এ কি স্বাভাবিক? সে ভাবে। হয়তো স্বাভাবিক নয়। শুধু দেখা, শুধু একটি দুর্ঘটনা দ্বারা সম্পর্ক রচিত হয় না। হতে পারত, যদি সে হত নারী! পুরুষ হয়ে পুরুষকে কামনা না করে সে যদি নারী হয়ে পুরুষকে কামনা করত, তবে এই দুর্ঘটনা, স্পর্শ, শুশ্রুষা কাহিনি হতে পারত। এই প্রথম, নারী নয় বলে কষ্ট হয় তার। সে আলমারি খোলে। তার মনে হয়, এই যে রক্তপরীক্ষার নির্দেশ—এই সব তারই করার কথা ছিল। এই ওষুধের নিদান—এই সব তারই দেবার কথা ছিল। সে তো কোনও দিন কিছু করেনি কারও জন্য। সে শুধু নিজেকে কেন্দ্র করে বিনিময় করে গেছে। এ তার নতুনতম বোধ। এই উপচিকীর্ষা। এই আপন করে নেবার ইচ্ছা। সে একটি খামে চিকিৎসকের নির্দেশপত্র পুরে দেয়। সঙ্গে থাকে তিন হাজার টাকা। এটুকুই ছিল তার কাছে। সে দিয়ে দেয়। বলে কিছুই। চিকিৎসকের নির্দেশপত্র হিসেবে ধরিয়ে দেয় ছেলেটির হাতে। ছেলেটি আবারও ধনাবাদ দিয়ে খাম ব্যাগে পোরে। সে দেখতে পায়, তার প্রেমের প্রণামী চলে যাচ্ছে ব্যাগের গহ্বরে।
ছেলেটি ধন্যবাদ ছাড়া একটিও কথা বলে না আর। নাম বলে না। নাম জানতেও চায় না। বাইরে বেরিয়ে আসে।ঞ্জসে-ও সঙ্গে সঙ্গে আসে। ছেলেটি ট্যাক্সি ডাকে। সে দাঁড়িয়ে থাকে। ট্যাক্সির দরজা বন্ধ হয়ে যায়। সে দাঁড়িয়েই থাকে। ছেলেটি জানালা দিয়ে হাত বাড়িয়ে দেয়। সে তৎক্ষণাৎ চেপে ধরে সেই হাত। ট্যাক্সি চলার উপক্রম করে আর সে ছেলেটির হাতে চুম্বন এঁকে দেয়। বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে হাত ছাড়িয়ে নেয় ছেলেটি৷ ট্যাক্সি চলতে থাকে। ক্রমশ একটি কালো বিন্দুর মন্ত্রে মিলিয়ে যায় দুরে।
সে ঘরে ফিরে আসে। ফাঁকা লাগে। খুব যফাঁকা লাগে। মেলে দেওয়া গেঞ্জিটি হাতে নেয় সে। গন্ধ শোঁকে। নতুন পুরুষের গন্ধ। যাকে ভাল লেগেছিল, পেল না। পাবার সম্ভাবনাও নেই। আফসোস হয় তার। যে কার্ডটা পেয়েছিল, রেখে দিতে পারত। কপালে করাঘাত করতে থাকে সে। ভেতরটা হাহাকারে ভরে যায়। যে বালিশে শুয়েছিল ছেলেটি শুভদীপ? সে কি শুভদীপ? জেনে নেওয়া হল না আর। যে-বালিশে শুয়েছিল সে-তাতে মুখ রেখে, গেঞ্জিটি বুকে চেপে ফুপিয়ে ওঠে রমণীসুলভ পুরুষ। কিছুক্ষণ। তারপর টেলিফোন টেনে নেয়। ফোন করে। আজ আর লোক নেবে না সে। তার ভাল লাগছে না।
১০. একবার কপালের ফোলা জায়গায়
একবার কপালের ফোলা জায়গায় হাত রাখল সে। বাথা কম লাগছে। ঘুম-ঘুম ভাবটা যায়নি, এখনও। ঠিকমতো ভাবতেও পারছে না। মস্তিষ্ক ক্লান্ত। সমস্ত শরীর জুড়ে গভীর বিয়াদ। ট্যাক্সিতে পিঠ এলিয়ে দেয় সে। এখনও অনেকটা পথ। তারপর বাড়ি। সে যেন বাড়ি যায়নি কত দিন! মাবাবা-ভাই আর শুচুকে দেখতে পায়নি কত দিন! আজ সকাল থেকে এই সন্ধে পর্যন্ত সে যেন কয়েকশো বছর পেরিয়ে এসেছে। ঘুমের ভেতর দিয়ে, ঘোরের ভেতর দিয়ে সে যেন পরিক্রমা করে গেছে শত শত বৎসরের পথ। সে ছুটি নেবে। ক্লান্ত সে। ক্লান্ত বড়ই।
ছুটি নেবে। কিন্তু কত দিন! চিকিৎসক বলেছিলেন তার রক্তচাপ নিম্নমুখী। হয়তো সে-কারণে দু’বার মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিল। না। প্রথমবার ধাক্কা খেয়ে পড়েছিল। এবং জ্ঞান হারিয়েছিল। তা হলে জ্ঞান সে হারিয়েছিল দু’বার। একই দিনে। সে টের পায় বিশ্রাম প্রয়োজন তার। সকাল থেকে পর পর যা কিছু ঘটে গেছে মনে করে সে। শুচুকে মনে করে। তখন গাড়িচালক এফ এম বেতার চালিয়ে দেয়। সে একটি গানের শেষ কয়েকটি লাইন শুনতে পায়। ক্রমশ কি হয়েআসা গানের শব্দগুলি আনমনে শুনতে শুনতেশসে:আবিষ্কার করে, একটিই পক্তি বার কার গাওয়া হচ্ছে। বাঁধ ভেঙে জল এসেছে বানভাসি। সে জানে না কার গান। কিন্তু যে-গান সে জানে, তাকে চমকে দিয়ে সেই গানই বৈজে ওঠে অতঃপর। ধাঁধার থেকেও জটিল তুমি, খিদের থেকেও স্পষ্ট—! কী হতে পারে? তার শুচু মনে পড়ে, চন্দ্রাবলী মনে পড়ে, শুচু-চন্দ্রাবলী-শুচুচন্দ্রাবলী। চোখের সামনে সুবলের খাঁচা দুলতে দুলতে যায়। সে খাঁচা শূন্য। সুবল নেই। শূন্য খাঁচা একবাটি ছোলা নিয়ে, দুখানি কাঁচালংকা নিয়ে দুলতে দুলতে যায়। তার কান ঝালাপালা হয়ে যায়। ঘেন্না করো ঘেন্না কাে’ ‘ঘেন্না করো ঘেন্না করো’ বলতে বলতে কারা যেন ধাবিত হয় তার দিকে চোখ বড় করে তাকায় সে। দুজন পূর্ণবয়স্ক নারী। একজন অন্ধকার। বিপুলকায়। খোলাচুল মেলে দিয়ে উধর্ববাহু। অন্যজন শীর্ণ। শ্যামলা। দুই কাঁধে দুই বিনুনি ফেলে নতমুখী।
চশমা খুলে চোখ মোছে সে। পিঠ সোজা করে সামনে তাকায়। দ্রুত পিছলে যাচ্ছে পথ-ঘাট। পিছলে যাচ্ছে ‘ঘরবাড়ি, মানুষজন। কোথাও কোনও খাঁচা নেই। চন্দ্রাবলী নেই। শুধু নেই। তবুও এক বিরাট খাঁচা সে অনুভব করে। আর বিরাট খাঁচার সীমাবদ্ধতায়, বিরাটের সীমাবদ্ধতায় ছটফট করে প্রাণ। সে সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়। সিদ্ধান্ত নেয়, শুচুর সঙ্গে দেবনন্দনের বিয়েতে রাজি হয়ে যাবে। সিদ্ধান্ত নেয় সে এবং একরকমের আরাম বোধ করে তৎক্ষণাৎ। তার ঘুম পায় আবার। প্রলম্বিত জ্বম্ভণ দেখা দেয় মুখে। ট্যাক্সিতে ঘুমিয়ে পড়া উচিত হবে না ভেবেও সে অতঃপর এলিয়েই পড়ে। টুকরো টুকরো জন আসে তার চোখে। টুকরো টুকরো পাখির ডাক। হাড়ের টুকরো। একটি বিশাল কুয়োর গায়ে বন্ধ দরজা। সে পায়ে পায়ে দরজার কাছে দাঁড়ায়। তার ঠোঁটের দিকে ঠোঁট বাড়িয়ে দেয় এক মস্ত শকুন। সে হু-হাস্ করে, তাড়াবার চেষ্টা কর। পারে না। বরং সেই শকুল, সেই ফুয়ায় উঁচু প্রাচীরের গায়ে পা ঝুলিয়ে বসে মানুষের আদল নেয়। মানুষটি পুরুষ কিন্তু নারীসুলভ সে একটি প্রলম্বিত হাত বাড়ায়। নখ দিয়ে খুঁটে খুঁটে খুলে দেয় জামার বোতাম। সে দেখে, সরু সরু আঙুলে তীক্ষ্ণ নখ। নখে লাল রংকরা। হঠাৎই সেই কুয়োর দরজা থেকে একটি অন্ধকার ঘরে চলে যায় সে। টের পায় একটি উষ্ণ ও নরম কোলে সে শুয়ে আছে। তার চুলে আদরের আঙুলের টান দিচ্ছে কেউ। চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, তার ভাল লাগছে। খুব ভাল লাগছে। কিন্তু ঘাড় টনটন করছে। যে-কোলে শুয়ে আছে তার বেধ বড় বেশি। তার দম বন্ধ হয়ে আসছে কারণ নাকের ওপর নেমে এসেছে ভারী স্তন। আর জন প্রসন্ন মুখে দাঁড়িয়ে আছেন পায়ের কাছে। বলছেন মন জাগত নাহি। মন জাগত নাহি। ফির যাওল শাম। আহা! কী সুর! অবিকল চন্দ্রাবলী। তখন ছেলেটি তার দিকে এগিয়ে দিচ্ছে দুধের গ্লাস। তাকে খেয়ে নিতে বলছে। গ্লাসের গায়ে তার আঙুলের নখে হলুদ রং করা। তার গা গুলিয়ে উঠছে। বমি পাচ্ছে। সে চন্দ্রাবলীর কাছে অনুযোগ করছে, দুধ খাবে না, কিছুতেই খাবে না। দুধ খেলে তার বমি হয়ে যাবে। আর চন্দ্রাবলী উধাও। সে দেখল সে বসে আছে ট্যাক্সিচালকের কোলে, আর চালক তার কাছ থেকে দু’লক্ষ টাকা চাইছে। দু’লক্ষ টাকা না হলে কিছুই হবে না, অস্ত্রোপচার হবে না। সে পড়িমরি করে উঠে বসেছে। দু’ লক্ষ টাকা! দু’ লক্ষ টাকা সে পাবে কোথায়!
