আবার সূর্য ও যম অভিন্ন বলেই যমের আরেক নাম তুর। কারণ যম তীব্র গতিসম্পন্ন। সূর্যের আলোকরশ্মির চেয়ে দ্রুতগতি আর কিছুই নেই এ মহাবিশ্বে। অতএব যম শব্দ তরণার্থক। তুর শব্দের অর্থ দ্রুত গমনশীল যম। তরণার্থক তৃ ধাতু থেকে বা শীঘ্রত্ব পরিচায়ক ত্বর ধাতু থেকে তুর। যম তরণশীল। সূর্য তরণশীল। দ্রুতগতিতে প্রতিদিন পার হয়ে যান মহাকাশ। তরণশীল ও তুর্ণগতি।
এরপর যম হয়ে উঠলেন কিংবদন্তি। মহাভারতে যমের বর্ণা আছে… পুরুষং রক্ত বাসসম্। বদ্ধমৌলিং বপুষ্মন্তমাদিত্যমতেজসম্ ॥ শ্যামাবদাতং রক্তক্ষং পাশহস্তং ভয়াবহম্।
এখানে যম হয়ে উঠেছেন ভয়াবহ। রক্তবাসবদ্ধমৌলি। দিবাকরের ন্যায় তেজস্বী। শ্যামবর্ণ। রক্তনয়ন। ভয়ানকৃপুরুষ। দিবাকরের মতো তেজস্বী–অর্থাৎ যম এখানে স্বয়ং সূর্যনন আর। পাশ হস্তে তিনি দন্ডায়মান। অর্থাৎ এখন আর তিনি জগতের প্রতিপালক নয়। তিনি পীতবস্ত্রখাতোয়মিব তোয়ন্দলশ্যামং পীতাম্বনেও তিনি ধর্মরা ধর্মরাজ বটে। কিন্তু ঘাতক।
কালিকাপুরাণে যমকে বলা হয়েছে প্রাণদণ্ডস্য সাধন। এখানে তিনি ভয়াল দর্শনকৃষ্ণাস্ত্ৰং স্থূলপাদং বহিনিঃসৃতদন্তক ভয়াভয়প্রদং নিত্যং নৃণাং মহিষবাহন ॥ মহিষের পিঠে বসে থাকেন যম। তাঁর সঙ্গে কালো অস্ত্র, পাগুলি স্থূল আর মুলোর মতো দাঁত। মানুষকে নিত্য ভয়-দান করেন, অভয়ও।
মৎস্যপুরাণে যমের রূপ একটু খুলেছে। এখানেও তিনি ধর্মরাজ এবং প্রাণহরণকারী। নীলোৎপলদলশ্যামং পীতাম্বরধরং প্রভুম৷ বিদ্যুতা নিবদ্ধাঙ্গং সততায়মিব তোয়দ। নীলপদ্মের পাপড়ির মতো শ্যামবর্ণ যম, পীতবস্ত্রধারী যেন বিদ্যুৎবেষ্টিত জলভারাক্রান্ত মেঘ।
পদ্মপুরাণে যম পাপীগণকে দণ্ডপ্রদান করছেন। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে যম আবার স্বয়ং ধর্ম নন। যদিও এখানে যমের অনেক নাম। যেমন–ধর্মরাজ, শমন, কৃতান্ত, দণ্ডধর ও কাল। পাপীগণের শুদ্ধিনিমিত্ত তিনি দণ্ডধারণ করেন, কিন্তু তিনি স্বয়ং ধর্ম নন। ধর্মের অংশ।
শেষ পর্যন্ত টিকে আছেন যম। কথায়, ভাবনায়, বাগধারায়। কিন্তু ধর্মরাজ হিসেবে তাকে আর মনে রাখে না কেউ, যতখানি তিনি আছেন কৃতান্ত হয়ে, শমন হয়ে। যুগে যুগে রূপ এবং মর্যাদা পাল্টে পাল্টে গিয়েছে স্বয়ং কৃতান্তের।
এমনই হতে থাকবে এই বৃত্তির। এই বেশ্যাবৃত্তির। ভোল পাল্টাবে হয়তো। কিন্তু কৃতান্ত হয়েই টিকে থাকবে আরও হাজার হাজার বছর। ঘৃণিত হয়ে টিকে থাকবে।
তবু সে চায় এই আন্দোলন সফল হোক। যা আছে তাকে নেই বলার ভণ্ডামির মুখে প্রস্রাব করা যাবে তাহলে। হাড় জিড়জিড়ে বেশ্যার কাছ থেকে বখরা খিচে নেওয়া পুলিশের মুখে লাথ কষানো যাবে। খুশি হবে সে, খুব খুশি হবে, যদি স্বীকৃতি পেয়ে যায়। আদালতে গিয়ে মানুষের মতো অধিকার তো চাইতে পারবে। এমনকী সুরক্ষিত হতে পারবে সন্তানের ভবিষ্যৎ।
সে ছেলেটির দিকে তাকায়। কোমল মুখ। কিন্তু চোখের তলায়। ক্লিষ্টতার ছাপ। ঘুমোচ্ছে। ডাক্তার বলে গিয়েছেন, তাকে যেন ঘুমোতে দেওয়া হয়। কপালের এক জায়গায় ফোলা, থ্যালানো। ওষুধ দিয়ে লিউকোপ্লাস্ট লাগানো হয়েছে সেখানে। তার গা থেকে ধুলোমাখা শার্ট খুলে দিয়েছে সে। পরিয়ে দিয়েছে নিজের নতুন পাঞ্জাবি। ছেলেটি তখন ঘোরের মধ্যে চন্দ্র বলছিল। চন্দ্রাবলী উচ্চারণ করছিল। চন্দ্রাবলী কে সে জানে না। কিছুই জানে না ছেলেটি সম্পর্কে। শুধু নাম জানে। শুভদীপ। শুভদীপ ভট্টাচার্য। শার্টের পকেটে নামপত্র ছিল। অবশ্য যদি নামপত্ৰখানা তার নিজেরই হয়ে থাকে।
ডাক্তারকে এই নামই বলেছে সে। শুভদীপ। আর শুভদীপ ছেলেটির রক্তচাপ নিম্নগামী। সে যে দোকান থেকে বেরিয়েই মাথা ঘুরে পড়ে যায়, সেসব এ কারণেই। ডাক্তার বেশ কিছু রক্ত পরীক্ষা করার প্রয়োজনীয়তার কথা লিখে দিয়েছেন। ছেলেটি জেগে উঠলে সে সব পরীক্ষার জন্য তাকে নিয়ে যেতে পারত। তার ভাল লেগেছে, শুভদীপকে ভাল লেগেছে।
তার কাছে যারা খদ্দের হয়ে আসে এখন, বেশির ভাগ চেনা হয়ে গেছে। দূরভাষে সময় নির্দিষ্ট করে নেয় সে। এবং সে জানে, কার কী পছন্দ। পেশাগত যৌনতার সময় তার নিজের পছন্দের কোনও জায়গা নেই। সে চায় পরিচ্ছন্ন লোক। যদিও তার অভিজ্ঞতা আছে, পরিচ্ছন্ন, মূল্যবান পোশাক পরা সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত মানুষ অন্তর্বাসে বড়ই নোংরা। নোংরা অন্তর্বাসের নীচে তাদের যৌনকেশে ময়লা চিটচিটে হয়ে লেগে থাকে।
প্রথম প্রথম যখন তার দারিদ্র ছিল–সে, চোখ বুজে, দম বন্ধ করে চোষণ করত। খদ্দের চলে গেলেই বমি করত হড়হড় করে। বাড়তি খরচ করার সঙ্গতি হওয়ার পর সুগন্ধি লাগানো তোয়ালে দিয়ে সে সমস্ত শরীর মুছে দেয় আগে। অতিরিক্ত পরিষেবা হিসেবে প্রত্যেকেই উপভোগ করে এই প্রক্রিয়া।
এদের কারও প্রতি তার ভাললাগা মন্দলাগা নেই৷ এদের দেহে সে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। এদের ইচ্ছে-অনিচ্ছেতেও সে অভ্যস্ত। গোটা খেলায় তার আছে কিছু নিয়মানুগ প্রক্রিয়া। কিছুক্ষণ-আলিঙ্গনে আবদ্ধ থাকা। তারপর কানের লতি থেকে শুরু হয় লেহতার আগে অবশ্য নিজেকে পোশাক-মুক্ত করে নেয় সে।
কানের লতি থেকে ধীরে ধীরে নীচের দিকে নামে। স্তনবৃন্তে দু’ঠোঁটের চাপ দিলেই পুরুষগুলো ছটফট করে। উঃ আঃ করে।
দেখে-দেখেই চমৎকার নাচ শিখেছিল সে। তার শরীরে আছে মেয়েলিপনা। ছিপছিপে, ফর্সা, টানা টানা নাক-চোখের কারণে, কোঁকড়ানো মাথাভর্তি চুলের মহিমায়, সে জানে সে আকর্ষণীয়। যতখানি মেয়েদের কাছে, তার চেয়ে অনেক বেশি পুরুষদের কাছে। মেয়েদের সঙ্গে মিশতে সে পছন্দ করে কিন্তু মেয়েদের প্রতি তার কোনও যৌন আকর্ষণ নেই। নিজের আনন্দের জন্য সে চায় সুদর্শন ছিপছিপে পুরুষ। যেমন এই শুভদীপ ছেলেটি।
