চন্দ্রাবলীর ঘোর লেগে যাচ্ছে দেখে শুভদীপ বেরুতে চায় তার থেকে। তার মাথার যন্ত্রণাকে স্মরণ করে সে। Towar of Slence স্মরণ করে। বিজ্ঞাপন সংগ্রহের কাজ এবং বাবার ওষুধ স্মরণ করে এবং সমাধি ফলকের লেখাগুলি আবৃত্তি করে বার বার–
Do not stand at my grave and weep
I am not there, I do not sleep
I am a thousand winds that blow
I am that diamond glints on snow
I am that sunshine on ripped grain
I am that gentle autumn rain
Do not stand at my grave and weep
I am not there,I do not sleep.
–কাঁদিয়ো না, সমাধির প্রান্তে বসি কাঁদিয়ো না আর
আমি নহি, নিদ্রিত নহি, দেখো বিশ্ব পারাবার
আমি সেই বায়ুমালা, আমি সেই বিপুল অশেষ
হিমকুচি হিম গায়ে আমি সেই হীরকের বেশ
শস্য থরে থরে রাখা, আছি আমি আলো ঠিকরানো
যখন ঝরিবে বৃষ্টি—আমারেই মেঘেবর্ষা জানো
কাঁদিয়ো না, সমাধির প্রান্তে বসি কাঁদিয়োনা আর
আমি নহি, নিদ্রিত নহি, দেখে বিশ্ব পারাবার।
০৯. ছেলেটিকে দোকানেই দেখেছিল সে
সে গিয়েছিল কন্ডো*ম কিনতে। কন্ডো*ম ফুরিয়ে গেছে তার। কন্ডো*ম ছাড়া সে কারওকেই কখনও গ্রহণ করে না। ছেলেটিকে দোকানেই দেখেছিল সে। আর দেখামাত্রই ভাল লেগেছিল তার। চিকণ শরীর। গালে মাখা বিষণ্ণতা। চশমার আড়ালে শুন্যে ভাসা চোখ। সে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিল। যদি চায়। চায়নি। সে তখন তার পিঠ বরাবর দাঁড়ায় এবং ছেলেটির নিতম্বে চাপ দিতে থাকে। একটিবার ঘাড় ঘুরিয়েছিল সে। বলেনি কিছুই।
সে যখন রাস্তায় দাঁড়ায়, আর কোনও কামার্ত পুরুষ তাকে আবাহন করে, তখন সে দেখে পুরুষটির রুচিবোধ। গড়ন। পরিচ্ছন্নতা। বলিষ্ঠ, রুচিবান ও পরিচ্ছন্ন পুরুষরাই একমাত্র লাভ করে তাকে।
ইদানীং নিত্যনতুন সুনায়র নেয়ই না সে। প্রয়োজন নেই। যৌনতা বৃত্তি হলেও সে যৌনদাস নয়। শুধুমাত্র এই বৃত্তিই তার গ্রাসাচ্ছাদনের সহায়ক নয়। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থায় কাজ করে সে। ভাল মাসোহারা পায়। পড়ায় সে যৌনকর্মীদের। নিরক্ষরকে অক্ষর চেনায়। সে পড়তে-লিখতে
পারে, তাকে দেয় বহির্জগতের দীক্ষা। আর দেয় স্বাস্থ্যজ্ঞান। জন্ম থেকে এ অঞ্চলে থেকে সে দেখেছে, শরীরই সব, শরীরই একমাত্র সারবস্তু, জীবনের মূলধন। কিন্তু শরীরকে যত্ন করে না কেউ। সাজায়। ক্রিম মাখে। শ্যাম্পু করে। গয়না পরায়। দামি পোশাক তোলে। কিন্তু যত্ন করে না। অসুখ করলে চেপে রাখে, যতক্ষণ না দগদগে হয়ে দেখা দেয়।
কন্ডো*ম ব্যবহার করতে রাজি হয় না অনেক খদ্দের। কিছু না করে চলে যাবে বলে ভয় দেখায়। আর বেশ্যার দল উপার্জন হারানোর ভয়ে রাজি হয়ে যায় তখন। আর সংবহন করে রোগজীবাণু।
তাদের শরীরে থিকথিকে রোগ। থিকথিকে অপষ্টি। ভাবলে তার বুকের মধ্যে টনটন করে। যক্ষ্মা, রক্তাল্পতা ও যৌনরোগে সমস্ত প্রাণশক্তি ধ্বংস হয়ে যায়। ইদানীং মড়কের মতো ঢুকে পড়ছে এডস। ভয়াল, ভয়ঙ্কর, এডস।
সে শুধু বোঝাবার চেষ্টা করে। সকলেই সংহত হলে, সকলেই কমে পরার দাবি জানালে, যারা আসে, তারা বাধ্য হবে। চলে যাবে না কোথাও। যাবে না কারণ বেশ্যাদের দুয়ারে যারা আসে তারা কামপীড়িত। সঙ্গম না করে তাদের উপায় নেই।
বেশ্যার দল হেসে-হেসে ঢলে পড়ে এ ওর গায়ে। বলতে থাকে, এবার থেকে বাবুদের টুপি পরিয়ে বসাবে তারা। টুপি পরালে শিশ্নসমূহ কীরকম বেড়ালের ল্যাজের মতো নরম হয়ে যায় তারা আলোচনা করে।
সে নিজে এ সব শব্দ ব্যবহার করে না। তার জিভ আটকে যায়। এইসব বেশ্যাদের মতো সে নিজেকে রাখতে পারে না কুঠুরিবদ্ধ জীবনে। এই অঞ্চলে, এই সব বেশ্যাদের জীবন তার মনে হয়, চির্ডিয়াখানার জন্তু-জানোয়ারের মতো অনেকটা। শুধু তোষণ। শুধু দেহানুরঞ্জন। বিনিময়ে ক্ষয় হয়ে যাওয়া। পেট পুরে খেতে পর্যন্ত পায় সব।
খোলতাই চেহারা থাকলে রোজগার ভাল হয় যদিও। একেবারে সোনা-গয়নায় মুড়ে যায় শরীর। যেমন তার নিজের বাড়ছে ব্যাঙ্কে জমানো টাকার পরিমাণ। কিন্তু তাতেও, সে দেখেছে, এই সব মেয়েদের জন্ম খিদে একটি সংসারের জন্য। স্বামীর জন্য। সমাঁজের স্বীকৃতির জন্য। এই সব স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার কাজও সেই সব নিয়ে। স্বাস্থ্য সচেতনতা গড়িয়ে দেবার সঙ্গে সঙ্গে যৌন কর্মীদের সামাজিক প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন সংগঠিত করা। যৌনকর্মীদের তারা শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃত করতে চায়।
সে নিজে এই সব আন্দোলনে যোগ দেয় না। সে এমনকী বিশ্বাসও করে না, শ্রমিকের স্বীকৃতি পেলেই যৌনকর্মীরা সামাজিক প্রতিষ্ঠা লাভ করবে। গৃহস্থ পাড়ায় বাস করে পাশের বাড়ির কাকিমার হাতে রান্না করা কাঁচকলার কোপ্তা পাবে, অথবা কাকুর কাছে হয়ে উঠবে ঘরেরই মৌটুসী।
হবে না। হবে না এমন। হাজার বছরের পুরনো এই বৃত্তি টিকে আছে। ঘৃণিত হয়েই। এই ঘৃণা মুছতে চলে যাবে আরও হাজার বছর। ঠিক যেমন করে সমাজে দেবতারা প্রতিষ্ঠিত হয়, আর পেয়ে যায় এক অনন্ত আয়ু। কিন্তু অনন্তও শেষ হয়ে যায় একদিন। কারণ অনন্ত পরিবর্তিত হয়ে পায় অন্য অনন্তধারা। এক অসীম অন্য অসীমে ধাবিত হয়। এক যম, আজও জীবিত থেকে পরিবর্তিত হয়েছেন কতবার। পুরাণে যম ন্যায়ধর্মের অধিপতি ধর্মরাজ। ধর্মাধর্ম বিধানজ্ঞ সর্বধর্ম প্রবর্তক। ঋগ্বেদে যম অগ্নিস্বরূপ। অগ্নিরূপী যম উচ্যতে। তিনি অপশক্তিরূপে সমস্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ড সংযমিত করেন। আবার এই ঋগ্বেদেই যমকে বলা হচ্ছে সূর্য। সমস্ত কিছুর মধ্যে থেকে সারা বিশ্বভূমন্ডলকে প্রতিপালিত করছেন সুর্য। যিনি সূর্য তিনিই যম! অন্তরীক্ষ তিনি। মাধ্যমিক। মাধ্যমিকো যম ইত্যাহুঃ।
