পাখিদের আগমন সুবিধার্থে মঞ্চের ওপর দিক খোলা। সেই চারখানি কুয়ো বরাবর মঞ্চ থেকে নেমে এসেছে চারখানি ঢাকা দেওয়া নর্দমার আলি।
জন বুঝিয়ে দেন, মঞ্চের তল ঢালু। দেহাবশেষ হিসেবে যে টুকরোটাকরা থাকে, ওই ঢালু বেয়ে নেমে আসে নীচে আর নর্দমাহিত হয়ে কুয়োয় পড়ে যায়। যতটুকু থাকে, প্রাকৃতিক বারিপাতে চলে যায় নালিকা বেয়ে।
যদি বৃষ্টি না হয়, কী হয় তখন? শুভদীপ ভাবে, কিন্তু প্রশ্নটি করে না। সে বরং ভাবতে থাকে, কত দিন গিয়েছে এ পথে, জানতেও পারেনি এইখানে রয়ে গেছৌডপগত ডয়াছগঠকগ। নৈঃশব্দ্যের স্তম্ভ। এখানেই মাংসাশী পাখিরা খেয়ে যাচ্ছে মরা মানুষের হাড়-মাস। সে কল্পনা করে–প্রিয়জনের দেহ থেকে মাংস ছিঁড়ে খাচ্ছে পাখিরা, জেনে সতৃপ্ত ফিরে যাচ্ছে পরিজন।
এই প্রথম তার মনে হয় সে পৃথক ধর্মের। পৃথিবীর অসংখ্য লোকের সঙ্গে তার বিশ্বাস, বোধ, রুচি ও জীবন-যাপনে অসংখ্য অমিল। তার ধর্মে মৃতদেহ শেয়ালে-শকুনে ছিঁড়ে খেলে পাপ। অন্যায়। অমঙ্গল।
জন বলে চলেন, যে যত বেশি পুণ্যবান, তার দেহ খেতে আসে তত বেশি পাখি। পাখিরা, পবিত্র বায়স, শকুন, চিল পুণ্যের গন্ধ পায়।
তখন একটি পাখি শিস দেয়। সে শিস শুনে চমকে ওঠে। শিস শুনলে চন্দ্রাবলী স্বর মেলানোর চেষ্টা করত। পঞ্চমে না ধৈবতে। বিভোর হয়ে পড়ত। চন্দ্রাবলী। চন্দ্রাবলী তাকে ছেড়ে থাকতে পারত না। তাকে না দেখে থাকতে পারত না। সেবার সে যখন চন্দ্রাবলীকে সম্পর্ক না রাখার কথা জানিয়ে চলে যায়, তিনদিন সম্পূর্ণ তিনদিন চন্দ্রাবলী সামানাও যোগাযোগ করেনি। কিন্তু একদিন ভোরবেলা, ছ’টাও বার্জেনি, সে আলুথালু উপস্থিত হয় শুভদীপের বাড়ি। সৌভাগ্য তার দরজায় শব্দ হতে আর কারও ঘুম ভাঙার আগেই সে-ই উঠে পড়েছি আর দেখেছিল আরক্ত চোখ, এলোমেলো চুল–সম্মুখে চন্দ্রাবলী তাকে দেখেই সে কেঁদে ফেলে নিঃশব্দে। কালো গালে অনর্গল অশ্রপাত করে।
সে তখন চন্দ্রাবলীকে বাড়ি থেকে দুরে এটি তিনকোনা মোেড় দেখিয়ে দেয়। অপেক্ষা করতে বলে তৈরি হয় দ্রুত। মা উঠে পড়েছিল। তাকে বেরুতে দেখে কোথায় যাচ্ছে প্রশ্নও করেছিল। অত্যন্ত নৈপুণ্যে একটি মিথ্যে বলে সে তখন। মহুলির স্বামী বাণিজ্যিক ভ্রমণে গেছেন এবং মহুলি অসুস্থ হয়ে পড়ায় তাঁর পরিচারিকা তাকে ডাকতে এসেছে।
মা তখন কপালে হাত ঠেকিয়েছিল। মহুলির আরোগ্য কামনা করেছিল মনে মনে। আর সে বেরিয়ে এসেছিল। পাড়া-প্রতিবেশীর নজর এড়াতে চন্দ্রাবলীকে নিয়ে সে দ্রুত উঠে পড়ে একটি ফাঁকা ট্রামে। আর চন্দ্রাবলী ট্রামের পরিচালককে পরোয়া না করে, যাত্রীদের তোয়াক্কা না করে অবিশ্রাম কাঁদো কাঁদে আর তার কাছে সম্পর্ক ভিক্ষা চায়। ভিক্ষা চায় আর বার বার বলে মহুলিকে সে নেবে। মেনে নেবে। কিন্তু শুভদীপকে ছাড়তে পারবে না।
চারপাশ ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত বোধ করে সে। মাথায় যন্ত্রণা টের পায়। শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করে তার। তবু সে বলে না কিছুই। বরং শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করে বলেই সে এইডিপগত ডঘ ছগঠকগ থেকে বেরিয়ে পড়ার তাগিদ বোধ করে। হঠাৎ পর পর কিছু সমাধি চোখে পড়ে তার, এবং সে থমকে দাঁড়ায়।
জন ব্যাখ্যা করেন তখন, যুগ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রীতি পরিবর্তন ব্যাখ্যা করেন। কিছু কিছু পার্শি পরিবার প্রকৃতিকে দেহ ফিরিয়ে দেবার এই রীতি মেনে নিতে পারছে না এখন। মুসলমান ও খ্রিস্টানদের অনুসরণে মৃতদেহ সমাধিস্থ করছে কেউ, কেউ আবার হিন্দুদের প্রভাবে মৃতদেহ দাহ করে ছাই’ এনে সমাধিস্থ করে যাচ্ছে ডিপগত ডঘ ছিঞগঠকগ-এর কাছাকাছি। ধর্মকে তারা গড়িয়ে দিচ্ছে নিজের মতো।
শুভদীপ সমাধির খুব কাছে চলে যায়। সেই অজানা অচেনা গন্ধ পায় সে। যে-গন্ধ মিষ্টি নয়, কটুও নয়, তীব্র নয়, হালকাও নয়। উগ্র নয়, নয় মাদকতাময়। সে ফুল খোঁজে। কোনও বিশেষ ফুল পায় না। শুধু জনের স্বর ভেসে আসে।
পার্শি সম্প্রদায়ের এই পরিবর্তনে তিনি দুঃখিত নন আনন্দিতও নন। পরিবর্তনই জগতের ধর্ম। যেমন করে শৈশব থেকে যৌবনে, যৌবন থেকে বার্ধক্যে উপনীত হয় মানুষ, মানুষ এবং গোট্টাজীবজগৎ, না চাইলেও পরিবর্তিত হয়ে যায় দেহকলা—তেমনি–এমনকী ধর্মেরও পরিবর্তন অপ্রতিরোধ, অনিরুদ্ধ।
শুধু জন, নিজের ক্ষেত্রে, সেই পুরনো প্রথাই অনুসৃত হোক চান। সমস্ত জীবন তাঁর কেটে গেছে এই স্তম্ভের পরিমার্জনায়। মৃত্যুর পর তিনি অতএব শুতে চান ওই শ্বেতপাথরের বেদিতে আর পরিজন বাহিত হয়ে স্নানঘরে যেতে চান। স্নাত হয়ে তিনি নীত হতে চান পবিত্র স্তম্ভে। প্রার্থনা করেন—যেন বহু পাখি খেয়ে যায় তাঁকে। শত শত পাখি। এতটুকু অবশেষ যেন তারা ফেলে না রাখে।
চন্দ্রাবলী বলত, তার মৃত্যুর পর সে দাহ হতে চায় না। সে ইচ্ছাপত্র করতে চেয়েছিল, যেন তাকে সমাধিস্থ করা হয়।
চন্দ্রাবলী। চন্দ্রাবলী।
হিমেল হাওয়া বয়। গাছের শুকনো পাতা সরসর শব্দে খসে পড়ে।
চন্দ্রাবলী। চন্দ্রাবলী।
শুভদীপ সমাধি ফলকের লেখা পড়তে থাকে। জন ক্ষমা চেয়ে দপ্তরে চলে যান এবং একটি খাম শুভদীপের হাতে তুলে দেন। চিকিৎসা ও পথখরচের জন্য যৎসামান্য অর্থ। শুভদীপ প্রত্যাখ্যান করতে চায় কিন্তু জনের আর্তি ও আন্তরিকতাকে ফেরাতে পারে না। পকেটে খাম রেখে সে প্রার্থনা কক্ষের দিকে এগোয়। মনে মনে উচ্চারণ করে সমাধি ফলকের সেই লেখা। অচেনা জায়গায়, অচেনা ধর্মের পরিমণ্ডলে তার মনে পড়ে সেইদিন কত আশ্চর্য পন্থায় চন্দ্রাবলী তার বাড়িতে পৌঁছেছিল। ঠিকানা জানত না। শুধু জানত নিকটবর্তী স্কুলের নাম। জানত, শুভদীপ স্কাউটের দলে ছিল। অন্ধকার থাকতেই একটি ট্যাক্সি নিয়ে সে পৌঁছে যায়, শুভদীপদের অঞ্চলে, এবং জনবিরল পথে যাকে পায়, তাকেই প্রশ্ন করতে করতে এগোয়। তাকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছিল চা-ওয়ালারা। দুধের দোকানের মালিক। আর কাগজের হকার।
