চোখ মেলছে সে। চালকের পাশের খোলা জানালা দিয়ে হু-হু হাওয়া ঢুকে পড়ছে। হাত-পা হিম হয়ে আছে তার। জমাট অন্ধকারে পথ করে ছুটছে ট্যাক্সি। সে হয়তো বা একটি মাঠের পাশ দিয়ে যাচ্ছে। তার চোখে পড়ছে মাঠের কোনায় জলের ফোয়ারা। তার ওপর রঙিন আলো পড়ছে। ফোয়ারার জল নৃত্যপর। সে জানে, ওখানে গান বাজছে। আর গানের তালে তালে ফোয়ারার জল নৃত্যপর। সন্ধে যেতে না যেতেই জেগে উঠেছে নাগরিক মুনসিয়ানা।
সে ব্যাগের চেন খোলে। জনের দেওয়া খাম খোঁজে ভেতরে,আজও সে যেতে পারেনি সেই ভ্রমণ সংস্থায়, জনের দেওয়া বৃদামাতার অর্থে ভরসা করে ট্যাক্সি নিয়েছে। না হলে, এই অসুস্থ অবস্থায় তাকে বাসে চাপতে হত। এই সন্ধ্যায় ঘর-ফিরতি যাত্রী বোঝাই বাস। সে দম নিতে পারত না। ব্যথা জায়গায় ব্যথা পেত আবার। এই যেমন একটু আগে ঘুমিয়ে পড়েছিল, তেমনি হলে কেউ পা মাড়িয়ে জাগিয়ে দিত তাকে। কেউ কনুইয়ের তঁতোয়। ধীরগামী বাসে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হত ঠায়, আর এই শীতের সন্ধ্যায় এখন তার হাত-পা হিম হয়ে যাচ্ছে, তখন সে ঘেমে উঠত। সারাদিন পরিশ্রম করা, ক্লান্ত, বিরক্ত, তিরিক্ষি মেজাজের মানুষগুলির সঙ্গে দাঁড়িয়ে থেকে থেকে ঘেমে উঠত। আর, হয়তো, কে জানে, অজ্ঞান হয়ে যেত আবার।
সে হাতে খামের অস্তিত্ব টের পায়। দুআঙুলে ধরে বার করে আনে। ট্যাক্সির ভিতরকার আধো আলো আধো অন্ধকার খামটি সম্পর্কে মনে বিভ্রম জাগায়। ঠিক এরকমই খাম তাকে দেননি জন। কিছু একটা তফাত। কিছু একটা অন্যরকম। সে মুখ খোলে। খোলা মুখ ডান হাতে ধরে বাঁ হাতে উপুড় করে দেয়। আর দেখতে পায়, একটি ভাঁজ করা কাগজের ওপর সার সার একশো টাকা। তার বাঁ হাতে ভর দিয়ে, খামে অর্ধাংশ লুকিয়ে সোজা। শিষ্ট। সে বার করে নেয় সব। গুনে মোট তিন হাজার টাকা আবিষ্কার করে। এবং কিছু বুঝতে পারে না। ভাঁজ করা কাগজটি খোলে। চিকিৎসকের নিদানপত্র। ছেলেটির মুখ ঝলকে মনে পড়ে যায়। সে বিশ্বাস ‘ করতে পারে না। নিজের উপলব্ধিকে বিশ্বাস করতে পারে না। সে সন্দেহ করে, জনের দেওয়া টাকা সে এই খামে পুরে ফেলেছে কিনা। ঘোরের মধ্যে, ঘুমের ঘোরের মধ্যে, সে এই ধরনের কাজ কিছু করে ফেলেছে কি না। এমনকী এই সম্ভাবনার কথাও বিশ্বাস করতে পারে না সে। সে তখন গুনতে থাকে। একে একে গুনতে থাকে। তিরিশে দাঁড়ায়। আবার গোন। আবার গোনে। আবার! তার কাছে তিন হাজার টাকা!
সে তখন আবার ব্যাগ খোঁজে। এবং আরও একটি খাম পেয়ে যায়। ব্যাখ্যাতীতভাবে তার মনের মধ্যে প্রত্যাশা জাগে—এই খাম খুলেও সে পেয়ে যাবে পরিষ্কার টান-টান ত্ৰিশখানা একশো টাকার নোট। গভীর আগ্রহে খামে উঁকি মারে সে৷ আছে। টাকা আছে। আগের খামটি উরুর নীচে চেপে রেখে সে গুনতে থাকে। তার ক্লান্তি হঠে যায়। কপাল ব্যথা করে না। নিম্নচাপমুখী রক্ত, ঊর্ধ্বচাপের সম্মুখীন হয়। আর ঝকমকে টানটান টাকার পরিবর্তে সে পায় ময়লা নরম একশোটি দশ টাকা। এক হাজার টাকা সর্বমোট। তার আর দ্বিতীয়বার গুনতে ইচ্ছা করে না। তার কাছে এখন চার হাজার টাকা! হঠাৎ নিজের ভাবনায় লোভী প্রত্যাশায় সে চমকে ওঠে। দারিদ্রের ধাক্কায় এ কোথায় নেমে এসেছে সে! লজ্জায় উত্তপ্ত হয়ে যায় কান। তার ইচ্ছে করে, সমস্ত টাকাই সে উড়িয়ে দেয় জানালা দিয়ে। এই পৃথিবীতে অনাদৃত উপলখণ্ডের মতো ফেলে রাখে ভুয়ো কিংবা ফিরিয়ে দিয়ে আসে সেই সব দাতা কর্ণদের।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারে না কিছুই। তার মনে পুড়ে, এই সব টাকার অনুগ্রহ এখনই সে নিয়ে বসে আছে। ট্যাক্সিভাড়া দিতে হবে তাকে। অসহায়তায় কান্না পায় তার। কেন তাকে এতখানি অনুগ্রহ করা হল। তাকে কি দেখলেই খুব দুঃস্থ লাগে এখন? দেখলেই কি মনে হয় সে মূল্যহীন। অক্ষম! সংসার প্রতিপালন করতে পারে না। এমনকী আত্মপালনেও দড় নয়। সে নিজের পোশাকের দিকে তাকায়। রাস্তায় পড়ে গিয়েছিল বলে শার্ট ময়লা হয়ে আছে। কালই কাচা হয়েছিল বলে ইস্ত্রি করেই পরে নিয়েছে প্যান্ট। বাড়িতে ইস্ত্রি নেই। রাস্তার মোড়ে ইস্ত্রিওয়ালার কাছে যেতে হয়। তার আর ইচ্ছে করেনি। চন্দ্রাবলীকে মনে পড়ে তার। সে বলত, নিজের আচরণে, অবয়বে নিজের দৈন্য প্রকাশ করতে দিতে নেই। দৈন্য প্রকাশ পেলে মানুষ হয় তাচ্ছিল্য করে, নয়তো করুণা করে। তাচ্ছিল্ল্য ও করুণা দুই-ই মানুষকে করে দেয় মেরুদাঁড়াহীন।
সে কি তবে হয়ে যাবে মেরুদাঁড়াহীন, আর চেয়েচিন্তে, দয়া ও করুণার দ্বারা বেঁচে থাকবে আজীবন? ভয় করে, অসম্ভব ভয় করে তার। এই যে নগরের এত আলো, এই যে এত বড় শহরের এত প্রাণ, এত উল্লাস কিছুই দেখে না সে। শুধু দেখে অন্ধকার। আপামর অন্ধকার। আদিঅন্তহীন। লয় নেই, ক্ষয় নেই এক দুর্মদ অন্ধকারে সে একা একা তলিয়ে যেতে থাকে। আর টের পায়, টের পেতে চায়, এই অন্ধকারের অন্য নাম জীবন। কালো, কুৎসিত, জিঘাংসায় পরিপূর্ণ জীবন। এর থেকে মুক্তির আকুলতায়, আলোয় আলোময় মৃত্যুকে আঁকড়ে নেবার আকুলতায় সে ছটফট করে। কেবলই ছটফট করে।
আর তার অন্যমনস্কতায় ঊরুর ভাঁজে রাখা খাম নীচে পড়ে যায়। সে তুলে নেয় খাম আর মনে পড়ে ছেলেটিকে। মৃত্যুর রূপেপাসনা ছেড়ে সে তখন ছেলেটিকে ভাবে। তার আশ্চর্য আচরণ ভাবে সনে পড়ে যায় তার আঙুল সঞ্চালন। ছেলেটির মধ্যে কোথায় কিছু ব্যতিক্রমী ছিল। কী, সে বুঝতে পারে না। মেলাতেও পারে না কিছুচ্ছেলেটি অসুস্থ অবস্থায় তাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল। চিকিৎসক এনে তাকে পরীক্ষা করিয়েছিল। শুক্রয়া করেছিল তাকে। ময়লা শার্ট খুলে পাঞ্জাবি পরিয়েছিল। ছেলেটির বিছানায় শুয়েছিল সে। এবং বিনিময়ে সে নামও জিজ্ঞেস করেনি। চরম অভদ্রতা নামও জিজ্ঞেস করেনি।
