তার সমস্ত ঘোর কেটে যেতে থাকে। মাথার জমাট মেঘ খুলে স্কুলে যায়। ভেসে যায় অন্য গাঁয়ে। অন্য দেশে। আর সে সন্ধানে ব্যাপৃত হয়। কারণের সন্ধানে রত থাকে। জনের অর্থপ্রদানের যুক্তিসম্মত কারণ বুঝতে পারে। কিন্তু ছেলেটির আচরণের থই পায় না। জীবনের গায়ে লেগে থাকা ব্যাখ্যাহীন সহস্র বিস্ময়ের সংশয় ক্লান্ত করে। সে এক সাদা-মাটা মানুষ তুচ্ছতর মানুষ, হঠাৎ জীবন, একটি দিনের জন্য তার কাছে হয়ে যায় পড়ে পাওয়া চোদ্দো আনা। আর এফ এম বেতারের গান প্রতিহত করে আর মনোঅনুরণিত হয় বহুদিন আগেকার সুর। কলেজ সময়কার সুর। কখণ্ড সময় আসে, জীবন মুচকি হাসে, ঠিক যেন পড়ে পাওয়া চোদ্দো আনা…তে রীতিমতো গুনগুন করে। বাইরের দিকে তাকিয়ে অপস্রিয়মাণ দোকান বাজার-লোক আনমনে দেখতে দেখতে সুমনকে গায়–
কখনও সময় আসে, জীবন মুচকি হাসে
যেন পড়ে পাওয়া চোদ্দো আনা
অনেক দিনের পর মিলে যাবে অবসর
আশা রাখি পেয়ে যাব বাকি দু’আনা।
একবার গায় সে। দু’বার গায়। এবং তৃতীয় বার গাইবার সময় মনে করতে পারে না পরের স্তবক। কী ছিল যেন! কী ছিল! কিছুতেই ধরা দেয় না শব্দগুলি।
সুমন চট্টোপাধ্যায়ের গান কত প্রিয় ছিল তখন। মুখস্থ হয়ে যেত একের পর এক। কী ভীষণ অনুপ্রাণিত হত তারা প্রত্যেকে। সব বন্ধুরা। টিউশনের ঝক্কি গায়ে লাগত না। বাবার অসুখ, বোনের নীলাভ জীন গাঁয়ে লাগত না। সবসময় টগবগে, চনমনে ছুটতে থাকা এক। থিতিয়ে গল কবে থেকে স। বদলে গেল কত। চন্দ্রাবলীর নিরন্তর সান্নিধ্যে, কে শাস্ত্রীয় সংগীতে টান লেগে গেল তার। অতএব, যখন যতটুকু পারে, কিনে নেয় কিশোরী আমনকর, পদ্মা তলোয়ালকর, কিংবা উল্লাস কশলকর ও ভীমসেন যোশী। সেসবেও ধুলো পড়ে গেছে। শুচু শোনে না এসব। বিশ্বদীপও শোনে না। ঙ্গি কেবল একা একা এইসব এনেছিল ঘরে আর একা একা বিস্মৃত হয়েছে। নিজস্ব ভাললাগা প্রতিস্থাপন করেও. সে ভুলে গেছে সমস্ত আকাশ।সুমনের গান আর একটিও পুরোপুরি মনে নেই। রাগে রাগিণীতে সে আর নোনাধরা জীবনকে ভরিয়ে রাখে না ভোরে। সে শুধু ভাবে। মৃত্যু সম্বল করে পাড়ি দেয় রোজকার পথ।
তবু আজ, জীবনের ভার অনেকটা নির্মল করে দেয় সুমনের মনে পড়া গান। ঠিক যেন পড়ে পাওয়া চোদ্দো আনা এই গোটা দিন চার হাজার টাকা হয়ে তার হাতে পোষা বেড়ালের মতো বসে থাকে। মিনি পুষিটির মতো সে টাকাদের গায়ে হাতও বুলিয়ে দেয়। তারপর সযত্নে ব্যাগে পুরে রাখে। গুনে গুনে একশো টাকার দুইখানি নোট তুলে জামার পকেটে রাখে। ট্যাক্সির ভাড়া হিসেবে। বাড়ি নিকটতর হয়। আর সে ভাবে। বঁদ হয়ে ভাবে কী কী করবে এই টাকায়। থই পায় না। তার মনে হয় সমস্ত ছোট-ছোট চাহিদাগুলি পূর্ণ করা আছে। আর সমস্ত বড়বড় চাহিদাগুলি চার হাজারে পূর্ণ হয় না। অতএব এই টাকা মুহূর্তে অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়।
মাঝে-মাঝে টাকার কথা বলত চন্দ্রাবলী। অনেক টাকা পেলে কী কী করবে বলত। তার সেই দীর্ঘ তালিকায় শুভদীপের বাবা আর বোনকে বিদেশে না হোক, অন্তত ভেলোরে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করিয়ে আনার কথাও বাদ যেত না।
আর তিন বছর বাদের বৃহস্পতির দশা আসছিল তার। সে স্থির করেছিল সেই সময় কোটি টাকার লটারি কিনবে। যদি লেগে যায়। বৃহস্পতির দশাই জীবনের সেরা সময়। তখন একটা লটারি, লেগে যেতে পারে। ছোটখাটো প্রাপ্তি সে চায়নি। ধরা যাক, এক লাখ কি দু’লাখ সে চায়নি। সে চেয়েছিল—এমনই থেকে যাবে বরাকর যেমন আছে। নিম্নবিত্ততায়। অথবা বৈভবের শিখরে থাকবে সেঞকিছুটা পেল, যা সে খরচ করতেও পারল না প্রাণ খুলে, আবার-যাকে রাখতেও বিবেকে বাঁধল—এমন কিছু সে চায়নি। শুভদীপ লোভী ভাবত চন্দ্রাবলীকে। টাকার স্বপ্নে বিভোর ভাবত। একদিন বলে ফেলেছিল, এতই যখন টাকার চাহিদা তখন সে রবিদাকে ছেড়ে এল কেন!
চন্দ্রাবলী রাগ করেনি। কষ্ট পায়নি। শুধু চাপা স্বরে বলেছিল, সে কি জানে না, আত্মসম্মানের জন্য মানুষ সব করতে পারে! এক টানে ফেলে দেয় সব ইচ্ছা, সব স্বপ্ন, সব চাহিদা। জীবনে কখনও কখনও আসে এরকম প্রশ্ন। আত্মসম্মানের প্রশ্ন। আত্মসম্মানের বিনিময়ে সর্বস্ব খোয়াবার প্রশ্ন। সে কি জানে না? জানে না কি?
১১. দরজা খুলে দেয় শুচু
দরজা খুলে দেয় শুচু। আর তার কপালে লিউকোপ্লাস্ট দেখে চিৎকার করে ওঠে। সঙ্গে সঙ্গে মনস্থির করে সে। ট্যাক্সির ভাড়া একশো বিরাশি টাকা বাদ দিয়ে তিন হাজার আটশো আঠারো টাকা সে খরচ করবে শুচুর বিয়েতে।
শুচুর চিৎকারে মা ছুটে আসে দরজায়। ভাই আসে। আর দেবনন্দন। অসময়ে তাকে দেখে, কপালে লিউকোপ্লাস্ট দেখে আলোড়ন পড়ে যায়।
সে ঘরে আসে। বসে পড়ে বিছানায়। মাথা ঘুরে পড়ে যাবার কথা, জ্ঞান হারাবার কথা গোপন করে যায়। শুধু লোহার দরজায় ধাক্কা লাগার কথা বলে। সকলকে বিচলিত হতে বারণ করে। মা চা করতে ছুটে যায়। ভাই গভীর চোখে জরিপ করে। শুচু চুলে হাত বুলিয়ে দেয়। বারবার তাকে শুয়ে পড়তে অনুরোধ করে। বাবা টিভি বন্ধ করে দেয়। আর দেবনন্দন লাজুক মুখে কাছে আসে। সে চিকিৎসকের কাছে যাবে কিনা জানতে চায়।
সে দেবনন্দনের হাত ধরে এবং যদিও তার শুয়ে পড়তে ইচ্ছা করছিল, তবু উঠোনে গিয়ে বসার প্রস্তাব দেয়। শুচু মোড়া পেতে দিতে যাচ্ছিল, সে তখন তাদের শতরঞ্চিখানা উঠোনে বিছিয়ে দিতে বলে। সে, দ্রেবনন্দন এবং বিশ্বদীপ সেখানে বসে কথা বলতে পারবে তা হলে।
