মা-বাবা মারা গিয়েছেন তার শৈশবেই। চার ভাইবোনের মধ্যে ছোট জন। বোন সংসারে থিতু। দাদারা বড় ব্যবসায়ী। তিনি তাই পিছুটানহীন। অনায়াসে চলে এসেছেন শান্তিস্থলে। এই Tower of silence—এই শান্তিস্থল—এই কোলাহলপূর্ণ শহরের মধ্যে থেকেও যেন পরিপূর্ণ নীরবতাময়। বাইরের সব শব্দ এর উচু উচু প্রাচীরগুলিতে প্রতিহত হয়ে ফিরে যায়। এবং ভেতরকে শান্তিময় রাখে। এই শান্তির জন্য, নৈঃশব্দ্যের জন্য, তিনি নিবেদিতপ্রাণ। এমনকী যৌবনে বিয়ে করার কথাও মনে হয়নি তার।
এই উঁচু প্রাচীরময় স্থানেই তার থাকা। তার জীবন। বহুজনের শেষ শান্তি দেখতে দেখতে, বহু পরিবারের শোক-সন্তাপের সঙ্গী হতে হতে আজ তার আত্মীয় শহরময়। এমন কোনও পার্শি পরিবার নেই যারা জনকে চেনে না। এমন কোনও পার্শি পরিবার নেই এ শহরে, যার কোনওনাকোনও সদস্যের শেষযাত্রায় জন সঙ্গী থাকেননি।
মাঝে মাঝে যখন পথে বেরোন, দেখতে পান, কত দ্রুত বদলে যাচ্ছে এই শহর। জনবসতি হয়েছে আরও ঘন। যানবাহন হয়েছে আরও থিকথিকে। শব্দ হয়েছে অনেক বেশি বিবাদমান। বাতাসে ধোয়াধুলোময়লার পুরু স্তর। গাছের পাতার সবুজ রং টাঁকা পড়ে যায়। আকাশ থাকে নীল।
এখান থেকে বিবর্ণ আকাশ তিনি দেখতে পান। কিন্তু এই বিশাল ক্ষেত্রে, উঁচু প্রাচীর ঘেরা, বৃক্ষমণ্ডিত এই পরিবেশে, শেষযাত্রার এই শান্তিভূমিতে ধোঁয়া-ধুলো-আবর্জনা নেই। শব্দ নেই। বিবদমান শব্দ নেই। ধ্বনি নেই এমন যাতে মস্তিষ্ক ভেদ করে তির চলে যায়।
শুভদীপ উঠে বসে এবার। তার কিছুটা সুস্থ লাগছে। বিস্ময়ে অভিভূত সে এখন। এত ঘুরেছে সে এ শহরে, এত গিয়েছে এই রাস্তায়, কিন্তু Tower of silence-এর অস্তিত্ব জানে না। সে পুরো জায়গাটি ঘুরে দেখার ইচ্ছে প্রকাশ করে। জন সানন্দে রাজি থাকেন। কিন্তু জানিয়ে দেন, সে যেন Tower of silence-এ যাবার ইচ্ছে প্রকাশ না করে। জন এবং মৃতের আত্মীয় ছাড়া আর কারও সেখানে প্রবেশাধিকার নেই।
সে রাজি হয়। বিছানা থেকে নামে। আর তার নামার সময় জন তার কাধ ধরে থাকেন। তার মাথা ঘুরে যায়। মাথায় এমনকী যন্ত্রণাও অনুভব করে সে। কপালেও। কিন্তু প্রকাশ করে না। শরীরের কোনও যন্ত্রণা, কোনও বৈকল্যই প্রকাশ করে না সে। ঘরজোড়া রোগ ও ওষুধগন্ধে নিজেকে জড়াতে চায় না।
সে জনকে ধন্যবাদ দেয়। চশমা পরে। জল চায় খাবার। জন কারওকে জল আনতে আদেশ করলে সে জুতো পরতে থাকে। সে বিস্মিত হয়। কে তার জুতো খুলে দিল। পায়ে হাত দেওয়া সম্পর্কে আজকালের এ সংস্কার তাকে বিচলিত করে। জনের দিকে তাকিয়ে তার গতকালের সেই মুসলমান ভদ্রলোককে মনে পড়ে। কেন মনে পড়ে সে বুঝতে পারে না। জনের সঙ্গে তার চেহারার মিল ছিল না কোনও। তবু এই সমস্ত কিছুর মধ্যে একটি সংযোগ আছে বলে মনে হয় তার।
গতকাল সে এক কবরখানায় ঢুকেছিল। আজ সে চলে এসেছে অন্য এক মৃত্যু-আয়োজনে। যেন কোন অদৃশ্য নিয়ন্ত্রক তাকে এভাবেই চালিত করছে এখন। সে ঈশ্বর মানেনি কখনও। নিজস্ব যুক্তিবোধ দ্বারা সমস্ত কার্যকারণের পেছনেই এতকাল মানুষের ইচ্ছা ও প্রবৃত্তিকে দেখে এসেছে সে। প্রকৃতির ভূমিকা ও ক্রিয়াকলাপ আবিষ্কার করেছে। ঈশ্বর মানার জন্য পুজো-পাঠের জন্য মাকে, শুচুকে এবং চাকলীকেও তিরস্কার করেছে সে। অথচ এখন তার মনে হচ্ছে সে সারাক্ষণ আপন ইচ্ছার বশে নেই।
অন্য কেউ, অন্য কিছু তাকে চালিত করছে। এই বোধেরই নাম ঈশ্বর কিনা সে জানে না। এমনকী সে জানে না মৃত্যুর জন্য আকাঙিক্ষত তার চিত্ত দুর্বলতার বশবর্তী হল কি না।
জনের সঙ্গে বেরিয়ে আসে সে। তার রোমাঞ্চ হয় কেমন। কেমন গাছমছমে ভাব। সে যেন ক্রমে দেখে নিচ্ছে মৃত্যুর কাছে তার পৌঁছনোর আগেই—দেহের পরিণতিগুলি। মানুষের অন্তিম লগ্নের প্রভূত, বিপুল ও বিচিত্র আয়োজন। সে চাক্ষুষ করে নিচ্ছে। অনুভব করে নিচ্ছে। মৃত্যু মানে এ দেহেরই মৃত্যু। নশ্বর দেহ ছেড়ে বেরিয়ে যচ্ছে অবিনশ্বর আত্মা আর জড়পদার্থে তৈরি শরীর মিলিয়ে যাচ্ছে জলে, মাটিতে, হাওয়ায়।
জনের সঙ্গে পাশাপাশি হেঁটে যায় সে। এতক্ষণে জনকে সে সম্পূর্ণ দেখতে পায়। খর্বকায় কিন্তু বিপুলপ্রস্থ জন থপ থপ হেঁটে যাচ্ছেন। কিছুটা হেলেদুলে। চোখে মুখে লেগে আছে প্রশান্ত আবেশ। কথা বলছেন। এ শহরে পাৰ্শি পরিবার হাতে গোনা। তাই বন্ধনও প্রগাঢ়।
শুভদীপ কিছু শোনে, কিছু শোনে না। দেখতে থাকে এই বিশাল বাগান। ঋজু বৃক্ষে ভরা। অথচ পাতা পড়ে জঞ্জাল হয়ে নেই। সবুজ ঘাসের গায়ে যত্নের ছোপ। পাখির গান ও কলরব শোনা যাচ্ছে নিরন্তর। গতকালও কবরস্থানে এই কলরব সে শুনেছিল। কিন্তু বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নামছিল বলে সেই রবে গন্তি মেশা ছিল। এখন এই ডাক অনেক বেশি সতেজ, সমুজ্জ্বল।
নানারকম ফুলের গাছেও ঝলমলে এই বাগান। সে ফুল দেখার জন্য দাঁড়ায়। জন কর্মরত মালি ইত্যাদি কর্মীর সঙ্গে কথা বলেন। তার দৃষ্টি ঝাপসা লাগে। চশমা খোলে সে। ধুলো ও হাতের ছাপে ময়লা হয়ে আছে পরকাদ্বয়। সে মুছে নেয় রুমালে। আর মুছতে মুছতে উঁটি দুখামি নজর করে। ভাঙেনি দেখে আশ্বস্ত হয়।
এই চশমা। চন্দ্রাবলীর উপহার দেওয়া চশমা। ঘুরতে ঘুরতে, জনের কথা শুনতে শুনতে চন্দ্রাবলীর মধ্যে ডুবে যায় সে আজও। যেমন ডুবেছে। প্রত্যেক দিন। গত কাল। গত পরশু। গত তরশু[ ডুবে যাচ্ছে সেই কবে থেকে। ডাটিভাঙা চশমা পরত সে। চারীর ভাল লাগেনি। অর্থের বিনিময়ে আতিথ্য পদ্ধতিতে জীবনযাপন করত যখন চন্দ্রাবলী, রবিদাকে ছেড়ে এসে, তখন শুধুমাত্র ইস্কুলের ওপর নির্ভর না করে কয়েকটি বাড়ি গিয়ে গান শেখাতে শুরু করে সে। বস্তুত অর্থের প্রয়োজন ছিল তার। দুপুরেও কিছু করার ছিল না। তার ইস্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের অভিভাবকদের সাহায্যে কয়েকজন গৃহিণীকে গান শেখাবার কাজ পেয়ে যায় সে। এই বাড়তি অর্ধের কিছু সে ব্যয় করত শুভদীপেরই জন্য। কিছু নাটক, চলচ্চিত্র বা উদ্যানের প্রবেশমুল্যে। আর মাঝে-মধ্যে বেরিয়ে পড়ত তারা। বিজ্ঞাপন সংগ্রহের কাজে শহরের বাইরে যাচ্ছে এমনই বলত শুভদীপ বাড়িতে। আর চন্দ্রাবলীর কোনও বাধা ছিল না। আতিথ্য নেওয়া জীবনে সে ছিল সর্বার্থেই মুক্ত। এইসব দিনগুলিতে সে কখনও শুভদীপাকে অর্থব্যয় করতে দেয়নি।
