নৈনা অন্তরি আব তু জু হে নৈন ঝঁপেউঁ।
না হৌঁ দেখৌঁ ঔরকু না তুঝ দেখন দেউঁ
–এসো আমার চোখে, আমি বুজে ফেলব চোখ। আমি আর কারওকে দেখব না। তোমাকেও আর দেখতে দেব মা অন্য একজনকেও।
কবীর রেখ সিন্দুরকি কাজল দিয়া ন জাই।
নৈ রমইয়া রবি রহা দুজা কহাঁ সমাই॥
–কবীর বলে, যেখানে সিঁদুররেখা দেবার কথা, সেখানে দেওয়া যায় কাজল। আমার দু’চোখে রামকে দিয়েছি আসন, সেখানে অন্যের স্থান। কোথায় হবে।
মন পরতিতি ন প্রেম-রস নাঁ ইস, তনমেঁ ঢংগ।
কেয়া জানোঁ উস পীবসুঁ কৈসেঁ রহসি রংগ॥
—বিশ্বাস করতে পারি না কিছু মনের মধ্যে প্রেমের নাগাল পাই না। এ শরীরে যে প্রিয়তমকে আকর্ষণ করার মতো কিছুই নেই। কী কৌশলে তার সঙ্গে রঙ্গরহস্যে ডুব দেব আমি?
০৮. সেই রাত্রেই জ্বর এসেছিল
সেই রাত্রেই জ্বর এসেছিল শুভদীপের। সঙ্গে বমি ও বহুমলত্যাগ। ওই নির্জনতায়, ওই গ্রাম্য জেলেপাড়ায় কোনও চিকিৎসকের সন্ধান পাওয়া যায়নি। চন্দ্রাবলী অপরূপ সেবা করেছিল তার। সারা রাত্রি শিয়রে বসেছিল। আধঘণ্টা পর পর খাইয়েছিল নুন-চিনির জল।
সে দিশেহারা হয়ে পড়েছিল তখন। জীবন মানে শুধু দারিদ্র নিয়ে ভাবনা-চিন্তা নয়। প্রেম-ভালবাসা নিয়ে কান্নাকাটি মান-অভিমান নয়। জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বমন, ঘন কফ, কফে রক্তের ছিটে লেগে থাকা, জড়িয়ে থাকে মূত্রত্যাগ ও ক্যাথেটার, এবং মল। দুর্গন্ধযুক্ত মল।
সে বমনের বেগ পেলে ছুটে যাচ্ছিল স্নানঘরে আর বমনের চাপে তার মল বেরিয়ে আসছিল। সে রোধ করতে পারছিল না। তার পোশাকে মল মাখামাখি হয়ে যাচ্ছিল আর স্নানঘরের মেঝেতে গড়িয়ে পড়ছিল উদ্গিরণের ময়লা।
চন্দ্রাবলী যত্নে ধুয়ে দিচ্ছিল তাকে। ময়লা পোশাক খুলে পরিয়ে দিচ্ছিল পরিষ্কার পোশাক। পুতিগন্ধময় সেইসব পেশিাক ঘষে ঘষে পরিষ্কার করছিল এবং স্নানঘর ধুয়ে দিয়েছিল নিজহাতে।
ভোরবেলা লোক পাঠিয়ে ওষুধ আনায় সে এবং রসুইঘরে গিয়ে তার জন্য পথ্য প্রস্তুত করে।
দুপুর থেকেই সে একটু একটু সুস্থ বোধ করেছিল।
দু’দিন ক্রমাগত শুশ্রুষার পর তৃতীয় দিন কান্নায় ভেঙে পড়েছিল চন্দ্রাবলী। এই বলে যে শুভদীপ বাড়িতে অসুস্থ হলে সে দেখতেও যেতে পারবে না। কারণ শুভদীপ কখনও তাকে বাড়িতে ডাকেনি।
এমন নয় যে শুভদীপের বান্ধবীরা তার বাড়িতে আসে না। কলেজের বান্ধবী সোমা ও সুপ্রিয়া এসেছে কয়েকবার। মহুলি এসেছে। সোমা ও সুপ্রিয়ার তুই-তোকারি সম্বোধন ও ন্যাকামিবর্জিত স্বাভাবিকতায় মায়ের কখনও কোনও সন্দেহ জাগেনি। মহুলিকে দেখেও নয় কারণ মহুলি বিবাহিতা। মহুলি শুভদীপের উচ্চপদস্থ সহকর্মী। বরং মা মহুলিকে সমাদর করেছিল খুব।
কিন্তু চন্দ্রাবলী সহকর্মী নয়। সহপাঠী নয়। বিবাহিতা নয়। বরং স্বামীবিচ্ছিন্ন সে। বিবাহবিচ্ছিন্ন। তার সঙ্গে কোনও সম্পর্ক মা মেনে নেবে না। এমনকী শুভদীপেরও ইচ্ছে করেনি কখনও। চন্দ্রাবলীকে বাড়ি নিয়ে যেতে।
চন্দ্রাবলী কান্নার ভেতর বলে তখন। ফের বিয়ের কথা বলে। রবিদার সঙ্গে বিচ্ছেদ আইনসম্মত হলেই তারা বিয়ে করবে বলে। শুভদীপ অবাক দেখে, মহুলি নামের অন্য একজনের সরব অস্তিত্ব এই মেয়েটির বিয়ের স্বপ্ন ভেঙেচুরে দেয়নি।
তার ইচ্ছে হয়েছিল দৃঢ় ধমকে সে চন্দ্রাবলীর স্বপ্ন ভেঙে দেয়। চিৎকার করে বলে, বিয়ে নয়। বিয়ে কখনও সম্ভব নয়। কিন্তু পারে না। এতখানি শুশ্রুষার ঋণ তার কণ্ঠ রোধ করে দেয়, সে ভাবে, পরে বন্ধৰে। পরে নিশ্চিতই ধমকে থামিয়ে দেবে কোনও দিন।
এবং ফিরে আসে তারা। নির্জন তালসারি থেকে শহরে প্রত্যাবর্তন করে। বাস থেকে নেমে দু’জনে দু’দিকে যাবার জন্য তৈরি হয়। তখন, শুভদীপ, বিনা ভূমিকায় বলে দেয়, সে আর চন্দ্রাবলীর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে সম্মত নয়। এবং চন্দ্রাবলীকে কোনও সুযোগ না দিয়েই বাসে উঠে যায়।
একটি শক্ত বস্তু শুভদীপের মাথায় এসে পড়ে। সে হাতে নিয়ে দেখে একটি শুকনো মরা হাড়। এবং ফেলে দেয়। জন লক্ষ করেন এবং হেসে আশ্বস্ত করেন। মানুষের হাড় নয়। বলেন। পশুপাখির হাড় কোনও। পাখিরা ঠোঁটে তুলে নিয়ে আসে বাইরের বাজার থেকে। সে সম্মুখস্থ ফুলের দিকে তাকায়। একটি খয়েরি ও সাদা মেশা বৃহৎ ডালিয়া। জন কথা বলে যান। মানুষের সুখ-দুঃখের কথা। ক্লেশ ও যন্ত্রণার কথা। মানুষের দুঃখ কষ্টের শেষ নেই বলেন তিনি। সারাজীবন শোকে, তাপে, যন্ত্রণায় জর্জরিত মানুষেরা প্রকৃত শান্তি পায় মৃত্যুর পরেই। যখন তারা এই নৈঃশব্দ্যের স্তম্ভের কাছে পৌঁছয়, আর মৃতদেহ হিসেবে শায়িত হয় এই বেদিতে—
শুভদীপ দেখতে পায় একটি পরিচ্ছন্ন শ্বেতপাথরের বেদি। সবুজ ঘাসের ওপর প্রকাশিত রজতশুভ্রতায়।
…যখন তারা নীত হয় ওই কক্ষে এবং স্নাত হয় আত্মীয়-পরিজনের দ্বারা–
তারা ঢুকে পড়েছে প্রাচীরঘেরা এলাকার ভেতর আরও এক প্রাচীরঘেরা জায়গায়। সেইখানে বেদি। দূরে মোটা মোটা থাম ও খিলামের ঘর। পুরনো অথচ সুঠাম মজবুত। সেইখানে মৃতদেহ স্নাত হয়।
…যখন স্নাত হয়ে, পরিজন বাহিত হয়ে স্তম্ভে চলে যায়, নৈঃশব্দ্যের স্তম্ভে আর নিজেকে বিলিয়ে দেয় পাখিদের ভোজনের তরে, পাখিরা ছিঁড়ে নেয় মাংস আর মানুষটির দুঃখ দুর হয়, কষ্ট দূর হয়, পাপ, শাপ, সন্তাপ দূর হতে থাকে—
শুভদীপ সবিস্ময় দেখে। মৃত্যুর পর পরিণতি দেখে।
একটি উঁচু গোল মঞ্চ। বিশাল আয়তনে। মেনি বিশাল প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। আর মঞ্চ ঘিরে মাটির ওপর বৃত্তাকার বাঁধানো অঞ্চল। তার চারকোণে চারখানি সুগভীর কুয়ো৷ ঢাকা। বাঁধানো, মাটি থ্রেকে মঞ্চ অবধি সিড়ি। সিড়ির মুখে সবুজ রং করা তালাবন্ধ দরজা একমাত্র জন ও মৃতদেহবাহকেরা সেইখানে যেতে পারে। আর কেউ নয়।
