এই বিনোদবাবু পাগল হয়ে গেলেন। মায়ের তখন মধ্যবয়স। যৌবন দাঁত কামড়ে ঝুলে আছে প্রত্যেকটি বাঁধনে। বিনোদবাবুর যত্নে কোথাও এতটুকুও যন্ত্রণার ছাপ পড়েনি। তার নিজের বয়স তখন তেরো। মেজদির আঠারো। সেজদির যোলো।
দিশেহারা হয়ে গেলেন মা। কিছুদিন কান্নাকাটি করলেন। তারপর হাল ধরলেন শক্ত করে। পাগল বিনোদববুও রয়ে গেলেন এ বাড়িতেই। মা তাঁকে পৌঁছে দিতে গিয়েছিলেন তার নিজের বাড়ি, কিন্তু খুঁজে পাননি কোথাও। ঠিকানা জানা ছিল না। শুধু একটা ধারণা। তাই ফিরিয়ে আনলেন বাড়িতে। খেতেন না, ঘুমোতেন না, শুধু একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতেন বিনোদবাবু। মা কয়েক গ্রাস ভাত জোর করে তাঁর মুখে পুরে দিতেন। তিনি মুখে নিয়েই বসে থাকতেন সেই সব। কোনও এক সময় গিলে ফেলতেন। নিয়ম করে মা প্রাকৃতিক ক্রিয়াদির জন্য স্নানঘরে নিয়ে যেতেন বিনোদবাবুকে। যন্ত্রের মতো বসে থাকতেন বিনোদবাবু। শরীর ধর্মে মলমূত্র ত্যাগ করতেন কিন্তু শৌচ করতেন না। মা তাঁকে এক শিশুজ্ঞানে সাফসুতরো করে দিতেন।
এই বাসস্থান, যেখানে সে নিশ্চিন্তে থাকে এখন, বিনোদবাবুর করে দেওয়া।
কিছু টাকা ছিল মায়ের আর ভারী ভারী গয়না। সব গয়না বিনোদবাবুর দেওয়া। সেই সব দুই মেয়ের বিয়ের জন্য আগলে কাজে নামলেন মা। জমা টাকা ভাঙিয়ে খেলে সব ফুরিয়ে যাবে একদিন, মা এমনই বলতেন।
পুরনো বৃত্তিতে অনায়াসেই ফেরা সম্ভব ছিল মার পক্ষে, কিন্তু মা কয়েকটি বাড়িতে রান্নার কাজ নিলেন। একে একে দিদিদের বিয়ে দিলেন। খেয়ে-পরে বাঁচবার মতো বিয়ে দিতে গিয়ে সব টাকা আর গয়নাগুলো চলে গেল। আর বিয়ের সময় বিনোদবাবুকেই পিতা হিসেৰ্কে দেখানো হয়েছিল।
যেমন হঠাৎ পাগল হয়ে গিয়েছিলেন বিনোদবাবু তেমনি হঠাৎ মরে গেলেন একদিন। ঠিক পনেরো দিনের মাথায় মাও চলে গেলেন।
ভালবাসা বলে একে? এই সম্পর্ককে? এইটানকে? যা স্বার্থের সীমা ছাপিয়ে যায়, দেওয়া-নেওয়ায় বাঁধা থাকে না, অর্থলিপ্সাকে যে হেলায় দেয় পাশে ফেলে?
হয়তো। হয়তো। তার কখনও হয়নি এমন। ইস্কুলে পড়ার সময় মেয়েদের মতো আচরণ ছিল বলে, সে মূত্রত্যাগ করতে গেলে অন্য ছেলেরা উঁকি মেরে তাকে দেখতে চাইত। উঁচু ক্লাসের ছেলেরা জড়িয়ে ধরত তাকে। চুমু খেত। একদিন একাদশ শ্রেণির দেবকান্তিদা তাকে ইস্কুল থেকে বাড়িতে নিয়ে যায়। এবং জোর করে তাকে ধর্ষণ করে।
অসম্ভব যন্ত্রণায় চিৎকার করছিল সে। যেন একটি ছুরিকা দিয়ে মাংসগুলি খণ্ড খণ্ড করা হচ্ছে তার। হাড়গুলি মুড়মুড় করে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে। দেবকান্তিদা হঠাৎ হয়ে উঠেছে অসীম বলবান। আর দেবকাস্তিদার শিশ্ন যেন ধাতব দণ্ড, যেন ইস্পাতের ফল।
সেই যন্ত্রণাকে কী ব্যাখ্যা দেওয়া যায় সে জানে না। সে শুধু জানে, তার অজ্ঞান হয়ে যাওয়া উচিত ছিল। ওই কষ্ট সজ্ঞানে হজম করার নয়। সে গলা মাধ্যমে যে স্বর তখন বার করে আনছিল তাকেই বলে আর্তনাদ। আর্ত নাদ। সে কাঁদছিল। খুব কাঁদছিল। হঠাৎ দেবকান্তিদা তার পিছন-সামন ক্রিয়া থামিয়ে স্থির হয়ে যায়। নিজেকে ঠেসে ধরে তার পশ্চাতে এবং ধীরে ধীরে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়।
সে তখন ওই অবস্থাতেই শুয়ে পড়েছিল মাটিতে। তার আর কান্নারও ক্ষমতা ছিল না কারণ যন্ত্রণায় দমবন্ধ হয়ে আসছিল। ডাঙায় ছেড়ে দেওয়া জলচরদের মতো মুখে বড় হাঁ রচনা করে খাবি খাচ্ছিল সে। পায়ুদ্বারের যন্ত্রণায় নিজের অজান্তেই রেখেছিল হাত। হাতে রক্ত উঠে এসেছিল। আমোদ পাওয়া গলায় দেবকান্তিদা বলেছিল, সে শুধু নারীসুলভই নয়, সতীত্বের সমস্ত লক্ষণ তার মধ্যে আছে। নথ ভাঙানোয় কী রকম রক্তপাত হচ্ছে! তার সতীচ্ছদ টুটিয়ে দেবকান্তিদাই তাকে করে তুলেছে পরিপূর্ণ নারী।
সে তখনও পড়ে পড়ে কাঁদছে দেখে তাকে লাথি কষিয়েছিল দেবকান্তিদা। সে যেন আর ছেনালি না করে এমন আদেশ করেছিল। বেশি ছেনালি করলে সে আরও একবার…
ভয়ে উঠে বসেছিল সে। মাথা টলছিল তারা কোনওক্রমে প্যান্ট পরে সে বেরিয়ে আসে বাইরে। ভয়ানক রাগ হয়েছিল তার। ঘৃণা হয়েছিল দেকান্তিদার ওপর। উঁচু ক্লাসের যত ছেলেকে সে চিনত, তাদের সকলের প্রতি ঘৃণা হয়েছিল। যন্ত্রণার সঙ্গে, রাগের সঙ্গে, ঘৃণার সঙ্গে–অপমানবোধ মিশে দুই কান ঝাঁ ঝাঁ করছিল তার। এই অপমান ও যন্ত্রণার কথা সে বলেনি কারওকে। কোনও দিন। আজ অবধি বলেনি।
সেদিন বাড়ি ফিরে সে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়েছিল। চিৎ শোয়ার উপায় ছিল না এমন যন্ত্রণা। সর্বাংশেই সে নির্দোষ ছিল। অথচ মনে মনে সে হয়ে উঠেছিল বিষম ভিরু। তার প্যান্টে রক্তের দাগ লেগেছিল। একটি বড় স্ফোটকই এর কারণ–এমনই ব্যাখ্যা করেছিল সে। দশদিন ইস্কুলে যায়নি। ক্ষত সারিয়ে নিতে থাকার সেই দিনগুলিতে অসম্ভব উদ্বেগ তাকে তাড়া করত। মনে হত, ইস্কুলে পৌঁছলেই হা-হা হাসির তোড়ে সে ভেসে যাবে। ধর্ষিত হওয়ার কারণে সবাই তাকে দুয়ো দেবে। যদিও শেষপর্যন্ত তেমন হয়নি। ইস্কুলে যাবার পর কোনও হা-হা হাসি তাকে তাড়া করেনি। দেবকান্তিদা বলে দেয়নি কারওকে কিছুই। এখন সে বুঝতে পারে, ভয় তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল দেবকান্তিদার। সে যদি বলে দিত মাকে বা কোনও চিকিৎসককে, কিংবা প্রধান শিক্ষক মহাশয়কে তাহলে দেবকান্তিদাই চরম শাস্তি পেত। অথচ সে বারো বছর বয়সের বোকামি ও ভিরুতায় নিজেই মুখ বুজে গুটিয়ে ছিল নিজের মধ্যে।
