ভাল নাচ করে বলে একটি হিজড়ের দলের মধ্যমণি হয়ে বহুবার লগানে গিয়েছে সে। বিহারের নানা অঞ্চলে ঘুরেছে। এক-একবার গেলে দশ থেকে পনেরো হাজার টাকা উপার্জন হত তার। এই লগানই তাকে দারিদ্র থেকে মুক্তি দেয়। শেষ পর্যন্ত সে এই যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল। কারণ হিজড়ের দল তাকে তাদের গুরুমার কাছে দীক্ষা নিতে বলে এবং শিশ্ন কর্তন করার পরামর্শ দেয়।
সে হিজড়ে নয়, সে জানে। লিঙ্গ পরিবর্তন করতেও সে চায় না। সে সমকামী। সে টের পায় তখন, হিজড়েরা তাকে নিজের লোক মনে করতে পারছে না। কলেজে স্নাতক স্তরের চূড়ান্ত পরীক্ষা এসে গিয়েছিল তখন। সে সব বন্ধ করে পড়াশোনায় মন দেয়। সেই থেকে আর যায়নি। হিজড়ে নাচের ওই ঢং ও অশ্লীল অঙ্গভঙ্গিতে ও বাক্য ব্যবহারের সঙ্গে নিজেকে মানাতেও পারছিল না সে। অর্থবান বিহারিদের আঙিনায় নাচ দেখানো, প্রায় ভিক্ষের মতো লাগত।
নাচের পেশা সে ছাড়েনি। নাচ অবলম্বন করে এক নতুনতর পেশায় তাকে নিযুক্ত করেন অলকবাবু।
অলকবাবু বেশ্যাদের দালাল। বেশ্যাপাড়ার ছিচকে দালাল নন। তার কাজ বড় মাপে। প্রতিষ্ঠিত, ক্ষমতাবান মানুষদের জন্য সমাজবালিকা সরবরাহ করেন তিনি। এই বালিকারা কেউ-ই নির্দিষ্ট অঞ্চলের নয়। হাড়কাটা গলি বা কালীঘাট বা ইকবালপুরও সোনাগাছিয়ার নয়। এরা থাকে বড় ফ্ল্যাটে, বিলাসে, আরামে।
এই অলকবাবুর কিছু খদ্দের আছেন মহিলা। তাঁদের উচ্চপদস্থ বা ব্যবসায়ী স্বামীরা ব্যস্ত থাকেন সারাক্ষণ। হুট করতেই দেশে বিদেশে চলে যান। উপোসী ও উপেক্ষিতা স্ত্রীরা তখন পুরুষ খোঁজেন। প্রেম নয়, ভালবাসা নয়। শুধু দেহ। তাঁরা দেহ খোঁজেন। তরুণী হলে পুরুষ শিকার সহজ। কিন্তু প্রৌঢ়া হলে, ঠোঁটে যতই রং থাকুক, ব্লাউজের পরিমাপ যতই হোক অন্তর্বাসের মতো সরু, পুরুষ পাওয়া সহজ হয় না। তখন দালাল লাগে।
অলকবাবু অনেক খদ্দের দিয়েছেন তাকে। প্রথমে তাঁর প্রস্তাব ছিল মহিলা খদ্দের নেবার। সে তখন তার অপারঙ্গমতা জানায়। অলকবাবু তখন ভাবনাচিন্তা করে অন্য প্রস্তাব পাড়েন। বড় বড় শহরে যেমন হচ্ছে, তেমন তিনি চালু করেন এ শহরেও।
এক-একটি বাড়িতে কয়েকজন মহিলা সমবেত হন। সেখানে মঞ্চের মতো নাচের জায়গা করা হয়। সেই মঞ্চে সে নাচতে নাচতে একটি একটি করে পোশাক খুলতে থাকে। শর্ত, কেউ তাকে স্পর্শ করতে পারবে না। একঘণ্টা নাচের জন্য কুড়ি হাজার টাকা।
সে নাচে। খুলে ফেলে আঁটো পোশাক। খুলে ফেলে উৰ্ববসনা হাত মোজা। খুলে ফেলে প্যান্ট এবং জাঙ্গিয়া পরে নাচতে নাচতে একসময় অন্তর্বাসও খুলে ফেলে। তখন.. তুমুল হর্ষধ্বনি ওঠে। মহিলারা, চুম্বন ছুড়ে দেন। কেউ কেউ শর্ত ভুলে তাকে জড়িয়ে ধরার জন্য ছুটে আসেন। অনেকে এ ওর ব্লাউজ খুলে স্তনে হাত রাখে। সে নাচে। মুক্ত হয়ে নাচে। আর নগরদেবীরা পরস্পর কামড়াকামড়ি করে চরম কামনায়।
সে বিশ্বাস করে, অদ্যাবধি বিশ্বাস করে, পৃথিবীময় কাম। গোটা পৃথিবী কাম দ্বারা পরিচালিত হয়। মানুষ মরণ মুহূর্তেও এক-একজন জাগ্রত কামুক।
আরও একবার ছেলেটিকে দেখতে যায় সে। ঘুম অঙেনি এখনও। পাশ ফিরে শুয়েছে। ঠোঁট অল্প ফাঁক হয়ে আছে। কম্বল সরে গিয়েছে গা থেকে। মশা ঘুরছে।
মশা তাড়াবার যন্ত্রটি প্লাগে বসিয়ে দেয় সে। জ্বালে, কম্বল দিয়ে শরীরটা ভাল করে ঢেকে দেয়। এসে দাঁড়ায়ঝোলকনিতে। দীর্ঘদিন পর সে আজ তীব্র তৃষ্ণা বোধ করছে। ছেলেটি যখন অজ্ঞান হয়ে রাস্তায় পড়ে যায়, সে ছুটে এসে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিল। আশ্চর্য শান্তিতে ভরে গিয়েছিল শরীর। তার জড়িয়ে ধরার মধ্যে এমন এক নিশ্চয়তা ছিল, আবেগ ছিল যে পথচারী ও দোকানিরা ছেলেটিকে তার আত্মীয় মনে করে।
তাকে বিছানায় শুইয়ে জামা ছাড়িয়ে দিচ্ছিল যখন, খোলা শরীরের সৌন্দর্য তাকে পরিপূর্ণ মুগ্ধ করে। সে, সেই খোলা শরীর স্মরণ করে ব্যালকনির গ্রিল জড়িয়ে থাকা লতার ত্রিকোণ পাতাগুলোয় হাত বোলায়। ছেলেটির ওষ্ঠ স্মরণ করে আপন হস্তের ত্বকে চুম্বন করে। মনে মনে সংকল্প নেয়, ছেলেটিকে আহ্বান করবে সে। যদি প্রত্যাখ্যাত হয়, মেনে নেবে। যদি না হয়, নিজের শরীর দিয়ে আরেকটি শরীরের কোষে কোষে ছড়িয়ে দেবে প্রেম।
প্রেম। সে আশ্চর্য হয়। সে প্রেম ভাবছে! প্রেম! কাকে বলে প্রেম, জানে না সে। সে শুধু জানে স্পর্শ, জানে শরীর। শরীরের পরিমাণ মূল্য। সে নিজেকে জানে না। নিজের অন্তরকে জানে না। প্রেম জানে না। এই ছেলেটিকে জড়িয়ে-তার শরীর জুড়ে শান্তি নেমেছিল। এর নামই কি প্রেম? কিংবা এই স্পর্শ করার আকুলতা?
সে যখন ছোট ছিল, তার এই মেয়েদের মতো চলনবলন যে-কোনও মেয়ের চেয়েও মেয়েলি হয়ে দেখা দিত। তার মা বেশ্যাপাড়ারই এক মধ্যবয়সিনী, চার সন্তানের জননী–তার নাম রেখেছিল বুলা। সে জানে না, তারা চার ভাইবোন একই পুরুষের সন্তান কিনা। না হওয়াই সম্ভব। চারজনের চেহারাতেও মিল নেই। যদিও সে নিজে জ্ঞান হওয়া অবধি দেখে আসছিল বিনোদবাবুকে। মায়ের বিনোদবাবু। তারাও ডাকত বিনোদবাবু। বিনোদবাবু আসার পর তার মা আর অন্য পুরুষ নেয়নি।
বিনোদবাবু যত্ন করতেন মাকে। তাদের পুরো পরিবারে প্রতিপোযণ করতেন। তাদের জন্য নিয়মিত উপহার আনতেন। বিনোদববুর তাগিদেই মা তাদের সকলকে ইস্কুলে ভর্তি করে দেয়।
তার মনে আছে, মায়ের একটু জ্বর হলেই বিনোদবাবু মাথার কাছে বসে থাকতেন ঠায়। কপালে হাত বুলিয়ে দ্ভিতেন। বিনোদবাবু তাদের সত্যিকারের বাবা হলেন না কেন, এই আলোচনা তারা প্রায়ই করত। বড়দি একটু বড় হয়ে উঠলে বিনোদবাবুই তার বিয়ে দিয়ে দেন।
