শুচু তার দিকে তাকায়। চোখে চোখে নীরব কথা বিনিময় হয়ে যায় তাদের, আর শুচুর মুখ চাপা হাসিতে ভরে ওঠে। সে মভির গভীরে ঢুকে পড়ে দেখতে পায়, বোনের সঙ্গে এই নিঃশব্দের মা বিনিময়ে তার মন আলোয় ভরে যাচ্ছে। এ ভাষা একান্তভাবে তাদের কারও এতে কোনও অধিকার নেই। এই বিশাল জগতের কোধেপড়ে থাকা তাদের নিঃস্বপ্রায় সংসারে আগলে রাখার মতো একান্ত নিজস্ব কিছু আছে এখনও। কত দিন, কত দুঃখ ও বেদনার স্মৃতি, কত উদ্বেগ, যন্ত্রণা ও কষ্টের উপলব্ধি তাদের তিন ভাইবোনকে একসঙ্গে বিষণ্ণ করেছে। একজন আরেকজনের সান্ত্বনা হয়েছে কতবার! যেন দুঃখের বিপুল বোঝ—তারা তিনটি ভাইবোন ভাগ করে নিয়েছে বলে হালকা হয়ে গেছে আর শুধু দুঃখও তো নয়—কত য়ে উপকরণহীন মুখ, কত যে অকারণ হাসি-সব মিলে গড়েপিটে দিয়ে গেছে তাদের এ নিজস্ব ভাষা।
পড়ে পাওয়া চোদ্দো আনা দিলে আরও ভাল লাগা অতএব ঢুকে যায় প্রাণে। সে মার কাছে চিড়েভাজা আবদার করে বসে। কাঠখোলে ভাজা ময়। তেলে ভাজা। পেঁয়াজকুচি, কাঁচালংকা আর নুন দিয়ে ভাজা। মার কী যে হয়, আপত্তি করে না। শুভদীপের অন্তর নিঃসৃত ভাললাগা তারও অস্তর স্পর্শ করে বুঝি এবং আহত ছেলের প্রতি মমত্ববোধে অনুভূতি কোমল হয়ে থাকে। অতএব সে বলে না, এতখানি চিড়ে নেই ঘরে,কিনে আনতে টাকা লাগকে। বলে না, তেলে টান পড়বে মাসান্তে। কোনও গোপন ভাণ্ডার থেকে টাকা নিয়ে সে বিশ্বদীপকে চিড়ে আনতে দোকানে পাঠায়। নিজে রান্নাঘরে বঁটি পেতে পেঁয়াজ কুটতে বসে। এইসব ছোটখাটো কাজের জন্য সে শুচুকে বলতে পারত। কিন্তু শুচু দেবনন্দনের কাছে কাছে ঘুরছে। মায়ের ভাল লাগছে। তার মন বলছে শুভদীপ রাজি হবে। নিশ্চয়ই হবে। বড়ছেলের প্রতি বুক থেকে স্নেহ উপচে পড়ে তার। ছেলেটা ভাল। জানে সে। মনের গভীরে জানে। বড় শুদ্ধ ছেলে শুভ। বড়ই নরম। এবং একে-একে শুচু ও বিশ্বর প্রতিও স্নেহ ধাবিত হতে থাকে। সে মনে মনে বলে, তার সব সন্তানই ভাল। চমৎকার। অভাবে অভিযোগ নেই, এতটুকু দাবি নেই, সারাক্ষণ হাসিমুখে আছে। শুধু বড়টাকে যেন গম্ভীর লাগে আজকাল। মনমরা; অন্যমনস্ক। মা কারণ বোঝে না। ভাবে, ছেলে বড় হলে বিয়ে দিতে হয়। কিন্তু অভাবের সংসারে বউ আনবে কি! শুতে দেবে কোথায়! নিয়মিত ডালভাতও তো দিতে পারবে না। মার দীর্ঘশ্বাস পড়ে। কী সুন্দর দেখতে তার ছেলেদের। চাঁদের কণারা সব। বাপের সমস্ত সৌন্দর্য খাঁজ কোট বসানো। কিন্তু সংসারের হাল তো ফেরে না। মার চোখে জল আসো মানুষটা করে থেকে অসুস্থ। মেয়েটাও কী এক পোড়াকপাল নিয়ে জন্মাল! পেঁয়াজের ঝাঁঝে জল উপচে.চোখ থেকে গালে নেমে আসে। কান্না আড়াল করে মা। পেঁয়াজের রস দিয়ে কান্নাকে আড়ালে রাখে। আর কপালে হাত ঠেকায়। যেন বিয়ে হয়ে যায় মেয়েটার যেন শান্তিতে সুখে থাকে তারা।
শুভদী পরিষ্কার হতে কলপারে যায়। তিনদিনের ছুটি নেবার সংকল্প করে সে। তার বিশ্রাম প্রয়োজন। কল থেকে মুখে জলের ঝাপটা দেবার জন্য কোমর ঝোঁকাতেই কপাল টনটন করে, মাথা ঘুরে যায়। কলের মাথাটি ধরে কোনওমতে সামলে নেয় সে।
বিশ্রাম চাই। তার বিশ্রাম চাই। বহু দিন ছুটি নেয়নি। সেই কবে, ক্ষত দিন আগে মাইথন গিয়েছিল ছুটি নিয়ে। সে আর চন্দ্রাবলী।
চোখে-মুখে ভাল করে জল দেয় সে। ঘাড়ে জল দেয়া পা ধোয়া তারপর ঘরে যায়। বিশ্বদীপ ফিরে আসে তখন। কিছু বাদামও এনেছে সে। নিজের টাকায়। মাকে পাই-পয়সা হিসেব বুঝিয়ে দিচ্ছে। আর তখন আঁদুরে বসে শুচু আর দেকনন্দন গাঢ় চোখে তাকাচ্ছে পরস্পর। তাদেরও তৈরি হয়েছে নিজস্ব নৈঃশব্দ্যের ভাষা, পৃথিবীতে এই ভাষাই সবচেয়ে দ্রুতগামী এবং ভঙ্গুর।
শুভদীপ এসে মাদুরে শুয়ে পড়ে তখন। শুচু তার আদেশমতো বালিশ আর চাদর আনতে যায়। শীতের পোশাক কেউই চড়ায়নি গায়ে এখনও তবু তার শীতশীত করে। বিশ্বদীপ একধারে বসে সিগারেট ধরায়। আর শুভদীপ আচমকা দেবনকে মূর্খ সঙ্গমকারী বলে গালাগালি দিয়ে ওঠে। শুচুর প্রসঙ্গ দেবনন্দন তার কাছে এড়িয়ে গিয়েছে বলে কৃত্রিম ক্ষোভে ফেটে পড়ে সে। দেবনন্দন লাজুক হাসে। অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে অপারঙ্গমতা কবুল করে। ধীরে ধীরে ব্যাখ্যা করতে থাকে, অনেক বার বলবে বলে ভেবেছে। পারেনি। কেন পারেনি সে জানে না।
শুচু বালিশ ও চাদর নিয়ে আসে। শুভদীপ তাকে ঘরে যেতে নির্দেশ দেয়। শুচু দেবনন্দনের চোখে চোখ রেখে কোনও এক অকুতি অর্পণ করে চলে যায়। মা চিড়েভাজার বাটি সাজিয়ে নিয়ে আসে। তারা চা খাবে কি না জানতে চায়। সে মাকে চা নিয়ে এখানে বসতে অনুরোধ করে। সকলেই অনুমান করে অতঃপর কী হতে চলেছে। একটি উদ্বিগ্ন আবহ ঘুরপাক খেতে থাকে উঠোনে। বিশ্বদীপ হাওয়া হালকা করার জন্য নিজের চাকরির কথা পাড়ে। সম্ভাব্য চাকরির সুবিধা-অসুবিধা জানিয়ে দেবনন্দনের মতামত চায়। এর আগেও তাদের মধ্যে এই কথা হয়েছে। আজও হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। তবু আবারও একই প্রসঙ্গে তারা কথা বলে। দেবনন্দনও তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা খুলে বলে। ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিয়ে সে নিজের বাড়ির একতলায় একটি সাইবার কাফে খুলবে। বিশ্বদীপ তার ভাবনাকে সমর্থন জানায়। শুভদীপ চুপ করে থাকে। যা-যা বলতে হবে সব মনে মনে সাজিয়ে নেয়। তখন শুচু চা নিয়ে আসে। গ্যাসের কাছে যেতে দেওয়া হয় না তাকে। তাই সে বাহকমাত্র। শুভদীপ শুচুকে দেখতে দেখতে এ কথাও বলবে বলে ভাবে যে শুচু রান্না করতে পারবে না। হঠাৎই সে দেবনন্দনের প্রতি বন্ধুত্ব অনুভব করে না আর। অভিভাবকত্বের বোধ তাকে একটি পৃথক সত্তায় টেনে আশৈশবের বন্ধুত্বের থেকে আড়াল করে দেয়। সে টের পায়, এমনই কোনও আড়াল থাকায় দেনন্দনও তাকে কিছু বলতে পারেনি। অনেকবারের মতো আরও একবার সে উপলব্ধি করে, যতই সচেতনভাবে অস্বীকার করা যাক, সমস্ত মানুষের মধ্যে ঘাঁটি গেড়ে বসে থাকে সমাজ-সংসার। কিছু কিছু অস্বীকারের পর থাকে যোজনবিস্তৃত স্বীকারের দায়। নিজের অজান্তেই সেই সব স্বীকারের ভার কাঁধে নিয়ে পথ চলে মানুষ।
