বেড়াতে তারা ভালবাসত দু’জনেই। কিন্তু এই কয়েক মাস কেটে গেলেই যে ভ্রমণপিপাসা জেগে উঠত তাদের, তার মধ্যে শরীরও ছিল অনেকখানি। সে তো জেগেই থাকত, তৃষ্ণার্ত হয়েই থাকত মহুলির দ্বারা। সুতরাং সে শুধু মোচন করত নিজেকে। নিজের মোচন ঘটাত। উপভোগ করত না। উপভোগের জন্য তার চাহিদা সুন্দর শরীর। খেত, ক্ষীণ, নরম ও ভরাট। সুদৃশ্য ও সুগঠিত। মহুলির শরীর। যা সে সম্পূর্ণ পায়নি কখনও। এমনকী মহুলির না হলেও মালবিকাদির শরীর। কিন্তু সে কালকের মালবিকা মেয়েটির সাদামাটা বুক পেট নিমতল সৌন্দর্যের তরে চায় না। এবং বিরাট, বিশাল, কালো ও কুদর্শনে তার তৃপ্তি ছিল না এতটুকু। তবু শরীরের এত তীব্র খিদে সে চলে গিয়েছিল তালসারি। গিয়েছিল মাইথন। এবং কোণার্ক।
তালসারিতে তাদের প্রার্থিত নির্জনতা ছিল। অনেকটা বালিয়াড়ি পার হয়ে তারা পেয়েছিল সুগভীর খাঁড়ি। খাঁড়ি পার হলে+ধু বালিয়াড়ি পার, হলে, সমুদ্রের রেখা। বহু দূর সে-সমুদ্র স্নানের উপযোগী নয়। নরম পাড় সমুদ্রকে ছুঁয়েই তলিয়ে গেছে হঠাৎ। যেন এই ছিল তার সারা জীবনের সাধনা। সমুদ্রকে ছোঁয়া। তবে ঢেউয়ের সঙ্গে আছড়ে পড়া জলে অল্প গা ভিজিয়ে নেওয়া যায়।
খাঁড়ির গায়ে সার সার নৌকা বাঁধা। তারা দু’জন নৌকা চেপে পার হয়েছিল খাড়ি। আর সৈকতে পৌঁছেছিল। বালির মধ্যে পা ডুবছিল তাদের আর গতি হচ্ছিল শ্লথ। বর্ষা তখন লাগছিল সবে আকাশে। কিন্তু ছায়া ফেলেনি। গরম বালু। গরম হাওয়া। চন্দ্রাবলীর সালোয়ারে বালু মাখামাখি। কপাল বেয়ে ঘাম ঝরছিল টুপটাপ। কী এক অপার খুশিতে দু’চোখে ছিল বালুকাবেলার চিকচিক। একটু হাঁপ-ধরা স্বরে গান গাইছিল সে। সুর ঝরিয়ে চলেছিল। তার দিকে তাকিয়ে হেসে প্রশ্ন করেছিল এ সুর সে চেনে কিনা। সে মাথা নেড়েছিল। চেনে না। ছায়াপট। বলেছিল সে। তারপর বাণী শুনিয়েছিল। সুর যে কথাগুলি আশ্রয় করে আছে সেই কথা। এমন বহু বাণী মুখস্থ ছিল তার।
সাঁঈকে সঙ্গ সাসুর আঈ।
সঙ্গ না রহি স্বাদ না জানৌ।
বয়ো জোবন সুপনেকী নাঈ।
সখী-সহেলি মঙ্গল গাবেঁ
সুখদুখ মাথে হরদি চঢ়াঈ।
ভয়ে বিবাহ চলি বিন দূলহ
বাট জাত সমধী সমঝাঈ।
কহৈঁ কবীর হম গৌণে জৈবে তরব কন্ত লৈ
তুর বজাঈ।
সে একটি বর্ণও বোঝেনি। তাই অর্থ জানতে চেয়েছিল। বুঝিয়েছিল সে। সে বিশ্বাস করত, সুর যে বাণীকে আশ্রয় করে, তার প্রত্যেকটি অর্থ বোধগম্য না হলে গানের প্রকাশ সঙ্গত হয় না। গান নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করত সে। পড়াশোনাও করত। কিন্তু গান মাধ্যমে কখনও সে বিখ্যাত হতে চায়নি। সে বরং তার জীবনের অর্ধেক দিয়েছিল গানকে। অর্ধেক সে লালন করত একটি নিটোল সংসারের স্বপ্নে ভরা।
সেদিন, বালিতে পা ডুবিয়ে চলতে চলতে গানের অর্থ বলে সে। সে কি ভেবে এসেছিল, এটাই বলবে, এমনই গাইবে বালিয়াড়িতে পা দিয়েই? কিন্তু সে স্বীকার করতে বাধ্য হয় অন্তত নিজের কাছে ততখানি জটিল, ততখানি সুপরিকল্পিত ছিল না চন্দ্রাবলী মেয়েটি তার ছিল আবেগ। আপাদমস্তক চটচটে আবেগ।
“স্বামীর সঙ্গে শ্বশুরবাড়ি এসেছি।
কিন্তু থাকতে পারিনি সঙ্গে।
জানি না স্বামীসঙ্গের স্বাদ। স্বপ্নের
মতো কেটে গেল এ যৌবন। সখীরা
ঙ্গলিক গায় আর আমার মাথায়
দেয় সুখ-দুঃখের হলুদ। বিয়ে হয়ে
গেল আমার। কিন্তু স্বামীকে ছাড়াই
চলেছি। জ্ঞাতি-গোষ্ঠী পথ দেখিয়ে
নিয়ে যাচ্ছে। কবীর বলছে, আমি
দ্বিতীয় বিয়ের পর শ্বশুরবাড়ি যাব।
প্রিয়তমকে নিয়ে তুরী বাজিয়ে চলে
যাব।”
সমুদ্রের গা-ঘেঁষা পারে যখন পৌঁছেছিল তারা, পেছনে তাকিয়ে দেখেছিল, খাঁড়ির পারে সার-সার নৌকাগুলিকে বিন্দুর মতো লাগছে। সুতরাং নৌকার মানুষের কাছে তারাও ছিল বিন্দুবৎ। বিপুল ঢেউ সমুদ্রে ছিল না। হাওয়ার আদরে জলের গায়ে অল্প অল্প দোলা। দিগন্তবিস্তৃত জল। তরঙ্গ নেই বলে সমুদ্র যেন তেমন করে সমুদ্র নয় এখানে। অনেকটা, সুন্দরবনে গিয়ে মোহনা যেমন দেখেছিল তেমনই। জলে নানা রঙের ছড়া। পারের বালুতে মিশে গৈরিক জল কিছু দূর অবধি গিয়ে বুজাভ। তারপর নীল। নীলের পর চকচকে। রৌদ্র পড়ে সুবিস্তৃত আলোয় প্রতিফলিত পরকলা। কোনও এক অদৃশ্য বৃহৎ চোখের বৃহত্তর কাচ।
সে সমুদ্রের দিকে মুখ করে স্তব্ধ দাড়িয়েছিল। একটিও কথা বলতে তার ভাল লাগছিল না। কিন্তু চন্দ্রাবলী আনন্দে দিশেহারা হয়ে পড়ে। বড় অস্থির সে তখন। বড় চঞ্চল।
একটা গোটা সমুদ্রবেলায় তারা মাত্র দু’জন। যেন এই বেলাভূমি, তারা আসবে বলেই সাজিয়ে রেখেছে প্রকৃতি। তার ওপর চন্দ্রাবলী খুশি বাজিয়ে ঘুরছিল। তার চলায় নৃত্যছন্দ প্রকাশ ছিল সেদিন। দু’হাত দু’পাশে ছড়িয়ে সে আঃ বলছিল, উঃ বলছিল। কিছুক্ষণ ছুটোছুটি করে হঠাৎ সে প্রশান্ত হয়ে যায়। ধীর পায়ে এগিয়ে আসে শুভদীপের কাছে এবং চোখে চোখ রাখে নিঃশব্দে কিছুক্ষণ।
শুভদীপ সমুদ্র থেকে চোখ ফিরিয়ে চন্দ্রাবতীতে নিবদ্ধ করতে চায়নি। কিন্তু চন্দ্রাবলী দৃষ্টি আকর্ষণ করে তার। এবং একটি ইচ্ছার কথা জানায়। খোলা আকাশের নীচে, গায়ে রোদুর মেখে, ধুলোবালি জড়িয়ে সঙ্গমের ইচ্ছা। স্বপ্নের পুরুষের সাথে সঙ্গম।
অতএব সে তার দীর্ঘ কেশ মুক্ত করে দেয়। দোপাট্টা ফেলে দেয় বালুকাবেলায়। হাওয়ায় দোপাট্টা উড়ে যেতে থাকে। কামিজ খুলে ফেলে সে। অন্তর্বাস খুলে ফেলে। উথলে ওঠে কালো ভারী স্তন। সালোয়ার খুলে ফেলে। মেদবহুল পেট নেমে আসে নিষিদ্ধ বস্তার মতো। এবার সে শেষতম অন্তর্বাসে টান দেয়। তার চুল ওড়ে। পোশাক বিক্ষিপ্ত ছড়িয়ে যায়। মত্ত হস্তিনীর মতো হেলেদুলে সে এগোয়। চোখের পলক ফেলে না। শরীরের মেদ-মাংস থরথর নড়ে।
