তারা তখন আলোচনা করে। বিবাহের দিন ও উত্তরপৰ্ব নিয়ে আলোচনা করে। শুভদীপ জানতে চায়, এই তিনদিনের মধ্যেই বিয়েটা সম্পন্ন করা যায় কিনা, কারণ সে ছুটি নেবে। সবটাই নির্ভর করছে মায়ের ওপর। বিশ্বদীপ বলে। কারণ শুভ দিনক্ষণ দেখতে চাইবোমা। তখনি মা এসে পড়ে। বাবা সে সংবাদ শুনে অত্যন্ত খুশি–এ সংবাদ পরিবেশন করে যায়। পাশের বাড়ির ভর্তি জ্যাঠাইমার কাছ থেকে পঞ্জিকা আনতে ছোটে। আলিবাবার বউয়ের কথা মনে পড়ে যায় শুভদীপের। প্রচুর ধনরত্ন নিয়ে জঙ্গল থেকে আলিবাবা ফিরে এলে পর বউ যেমন কাশেমের বাড়ি কুনকে আনতে ছুটেছিল!
ব্যয়বাহুল্যে তাদের বাড়ির সমস্ত-পালাপার্বণ বন্ধ হয়ে গিয়েছে কবেই। পঞ্জিকাও লাগে না তাই। শুভদীপের ভয় হয়, মা হয়তো আনন্দে বলে বসতে পারে, শুচুর বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। বিয়ের সব ঠিকঠাক, বিয়ের সম্বন্ধ দেখা চলছে, বিয়ের বাজার করতে যেতে হবে, বিয়ের জোগাড় এই সব কাজে মেয়েদের ক্লান্তি নেই। উৎসাহ আকাশপ্রমাণ। মা যদি বলে দেয়, তবে লৌকিকতার দাবি উঠতে পারে। সমস্ত জ্ঞাতিগোষ্ঠী হয়তো তখন নতুন মেয়ে-জামাইকে আশীর্বাদ করতে এল। সে এত বড় খরচ সামলাতে পারবে না। আশীর্বাদ করতে এলে তাকেও তো অন্তত মিষ্টিমুখ করাতে হবে।
দেবনন্দন কথা বলে তখন। বিয়ের সমস্ত ব্যয়ভার সে বহন করতে চায়। শুভদীপ দৃঢ়স্বরে না বলে। বিয়ের দিনের খরচ সমস্তই তার। দেবনন্দন জিজ্ঞাসু চোখে তাকায়। শুভদীপ জানতে চায় দেবনন্দন অগ্নিসাক্ষী করতে চায় কিনা। দেবনন্দন অসম্মতি জ্ঞাপন করে। বিয়ে নিবন্ধীকরণ করবে সে। তারা আলোচনা করে তখন।তিনজনের আলোচনায় স্থির হয়, যে দিনই ঠিক হোক–দেবনন্দন সেকালবেলা চলে আসবে এ বাড়ি। শুচুকে নিয়ে তারা চলে যাবে শিবাগী মায়ের মন্দিরে। সেখানে শুচুকে সিন্দুর দেবে দেবনন্দন। বিকেলে যাবে বিবাহ নিবন্ধকারের কাছে। রাতে সকলে বাইরে খেয়ে ফিরবে।
মা তখন পঞ্জিকা নিয়ে আসে। জেঠিমা ছিল না বাড়িতে। তাই কেউ কিছু জিগ্যেস করারও ছিল না। মা চোখে চশমা এঁটে ঘরে বসে পঞ্জিকা দেখে কিছুক্ষণ। তিনদিন পর একটি শুভদিন পাওয়া যায়। এটা অগ্রহায়ণ মাস। শুচু এ মাসে জন্মায়নি। মা দেবনন্দনের জন্মমাস জানতে চায়। সে জানায় তার শ্রাবণ। অতএব তিনদিনের পরের দিনটি স্থির হয়ে থাকে। শুভদীপ স্থির করে, তিনদিন নয়, সে চারদিন ছুটি নেবে।
১২. কত অগ্রহায়ণ পার করে
কত অগ্রহায়ণ পার করে এসেছে তারা। কত শীত ঋতু। কিন্তু এ রকম সকাল তাদের উঠোনে, তাদের ঘরে, পরিবারে আসেনি কখনও। কী আশ্চর্য প্রসন্ন এ সকাল! কী সুন্দর! ঘুম থেকে উঠে উঠোনে দাঁড়াতেই তার মনে হল—আজকের রোদুর খুব খুশি। পাঁচিলের পলেস্তারা খসে যাওয়া ইট থেকে যেন আভা বেরোচ্ছে। কলতলাটা কী আশ্চর্য পরিচ্ছন্ন। যেন এক বালতি সুখ এসে ধারাস্নান রচনা করছে কলের তলায়। আকাশ কী রকম আনন্দ-আনন্দ! পাখিরা কীরকম আনন্দ-আনন্দ। সুবল রোজকার মতোই বলছে, হরে হরে কৃষ্ণ কৃষ্ণ, বলছে তাকে ছোলা দেওয়া হোক, লংকা দেওয়া হোক, উঠোনের কোণে শালিক-চড়ুই কিচকিচ করছে, এধার থেকে ওধারে উড়ে যাচ্ছে কাক। সবই হুবহু রোজকার মতো কিন্তু যেন রোজকার মতো নয়। সুবলের এই ডাকের মধ্যে জীবনের এক গাঢ় ইঙ্গিত যেন আছে। কাক-শালিক-চড়ুইয়ের আনাগোনা আর ডাকাডাকির মধ্যে যেন আছে প্রাণের আশ্চর্য ব্যাখ্যা।
তাদের ঘরগুলিতে তোরঙ্গ থেকে ভাল বিছানার চাদর, টেবিল-ঢাকনা বার করে পেতে দেওয়া হয়েছে। ফুলদানিতে বড় বড় রজনীগন্ধার ছড়া। জিনিসে ঠাসা ঘর তাদের, সেজে উঠেছে নতুন সাজে। কী সুন্দর লাগে একটু সাজালে-গোজালে! যেন অগ্রহায়ণের সাজ-পরা রোদুবই আধখানা ঢুকে পড়েছে ঘরে। ফুলদানি থেকে রজনীগন্ধা ফুলের গন্ধ ছড়িয়ে যাচ্ছে। কাকে যেন খুঁজে ফিরছে একা একা। বিশ্বদীপ সানাইয়ের ক্যাসেট চালিয়ে দিল আর তক্ষুনি সারা বাড়ি ভরে গেল হুলুধ্বনিতে। আর রজনীগন্ধার গন্ধ মিশে গেল সুরে। তার একাকীত্ব ঘুচল। যেনঞতক্ষণ সুরেরই আরাধনা করছিল সে।
তাকে তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নেবার জন্য তাড়া লাগাল মা। বাজার করতে হবে। নটা নাগাদ এসে পড়বে দেবনন্দন। তারা শিবানী মায়ের মন্দিরে যাবে।
সকাল-সকাল স্নান সেরে নিয়েছে মা। কপালে সিঁদুরের টিপ দিয়েছে বড় করে। চুল খুলে দিয়েছে। সেই চুল ঠাকুরের চুলের মতো ছড়িয়ে আছে পিঠময়। লাল পাড় সাদা খোল সুতির শাড়ি পরেছে মা। সন্ধেবেলায় পরবে কোরা রঙের ওপর লালপাড় ধনেখালির তাঁত।
মা জিগ্যেস করেছিল তাকে, কত টাকা সে খরচ করতে পারবে। সে না ভেবেই ঝলছিল সাড়ে তিন হাজার টাকা। সঠিকভাবে ধরলে তিন হাজার আটশো আঠারো টাকা। মা অবাক তাকিয়েছিল। আর তার হাত উঠে গিয়েছিল কপালে। সে মনে মনে সেই দুই ব্যক্তিকে ধন্যবাদ দিয়েছিল আবার। হয়তো তাঁদের সঙ্গে কোনও দিনই আর দেখা হবে না তার।
মা একটু ভেবেছিল তখন, সংসারের হিসেব রাখতে রাখতে মা এমন পাকা হিসেবি। মনে মনে দ্রুত যোগ-বিয়োগ করে নিতে পারে। ব্যাঙ্কের সেভিংস অ্যাকাউন্টে মাত্র দু’ হাজার পড়ে আছে। তার থেকে এক হাজার তুলে ফেলতে চায় মা। শুচুর জন্য একটা ভাল রেশমি শাড়ি কিনে দিতে বলে।
সে আর বিশ্বদীপ মিলে কিনে এনেছে শাড়ি। হলুদ জমি। লালের ওপর সোনালি জরির কাজ করা পাড়। এ ছাড়া ফুলিয়ার তাঁতও নিয়েছে একখানা। লালজমি। সোনালি চওড়া পাড়। তারা দু’জন কতখানি শাড়ি পছন্দ করতে পারত তার ঠিক ছিল না। শুচুই পরামর্শ দেয় মিঠুকে সঙ্গে নেবার জন্য। মা জানে না মিঠুর কথা। অতএব মিঠু বাইরে থেকে তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। এবং মিঠুরই পরামর্শে তারা কিনে নেয় শাড়ির সঙ্গে রং মেলানো ব্লাউজ ও শায়া ইত্যাদি। আজ বিকেলেও সঙ্গে যাবে মিঠু। কারণ বাবাকে আগলানোর জন্য মা থাকবে বাড়িতে। মা যায়েম। দেবনন্দনের সহচর হিসেবে সঙ্গে যাবে শ্যামলিম আর প্রণয়।
