আজ সকালে শুধুই তার চা এনেছিল।
মূল দরজা পেরিয়ে তাদের যে একফালি বারান্দা, যেখানে সুবল থাকে আর তাদের জুততা রাখা হয়, সেই সঙ্গে ছেঁড়া কাপড়ের বাক্স, গ্যাসের সিলিন্ডার, ঝাড়ু ইত্যাদি–তারই একপাশে মোড়া পেতে সে খবরের কাগজ পড়ছিল।
এই কাগজ রাখা নিয়ে মা আপত্তি তুলেছে অনেকবার। সে শোনেনি। টিভিতেই তো সারা দুনিয়ার খবর পাওয়া যায়। তাহলে আর পয়সা খরচ করে খবরের কাগজ রাখা কেন! এমনই বক্তব্য মার। সে শুনেছে বহুবার। কিন্তু তর্ক করেনি। সেই কোন ছোটবেলায় খেলার খবরের টানে কাগজ পড়া অভ্যাস হয়েছিল। পুরু মাখন লাগানো পাঁউরুটি দিত মা। সে অন্যমনস্কভাবে পাঁউরুটিতে কামড় দিয়ে মুখভর্তি মাখনের স্বাদ নিতে নিতে পড়ত। ধীরে ধীরে মাখনের ঘনত্ব কমতে লাগল বাড়িতে। একদিন শুধু পাঁউরুটি হয়ে গেল। তারপর তা-ও আর রইল না। রুটি এল। সে এখন কাজে বেরোয় বলে সকালেই ভাত খেয়ে নেয়। অন্যদের সকালেরাতে রুটি। দুপুরে ভাত। মাত্র একপদের রান্না। সে রান্না হতে পারে এমনকী শুধুই আলুসেদ্ধ।
এত কিছুই ছেড়েছে সে। এত কিছুই অভ্যাস করেছে। কিন্তু কাগজ পড়া ছাড়তে পারেনি।
তার সেই প্রিয় অভ্যাস সে যাপন করছিল সকালে। তখন শুচু তার চা নিয়ে আসে। আর একটি মোড়া টেনে বসে পড়ে পাশে। কিছু কথা আছে তার জানায়। সে সহজেই বুঝে ফেলে শুচু দেবনন্দন বিষয়ে বলবে। এবং শুচু তাই বলে। কোনও ভণিতায় না গিয়ে তাকে সরাসরি অনুরোধ করে, সে যেন বিয়েতে আপত্তি না জানায়। সে চুপ করে আছে দেখে ব্যাখ্যা করে যায়। অবিকল মায়ের সুরে, অবলীলায় বলে তার বিয়ে হলে সংসার থেকে একজনের বোঝা তো নেমে যায়।
এ কথা শুনতে প্রস্তুত ছিল না সে। বরং ভেবেছিল শুচু পবিত্র প্রেমের দোহাই দেবে। সে জানে না কেন, তার কান ঝাঝা করে। চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়া মা বলেছিল একটা পেট তো কমে যায়। এখন স্নাতক শুচু বলছে একটি ভার কমে। অর্থ এক। অভিব্যক্তি আলাদা।
সে চুপ করে থাকে। খবরের কাগজ থেকে মুখও তুলতে পারে না। ভাবে, কেন এরকম বলছে শুচু। সে কি মায়ের বলা কথাগুলি শুনেছিল কাল? নাকি মা সরাসরি শুচুকেও বলেছে এমন? মা কি এতখানি নিষ্ঠুর হতে পারে? হতে পারে এতখানি নির্মম, স্বার্থপর? সে সরাসরি প্রশ্ন করে বসে, মা কিছু বলেছে কিনা। শুচু জিভ কাটে আর তার নীল জিভ দৃশ্যমান হয়। মা এমন বলতেই পারে না। সে নিশ্চয়তা দেয়। এবং বলতে থাকে আরও। সংসারের পরিস্থিতি সে কি উপলব্ধি করছে না? সে তো সহায়তা দিতে পারছে না এতটুকু। শুধু, কোন ছোটবেলা থেকে ব্যয়সঙ্কুল হয়ে বসে আছে।
সে জানে বিশ্বদীপ মিঠুকে তাড়াতাড়ি বিয়ে করতে চায়। সে, অতএব, উপায় আছে যখন, আর বোঝা হয়ে থাকতে চায় না।
শুভদীপ ভেবেছিল, একবার জিজ্ঞেস করে, যার কাছে যাবে শুচু, বিয়ে করে, সে যদি বোঝা ভাবে স্বয়ং? কিন্তু সামলে রাখে নিজেকে। দেবনন্দনের সততা ও ভালত্ব সম্পর্কে তার দ্বিধা নেই কোনও। অতএব সে দেবনন্দনকে অপমান করতে চায় না। কিন্তু নতুন করে সে উপলব্ধি করে পরিচিত জগৎ-সংসারের অদ্ভুত নিয়ম। জন্ম থেকে আজ অবধি এই পরিবারে প্রতিপালিত শুচু নিজেকে এখানে বোঝা মনে করছে। যেন এ পরিবারে চুক্তি ছিল তার। মেয়াদ ফুরিয়েছে। এমনকী জন্মদাত্রী মাও মনে করছে এমন।
নতুন কোনও পরিবারে গিয়ে, আবার নতুন করে অধিকার প্রতিষ্ঠা করবে সে। সেই প্রতিষ্ঠায় কোনও গ্লানি নেই, বরং সম্মান আছে। কারণ হাজার বছর আগে মানুষ এমনই একটি রীতি প্রচলিত করেছিল।
শুচু চলে গেলে মিঠু আসবে। এক মেয়ে যাবে। অন্য মেয়ে আসবে। শুধু পুরুষেরা স্থির। তারা বিনিময় হয় না কখনও। তাদের পরিবার পরিবর্তন নিন্দিত। ঘৃণাহ। পুরুষেরা সূর্যেরই মধ্যে থেকে যাবে অবিচল আর মেয়েরা তাকে ঘিরে আবর্তিত হবে।
শুচু তখন উঠে গিয়েছিল পাখির খাঁচার কাছে। খাঁচায় হাত ঢুকিয়ে সুবলের মাথায় হাত বুলোচ্ছিল সে। গাইছিল। সরু কণ্ঠে গাইছিল। শুভদীপের অপার্থিব লাগছিল সমস্ত পরিস্থিতি। অসহ্য লাগছিল। এই গান ও গেয়েছে আগেও। কিন্তু তার এরকম লাগেনি কখনও। খাচার ধাতৃগুলিতে ধাক্কা খেয়ে ফিরে ফিরে আসছিল শব্দগুলি।
ধাঁধার থেকেও জটিল তুমি
খিদের থেকেও স্পষ্ট
কাজের মধ্যে অকাজ খালি
মনের মধ্যে কষ্ট
স্বপ্ন হয়ে যখন তখন আঁকড়ে আমায় ধরো
তাই তো বলি আমায় বরং ঘেন্না করো
ঘেন্না করো
তার অসার লাগে এইসব নিয়ম। অর্থহীন অসহ্য লাগে। পরিবারে প্রত্যেকেরই জন্মগত অধিকার নয় কেন! এমনকী মানসিকতাও নিয়ন্ত্রণ করছে এই সব নিয়ম! সমস্ত কিছুর মধ্যেই লিঙ্গভিত্তিক বিভাজন। ইস্কুল, কলেজ, চিকিৎসালয়, যানবাহন, পোশাক, চাকরি, পথ ও সময়, বিধান ও রীতি-নীতি—সমস্ত, সমস্তই। পুরুষ ও নারীর আলাদা আলাদা শৌচালয়ের মতো। কিংবা এই পৃথিবী, এই গোটা পৃথিবী, এবং এই সমাজ—যার প্রত্যেকটি রীতিনীতি নিয়ন্ত্রণ করছে মানুষের মানসিক সংগঠন-আসলে এক শৌচাগার মাত্র। এক বৃহৎ, বিপুল বিস্তৃত শৌচাগার।
০৭. গভীর ভাবনা তাকে পথ চলা
গভীর ভাবনা তাকে পথ চলা বিষয়ে অন্যমনস্ক করেছিল। সে দেখতে পায়নি একটি উঁচু ও বিশাল দরজা খুলে যাচ্ছে এবং তার ধাক্কা লাগতে যাচ্ছে। অতএব সে এক ভারী ধাতব আঘাতে ছিটকে পড়ে মাটিতে। চশমা খুলে হারিয়ে যায়। ব্যাগ আছড়ে পড়ে। কপালে তীব্র মন্ত্রণা অনুভব করে সে, আর তার দৃষ্টিপাত অন্ধকার সংসর্গে লিপ্ত হয়।
