আর শুভদীপের বিবমিষা আসে। সে পিছু হটে। দেখতে পায়, চন্দ্রাবলীর খোলা ঠোঁট ঝুলে আছে। নড়ছে। চোখ সম্মোহিত। শুভদীপ কেন তার জীবনে এত দেরি করে এল তাই বলছে বারবার। আর ঝাপ দিচ্ছে। শুভদীপকে জড়িয়ে নিতে ঝাপ দিচ্ছে অবলীলায়। আর শুভদীপ তাকে ঠেলে ফেলে দিচ্ছে, ঘৃণ্য ঘেয়ে লোম ওঠা কুকুরী যেমন ঠেলে ফেলে দেয় মানুষ।
চন্দ্রাবলী বিস্ময়াহত তাকিয়েছিল তার দিকে। তারপর ধীরে ধীরে জল গড়িয়ে দিচ্ছিল চোখ থেকে। এই বিশাল বালুচর, যার ওপর তারা দু’জন ছাড়া আর কেউ ছিল না, যা ছিল তাদের একার, একান্তের—তার ওপর দাড়িয়ে এই প্রত্যাখ্যানে তার বুক ভেঙে খানখান।
শুভদীপের দিকে পিঠ ফিরিয়ে একটি একটি করে পোশাক পরে নিয়েছিল সে। তারপর প্রশ্ন করেছিল, শুভদীপ কি ভালবাসেনি তাকে? কেন তা হলে সে থেকে যাচ্ছে তার সঙ্গে সারাক্ষণ? কে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হচ্ছে তারা?
কথা বলতে ভাল লাগছে না এমন অজুহাত দেয় সে। অতিথি নিবাসে ফিরে সে আলোচনায় যোগ দেবে—এমন বলে। চন্দ্রাবলী জোর করে না।
সমুদ্র দেখার অভিলাষ চলে গিয়েছিল তাদের।নীরবে হাঁটতে হাঁটতে তারা খাড়ির কাছে পৌঁছয়। যাওয়া এবং প্রবর্তনের চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত করে চন্দ্রাবলী স্তব্ধ হয়ে ছিল। হাতছানি দিয়ে নৌকা ডেকেছিল শুভদীপ। তারপর অতিথিনিবাসে ফিরে স্নান করে নেয় দু’জনে। এবং স্নান করা মাত্রই শুভদীপের তীব্র কাম জাগে। তৎক্ষণাৎ কামার্ত পুরুষ হিসেবে সে চন্দ্রাবলীকে শুইয়ে দেয় বিছানায়। চন্দ্রাবলী এতটুকু আপত্তি করে না।
বরং নিজেকে সমর্পণ করে।
এবং যখন সে অন্তঃস্থিত, যখন তার দেহ সংলগ্ন হয়ে আছে চন্দ্রাবলীর দেহে, যখন পরস্পরের পরামরাজিতে ঘটে গিয়েছে আলিঙ্গন—যখন সে, শুভদীপ, স্বদেহ প্রকাশ করে নগ্ন রাত্রির দেহে শুয়ে আছে টানটান আর আবিষ্ট নিদ্রার ন্যায়—তখন তার পিঠে হাত রেখে, গালে চেপে গাল, তাকে আবার পুরনো প্রশ্নের মুখোমুখি করে দেয় চন্দ্রাবলী। জিজ্ঞাসা করে, সে কি তবে ভালবাসাবিহীন শরীর সংযোগ করে? কেন করে? কেন?
ঘোর টুটে যায়। শুভদীপ কঠোর মুখে তাকায় তখন। উঠে পড়তে থাকে। সংলগ্ন স্নানঘরে যায় আর পোশাকে আবৃত করে দেহ। চন্দ্রাবলী শুয়ে থাকে। খোলা। আনমনা। উদাস। শুভদীপ সহ্য করতে পারে না। যে-দেহে সে উপগত হয়েছে কয়েক মুহূর্ত আগে, স্বেচ্ছায়, স্বকামনায়, সেদেহ অবান্তর মনে হয়। উন্নত পেট ও বিপুল বক্ষদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় সে।
চন্দ্রাবলী প্রশ্ন করে ফের। একই প্রশ্ন। অবিকল। শুভদীপ জল খায়। চন্দ্রাবলীর থেকে দূরত্ব বজায় রেখে বালিশে পিঠ ঠেকিয়ে বসে। তারপর কঠোর কণ্ঠে বলে সেই সেদিনের কথা। রায়মাটাং বনে যাবার পথে থেকে যাওয়া তাদের। শিলিগুড়ি শহরে। আর সে-রাত্রে পরিচয় গভীর ছিল না, প্রেম ছিল না, ভালবাসার সম্ভাবনা ছিল না, কিন্তু শরীর সর্বময় ছিল। স্বেচ্ছায়। কেন?
চন্দ্রাবলী ভেঙে পড়েছিল। কান্না আটকে যাওয়া বিকৃত স্বর ভেঙে ভেঙে বোঝাবার চেষ্টা করেছিল, সুন্দরবনের সেই অসামান্য ভ্রমণকালে শুভদীপের শির চাঁদ স্পর্শ করে, আর সে, চন্দ্রাবলী, জল সাক্ষী রেখে, জ্যোৎস্না সাক্ষী রেখে, নৌকার গলুইয়ের শুভলক্ষ্মীকে সাক্ষী রেখে, বনবিবি ও দক্ষিণরায়ের আশীর্বাদ দিয়ে শুভদীপকে ভালবেসে ফেলে। এমন ভালবাসা সে কারওকে বাসেনি আগে। কখনওব্রসেনি। সে শুধু সর্বাংশে শুভদীপকেই নিয়ে নেয় সেদিন। তার ভুল-ভ্রান্তি ন্যায়-অন্যায় সমেত। তার ভাল-মন্দ, কল্যাণ-অকল্যাণ সমেত। তাই শরীর বিষয়ে কোনও দ্বিধা ছিল না তার। আজও নেই। যাকে মনের মধ্যে বসিয়ে দেওয়া যায়, সে যে শরীরেও থাকে সারাক্ষণ।
শুভদীপ তখন মহুলির কথা বলে দেয়। বলে দেয় মহুলিকে সে ভালবাসে। ভালবাসবে। বলে দেয় আর রোষে দগ্ধ হতে থাকে। কেন এই রোষ সে নিজেও জানে না। এবং টের পায়, মহুলির কথা বলতে বলতে অদ্ভুত আরামে ভরে যাচ্ছে মন। চন্দ্রাবলী কাদছে। হো-হো কাঁদছে। বালিশে মুখ চেপে শব্দ কামড়ে কাঁদছে। খোলা চুল ভোলা পিঠময়। কান্নার দমকে ভারী নিতম্বে দোল লাগছে। তার খেয়াল নেই সে নগ্ন। অনাবৃত। কাদছে। আর শুভদীপের আরাম হচ্ছে। অদ্ভুত আরাম। সে ব্যাগ খুলে ছবি বার করছে। মহুলির ছবি। এই সফরেও সে মহুলিকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে।
ছবি হাতে নিয়ে চন্দ্রাবলী আশ্চর্য শান্ত হয়ে যায়। রাগে না। চেচায় না। চোখের জল মুছে ফেলে। যত্ন করে পাশে ছবিটি রেখে সে একে একে পোশাক পরে নেয়। আবার ছবিটি হাতে নিয়ে দেখে। ফিরিয়ে দেয়। উদাস চোখে জানালার কাছে দাঁড়ায়। যেন, মহুলির সৌন্দর্যের কাছে বিনা যুদ্ধে তার আত্মসমর্পণ।
বিছানায় মিলনের দাগ লেগে আছে তখনও। চন্দ্রাবলীর হালকা ঘরোয়া, পোশাকেও লেগে গিয়েছে দাগ। সে তার চুল তুলে মস্ত খোঁপা করছে। আরও একবার স্নানের আয়োজন নিয়ে চলে যাচ্ছে স্নানঘরে। নিঃশব্দে কেটে গিয়েছে কিছুক্ষণ। শুভদীপের আর মহুলির ছবি দেখতে ভাল লাগছিল না। যেন সুর বেপথুমান হল। তাল কেটে গেল সময়ের। সে ছবিটি ঢুকিয়ে রাখল ফের। আর তখন, নিঃশব্দ ধারাস্নানের ভেতর থেকে বেপথুমান সুর টেনে, বেতালকে তালে বেঁধে শব্দাবলি ছড়িয়ে দিল বাতাসে। বন্ধ দরজা ঠেলে সেই সব শব্দ এসে পৌঁছল বিছাৰ্যায়। সে শব্দগুলিকে আলাদা করতে পারল না। স্নানঘরের দরজা খুলে গেল। চন্দ্রাবলী সুরের ধারায় ভেজানোনা চুল সুরের হাওয়ায় শুকোতে লাগল। শুভদীপ চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইল। সে না চাইলেও তার মন চন্দ্রাবলীর সুর ছাড়িয়ে অন্য কোথাও যেতে পারল না।
