পরে সে শুনেছিল পাঁচ মিনিট তার জ্ঞান থাকেনি। বা গোটা সময়টা ধরলে দশ মিনিটই হবে।
বিশাল ভারী ধাতব দরজা খোলার সময় এক চিৎকৃত সাবধানবাণী শুনতে পায়নি সে। এবং ধাক্কা খেয়ে অনিবার পড়ে গিয়েছে। তখন লোকবাহিত হয়ে সে সেই দরজারই ভিতরে প্রবেশ করে এবং দরজা আবার বন্ধ হয়ে যায়।
একটি ছোট দপ্তরখানায় সে শুয়ে ছিল যখন তার জ্ঞান ফেরে। নিচু ঘরটির কাঠের জানালা গলে আলো পড়ছিল তার মুখে।
দপ্তরখানা না বলে একে কারও বাসস্থানও অনুমান করা যায়। কারণ সে শুয়ে আছে একটি রীতিমতো বিছানায়। দেওয়ালের হুকে ঝোলানো দেখতে পাচ্ছে শার্ট-প্যান্ট। আবার দুটি আলমারি তার পায়ের দিকে। ফাইলে ঠাসা। সে অনুমান করে, একটি চেয়ার টেবিলও থাকবে নিশ্চয়ই। একটি টেবিল-আলো।
তাকে ঘিরে আছে কয়েকজন। কিন্তু প্রায় মুখের ওপর ঝুঁকে আছে একটি মুখ। নিখুঁত দাড়িগোঁফ কামানো মেদবহুল মধ্যবয়সী মুখ। ভাঙাভাঙা বাংলায় সেই মুখ জানতে চায় ব্যথা করছে কি না। সে তখন কপালে ব্যথা অনুভব করে। মাথা তুলতেই মাথার মধ্যে ব্যথার ঝনঝন। সে মাথা নামিয়ে নেয় বালিশে আর শুনতে পায় মানুষগুলি হাত-মুখ নেড়ে সমবেতভাবে তাকে উঠতে বারণ করছে। সে তখন চশমার খোঁজ করে। ব্যাগ কোথায় জানতে চায়। একজন তাড়াতাড়ি চশমা এনে তার বালিশের পাশে রাখে। আরেকজন ব্যাগ তুলে তাকে দেখায় এবং নিশ্চিন্ত করে। বাইরে থেকে ভেসে আসে কুকুরের হিংস্র গর্জন।
একটি লোক বরফকুচি ভর্তি পাত্র এনে সেই মধ্যবয়সীর হাতে দেয়। তিনি একটি রুমালে কুচিগুলি বেঁধে নিয়ে চেপে ধরেন তার ব্যথাদীর্ণ কপালে। সঙ্গে সঙ্গে সে জ্বালা টের পায়। আঘাতে থেঁতলে গেছে কপাল। সে ভ্রু কুঁচকোয়। মধ্যবয়সী ইংরিজিতে বলেন, বরফকুচিতে সে সেরে উঠবে তাড়াতাড়ি। ইতিমধ্যেই হয়তো আরাম পাচ্ছে সে।
সে ক্লান্ত বোধ করে। একবার চোখ বন্ধ করে। চুপ করে থাকে। খোলে আবার। দেখে মধ্যবয়সীর ব্যগ্র উদগ্রীব মুখ। সেই সুৰ দুঃখপ্রকাশ করে। অনিচ্ছাকৃত আঘাত দেবার কারণে তার যেন অনুশোচনার অবধি নেই। সে মৃদু হাসে। মানুষটি নাম বলেন। জন। কথা বলতে বলতেই বরফের শুশ্রুষা চালিয়ে যান তিনি। তার কপাল যেয়ে বরফগলা জল গড়িয়ে চুলে লেগে যায়। কিছু বা বালিশ ভিজিয়ে ফেলে। এবার শুভদীপের নাম জানতে চান তিনি। বাড়ি কোথায় জানতে চান। সে নাম বলে। বাড়ি কোথায় বলে না। বরং উঠে বসতে চায়। জন তাকে শুইয়ে দেয় আবার বলেন, সে আহত। তার চিকিৎসা ও বিশ্রাম দরকার। তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাবার প্রস্তাব আসে। অথবা ট্যাক্সিতে চাপিয়ে বাড়িতে পৌঁছে দেবার প্রস্তাব। সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে। মাথায় সাংঘাতিক কিছু যন্ত্রণা হচ্ছে এমন নয়। আজ তার অনেক কাজ। অনেকগুলি বিজ্ঞাপন তাকে সংগ্রহ করতে হবে।
জন, চারপাশে ভিড় করে থাকা লোকজনকে কাজে যোগ দিতে অনুরোধ করেন। তারা চলে যায়। শুভদীপ জানতে চায় সে কোথায় আছে। মধুর হাসিতে মুখ ভরে যায় জনের। সে অত্যন্ত পুণ্যবান বলেই এখানে আসতে পেরেছে বলেন তিনি। যে-কোনও ব্যক্তি এখানে প্রবেশানুমতি পায় না। মুখে রহস্য মেখে প্রশ্ন করেন তিনি, শুভদীপ নৈঃশব্দ্যের স্তম্ভ কী তা জানে কি না। নৈঃশব্দ্যের স্তম্ভ। Tower of silence নৈঃশব্দ্যের স্তম্ভ। Tower of silence। শুভদীপ শোনেনি কখনও। বরফকুচির শুশ্রুষা দিতে দিতে জন শোনান তখন। Tower of silenceনৈঃশব্দ্যের স্তম্ভ। পাশি সম্প্রদায়ের পরমগতির স্থল। মৃত্যুর পর চরম প্রার্থিত শান্তি।
তার আবছা মনে পড়ে। পার্শিরা মরদেহটি পাখির আহারের জন্য দান করে। তার সঙ্গে নৈঃশব্দের স্তম্ভ কীভাবে সম্পর্কিত।
জন তার প্রশ্ন উপলব্ধি করেন। ব্যাখ্যা করেন তিনি। Tower of silence। একটি উঁচু স্তম্ভ—যেখানে কোনও মৃত পার্শির মরদেহ রাখা হয় শেষকৃত্যের জন্য। সে চোখ বিস্ফারিত করে। কল্পনা করার চেষ্টা করে দৃশ্যটি। এবং শিউরোয়। কিন্তু মানুষটির মুখে তৃপ্তির বিচ্ছুরণ দেশে সংযত হয় সে। পাখিরা ঠুকরে ঠুকরে মৃতদেহ খাচ্ছে—এ দৃশ্য দৃষ্টিসুখকর নয়। কিন্তু মানুষের শরীর প্রিয়জন, বাবা-মা-ভাই-বন্ধু-সন্তানের শরীর পুড়ে যাচ্ছে। মাথার খুলি ফেটে যাচ্ছে, রক্ত-মাংস পুড়ে গুটিয়ে দলা পাকিয়ে উঠছে, শব্দ উঠছে ফট-ফট-এই বা কী নয়নলোভন৷ সে শান্ত থাকে অতএব। শুয়ে শুয়ে জনের কথা শোনে। তার মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে তার মনে হয়-জন মধ্যবয়সী নয়, যেন বৃদ্ধ, প্রবৃদ্ধ। গভীর বয়স তার ত্বকের গভীরে আছে।
Tower of silence-এর দেখাশুনো করেন জন। রক্ষণাবেক্ষণ করেন। করছেন সেই আঠারো বছর বয়স থেকে পঁয়ত্রিশ বছর। এখানেই তার যৌবন এসেছে। চলে গেছে। এখানেই তার চুলে লেগেছে পাক। এখানেই তিনি থেকেছেন দিনের পর দিন, রাতের পর রাত এবং এই উচু প্রাচীর ঘেরা জায়গাটির বাইরে যে জগৎ তার সম্পর্কে হারিয়েছেন সব টান। সব তৃষ্ণা। বাইরে গেলে এখন তার প্রাণ ছটফট করে। দম বন্ধ হয়ে আসে। কতক্ষণে ফিরে আসবেন এই শান্তিস্থলে—এমনই মনে হয়।
এখানকার বহু গাছ তাঁর হাতে লাগানো এবং তারই তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠা। এখানকার সব ফুল-পাখি-প্রজাপতি কীট ও পতঙ্গদের তিনি চেনেন আপনজনের মতো। দু’খানি কুকুর আছে, তাদের স্নান করানো ও খাওয়ানো—সারাদিনে তার এটুকুই হাতে-কলমে কাজ। বাকিটা তত্ত্বাবধান।
