা তখন ঘোষণা করে আরও একটি কথা আছে তার। এবং দেবনন্দনের হাত জড়িয়ে ধরে মা। অনুনয় করে বলে, মেয়েকে তারা কিছুই দিতে পারবে না সাজিয়ে গুছিয়ে। এমনকী একটি খাটও নয়। অতি সামান্য যা সঙ্গতি আছে:তা বাবার স্বাস্থ্যের জন্য আগলে রাখতে হবে। দেবনন্দন মাথা নিচু করে রাখে। কোনও কথা বলে না। হ্যাঁ-না বলে না।
এতক্ষণ চুপ করে ছিল, এ বারে কথা বলে বিশ্বদীপ। প্রতিবাদের সুরে বলে–কেন এত কথা! দেবনন্দন তাদের চিরকালের চেনা। এত দিন ধরে আসছে-যাচ্ছে, তাদের কোন কথাটা জানেনা দেবনন্দন। তা হলে নতুন করে এই সমস্ত নাটকের মহড়া কেন!
আবারও এক স্তব্ধতা নেমে আসে। বিশ্বদীপ মাকে তারিখ ঠিক করে ফেলার নির্দেশ দেয়। মা শুভদীপের দিকে তাকায়। শুভদীপ উঠে বসে। দেবনন্দনকে জড়িয়ে ধরে। শুচু চলে যাবে বাড়ি ছেড়ে—এ ভাবনা তাকে আবেগপ্রবণ করে দেয়। চোখের জল উপচে দু এক ফোঁটা দেবনন্দনের পোশাকে পড়ে যায়। সে মুখ তুলতে চায় না: তৎক্ষণাৎ আবেগপ্রবণতা প্রকাশ করতে চায় না। দেবনন্দন বন্ধুর বিহ্বলতা টের পায়। এবং তারা কিছুক্ষণ, বেশ কিছুক্ষণ, পরস্পরের কাঁধে মাথা রেখে চুপ করে থাকে।
অতঃপর উঠে আসে শুভদীপ। হাসে। শান্ত ও নিরুদ্বিগ্ন হাসি। মাকে সেও দিন ঠিক করতে বলে দেয়। উজ্জ্বলতম দেখায় মায়ের মুখ। আকৰ্ণবিস্তার হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে যায় অভিব্যক্তি। এবং এক-একটি মুক্তোবিন্দু চোখ থেকে ঝরে পড়ে। একই সঙ্গে হাসিতেকীদে আর কান্নায় হাসতে থাকে মা। এবং উঠে দাঁড়ায়। আঁচলে জল মোছে। শুভদীপ-বিশ্বদীপের বাবাকে খবরটা দিতে হবে বলে ঘরের দিকে পা বাড়ায় আর যেতে যেতে শুফুকে নির্দেশ দেয় কাপ ও চিড়েভাজা-খাওয়া বাটিগুলো তুলে নিতে।
