ওই ঘটনার পর প্রথম যেদিন দেখা হয় দেবকান্তিদার সঙ্গে, সে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিল। সে জানে না কেন, সেই অমানুষিক যন্ত্রণার কথা মনে করে তার চোখে জল এসে গিয়েছিল। দেবকান্তিকে এড়িয়ে সে চলে যায়। চোখের জল ও যন্ত্রণাকে মহাবিশ্বের কারও সঙ্গে ভাগ করে নিয়ে, সে সব কিছু মুছে ফেলেছিল গোপনে।
ইস্কুল ছুটির সময় দেবকান্তিদা তাকে ধরে। ভয়ে তার মুখ শুকিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে দেবকান্তিদা সেইসব প্রসঙ্গেই গেল না। বরং তাকে রোল খাওয়াল। ক’দিন পর খাওয়াল চিনে খাবার। আস্তেআস্তে একটু একটু করে, দেবকান্তিদার প্রতি তার রাগ ও ভীতি চলে যাচ্ছিল। একেবারে সম্পূর্ণ মুছে গেল যেদিন দেবকান্তিদা তাকে উপহার দিল একটি কিশোরকুমার এবং একটি লতা মঙ্গেশকরের ক্যাসেট। সে অভিভূত হয়ে গেল সেদিন। এমনকী দেবকান্তিদাকে অল্প-অল্প পছন্দ করতেও শুরু করল সে।
প্রায় ছ’মাস কেটে গিয়েছে এর মধ্যে। সে তখন অষ্টম শ্রেণির। দেবকান্তিদা বারোর। ‘শোলে’ এসেছে, আবার। সে ‘শোলে’, দেখেনি শুনে দেবকান্তিদা তাকে নিয়ে গেল। সে মুগ্ধ হয়ে বসে থাকল সারাক্ষণ। হেলেনের উন্মত্ত নাচ, তারও রক্তে নাচের দোলা লাগিয়ে দিল তখন। গভীর ঘোর নিয়ে সে বেরিয়ে এল যখন, দেবকান্তিদা তার কাঁধে হাত রেখে জিগ্যেস করল, সে দেবকান্তির বাড়ি যাবে কিনা। সে না করতে পারল না।
সেই শুরু। তারপর থেকে ভাল রেস্তোরাঁয় খাওয়ার বিনিময়ে, টিশার্ট বা ক্যাসেট প্রাপ্তিতে, কিংবা চলচ্চিত্র দেখাবার শর্তে সে তার পেশা চালিয়ে যেতে থাকল।
দেবকান্তিদার সঙ্গে দেখা হয়েছিল কিছু দিন আগে। সঙ্গে বউ ছিল। তাকে দেখামাত্র বোকার মত হেসেছিল দেবকান্তিদা। কীরকম ভয় পাওয়া আকুটে মুখ করে কথা বলল। একবার বাড়িতেও যেতে বলল না। কোথায় থাকে বলল না তাও। ভয়, ভীষণ ভয় পেয়েছিল দেবকান্তি। সে জানে। যদি সে ওর বউকে সব কীর্তির কথা বলে দেয়।
একা একাই হাসতে থাকে সে। ভয়! ভয়তাড়িত হয়ে ঘুরে বেড়ায় সমস্ত মানুষ। সে নিজেও। প্রত্যেকে। প্রত্যেকেই যেন ভীত সন্ত্রস্ত। সন্দিহান। কেউ কারওকে বিশ্বাস করে না। কেউ কারও কাছে আসে না। বাজারের থলে হাতে বেরুলেই যেমন সন্দেহ জাগে, এই বুঝি ওজনে ঠকাল, এই বুঝি দাম বেশি নিল, তেমনই ক্রেতা-বিক্রেতা মানসিকতা সর্বত্র। কয়েক বছর ধরে যাঁরা আসছেন তার কাছে, তাঁদের মধ্যে এমনকী আছেন বিবাহিত পুরুষরাও। পরিবার-পরিজন নিয়ে ছা-পোষা পুরুষ। পথে-ঘাটে দেখা হলে তাঁদের চোখেও ত্রাস ফুটে ওঠে। অচেনার ভান করে এড়িয়ে যান তাকে। বিশ্বাস নেই। কারও মনে বিশ্বাস নেই।
সে চা করবে বলে ভেতরের দিকে গেল। আজ রাত্রি মটিায় একজনের আসার কথা। একজন খরিদ্দার। এই ছেলেটি না এলে তার জীবন নিত্যছন্দেই চলেছিল। ছেলেটিকে সে আরেকবার আকাঙ্ক্ষা করে মনে মনে। এবং টের পায়, আকাঙ্ক্ষা করার মত আর কিছুই তার জীবনে নেই। একজন মনের মতো মানুষ ছাড়া আর কী-ই বা সে চাইবে। বাড়ি আছে, অর্থের অভাব নেই, পেশাগুলির প্রতি তার কোনও অভিযোগ নেই। সে কোনও বাবা হতে পারবে না। মা-ও না। কেউ তার স্ত্রী হবে না কখনও, স্বামীও হবে না। সে শুধু পেতে পারে মানুষ একজন। পুরুষমানুষ। বন্ধু। যৌনতার অংশীদার। জীবনের অংশীদার।
চা করার আগে, ছেলেটি জেগে উঠেছে কি না দেখতে গেল সে। একসঙ্গেই চা করবে তা হলে। ঘরে ঢোকার আগেই সে দেখতে পেল, ওঠেনি শুধু, বসে আছে বিছানায়।
কাছে গেল সে। মাথায় হাত রাখল। জিগ্যেস করল কেমন বোধ করছে। মাথা নাড়ল ছেলেটি। মাথা থেকে সরিয়ে দিল তার হাত। সে বিছানার কিনার ঘেঁষে বসে পড়ল তখন। ছেলেটি চশমা চাইল। চশমা এগিয়ে দিয়ে ছেলেটির বুকে হাত রাখল সে। হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। বলতে লাগল কীভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছিল সে। কীভাবে তাকে নিয়ে আসা হয় বাড়িতে। ডাক্তার কী বলে যান। আর এই সব বলতে বলতে তার জিভ শুকিয়ে আসছিল। বুকের মধ্যে তোলপাড় করছিল। ছেলেটির ঠোঁটদুটো বড় মসৃণ, নাক তীক্ষ্ণ, চশমার কাচের নীচে দুটি উদাস নয়ন। এলোমেলো চুলে, কপালের ক্ষতকারুণ্যে আর হালকা চন্দন রঙের পাঞ্জাবিতে তাকে দেখাচ্ছে যেন বিরহক্লিষ্ট প্রেমিকপুরুষ। তার মাথার পেছনে জ্যোৎস্না উদ্বেলিত চাঁদ, তার পায়ের তলায় অসীম বিস্তৃত সুনীল সমুদ্র, তার চারপাশে নারী। অগণিত, আকুল, বিবসনা। তার মধ্যে একাই
সে দিশ্বসন। একাই সে পুরুষদেহী পুরুষকামনা।
ছেলেটি হাত নামিয়ে দেয় তার। শার্টের খোঁজ করে। তার অসুস্থতার পর থেকে, জ্ঞান ফিরে আসার পর থেকে, ডাক্তারের আগমন ও নির্দেশগুলি সমস্তই তার মনে আছে, সে জানায়। একটি গভীর নিদ্রার ঘোর তাকে আচ্ছন্ন করেছিল মাত্র। তার সমস্ত ইন্দ্রিয় সজাগও ছিল। শুধু ওঠার শক্তি ছিল না।
ছেলেটি পাঞ্জাবি খুলতে চায়। আর মেয়েলি হিল্লোল তুলে সে বারণ করে তাকে। ছেলেটি শোনে না। সমস্ত কিছুর জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ দিতে দিতে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ায়। পাঞ্জাবি খোলে ও শার্ট পরিধান করে। মুহূর্তকালের জন্য তার নির্মেদ বুক-পেট চুনি-পান্নার সম্ভার উদ্ভাসিত হয়। তার ইচ্ছে করে, ছুটে গিয়ে মুখ রাখে সেখানেbচুনিবৃন্তে ঠোঁট স্থাপন করে শুষে নেয় প্রেম। বুকে পান্নার মতো রোমরাজিতে মুখ ঘষে।
কিন্তু পারেনা কিছুই। শুধু ইচ্ছেরা সংগোপনে মাথা কুটে মরে। কোমল আঙুল ছেলেটির শার্টের বোতাম এঁটে দিতে যায় আর বোতামের ছলনায় নিজস্ব ভাষায় কথা বলে বুকের সঙ্গে। কিন্তু ছেলেটি নির্বিকার থাকে। নারীসুলভ পুরুষের শরীর তাকে জাগাতে সক্ষম হয় না। কোমল আঙুলগুলি প্রত্যাখ্যান করে সে নিজেই লাগিয়ে নেয় সমস্ত বোতাম। এমনকী চা পানের অনুরোধও ঠেলে দেয় সে। বরং ধন্যবাদ দেয়। বারংবার ধন্যবাদে অপরিচয়ের দূরত্ব প্রতিষ্ঠা করে। তার মনে পড়ে ছেলেটির গেঞ্জিটি মেলে দিয়েছিল খুলে। ছেলেটির মনে পড়ছে না। সে-ও বলে না আর। বলে না কিছুই। আপাদমস্তক জুড়ে কী গভীর ঔদাস্য! তার ইচ্ছাকে সবলে প্রতিহত করে। সে চূড়ান্ত হতাশায় ভাললাগা ছেলেটিকে চলে যেতে দেয়। ছেড়ে দেয়। গেঞ্জির কথা বলে না কারণ, এ দিনের স্মৃতি হিসেবে সে রেখে দেবে ওই বাস।
