চলিতে চলিতে মিত্তির বিকৃত মুখে বার বার জোরে জোরে নিঃশ্বাস টানিতে টানিতে বলিল, উঃ, মদে আজ ব্যাটারা বান ডাকিয়ে দেবে। পচুঁইয়ের গন্ধ উঠছে দেখুন দেখি।
বিমলবাবু বলিলেন, প্রত্যেক বাড়িতে মদ তৈরি হচ্ছে আজ। পরব কিনা। পরবে ওরা কখনও দোকানের মদ কিনে খায় না; দোকানের মদ হল অপবিত্র। আর তা ছাড়া পয়সাও লাগবে বেশি। মদের কথা বলিতে বলিতেই বিমলবাবুর যেন একটা জরুরী কথা মনে পড়িয়া গেল। কথার স্বরে ও ভঙ্গিমায় গুরুত্ব আরোপ করিয়া তিনি বলিলেন, ভাল কথা, এখানে পচুঁইয়ের দোকান সবচেয়ে কাছে কোথায় বলুন তো?
মিত্তির বিস্ময় বোধ করিয়াও না হাসিয়া পারিল না। হাসিয়া বলিল, হঠাৎ পচুঁইয়ের দোকানের খোঁজ?–বলিয়াই হঠাৎ মিত্তির বিমলবাবুর মতলবটা অনুমান করিয়া লইল, বলিল, বুঝেছি, মেয়া চাই। মাছধরার বাতিক কি কলকাতার বাবুদেরই সবারই মশায়? তা আমার বাবুর পুকুরে খুব বড় বড় মাছ, এক-একটা আঠারো সের, বিশ সের, বাইশ সের।
বিমলবাবু বলিলেন, না, মাছ ধরবার জন্য নয়। আমার কুলী আসবে এখানে। পগমিল, বক্স মোল্ডিঙের লোক তো এখানে মিলবে না। অন্তত ষাট-সত্তরজন কুলী আসবে। পচুঁইয়ের দোকান কাছে না থাকলে তো অসুবিধা হবে।
বার বার ঘাড় নাড়িয়া ব্যাপারটা উপলব্ধি করিয়া মিত্তির বলিল, অ্যাই দেখুন, এই নইলে কি পাকা ব্যবসাদার হওয়া যায়? বটে, মশায় বটে! দৃষ্টি রাখতে হবে চারিদিকে। তা, পচুঁইয়ের দোকান একটু দূরেই হবে। ক্রোশ দুয়ের কম নয়।
বিমলবাবু পকেট হইতে নোটবই বাহির করিয়া সেইখানে দাঁড়াইয়াই কথাটি নোট করিয়া লইলেন এবং তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে উত্তর দিলেন, একটা দোকান স্যাংশন করিয়ে নেব এইখানেই। কল হলে তো চাই-ই। তা, আগে থেকেই ব্যবস্থা করে নেব।
পথের ধারেই একটি ঘনপল্লব কৃষ্ণচূড়ার গাছের তলায় কতকগুলি সাঁওতালদের মেয়ে ভিড় করিয়া দাঁড়াইয়া ছিল। গাছটির গোড়ায় সুন্দর একটা মাটির বেদী ও বেদীর চারিপাশে খানিকটা জায়গা গোবর ও মাটি দিয়া অপূর্ব পরিচ্ছন্নতার সহিত নিকানো; বেদীটির চারিদিক খড়িমাটির আলপনা দিয়া চিত্রিত করিয়া তোলা। মেয়েগুলো তখনও সমুখের নিকানো জায়গাটির উপর খড়িমাটির গোলা দিয়ে আলপনার ছবি আঁকিতেছিল পাখী ও পশুর ছবি, তাহার পাশে পাশে খেজুরগাছের ডালপালা, ধানগাছের ছবি; একটি মেয়ে আলপনার সাদা রেখার মধ্যে মধ্যে সিঁদুরের লাল টোপা দিতেছিল। দিতে দিতে মৃদুস্বরে সকলে মিলিয়া পর্বের কল্যাণী-গান গাহিতেছিল
ঠাকুরাহি সিরিজিলা ইনা পিরথিমা হো,
ঠাকুরাহি সিরিজিলা গাইয়া জো ইয়ারে,
পুরুবাহি ডাহারালি গাইয়া জো ইয়ারে,
পুরুবাহি ডাহারালি-গাইয়া জো
বিমলবাবু মৃদু হাসিয়া দাঁড়াইয়াছিলেন; তাহাদের আলোচনা বন্ধ হইয়া গেল। মেয়েদের দলও সবিস্ময়ে তাহাদের দিকে চাহিয়া রহিল, তাহাদেরও গান মৃদু হইতে মৃদুতর হইয়া আসিয়া ছিল। বেশির ভাগ মেয়েরাই গান বন্ধ করিয়া দিয়াছিল, গাহিতেছিল কেবল দুই-একজন প্রবীণা। মাঙ্গলিক গান তাহারা বন্ধ করিবে কি করিয়া?
মিত্তির বলিল, চলুন, চলুন।
মেয়েদের দল হইতে সেই দীর্ঘাঙ্গী মেয়েটি, কমল মাঝির নাতনী সারী, আগাইয়া আসিয়া বলিল, একটি ধার দিয়ে যা গো বাবুরা। ই-ঠিনে আমাদের পুজো হবে।
কতকগুলো ছেলে মাথায় ফুলওয়ালা। গোটাকয়েক লালরঙের মোরগের পায়ে দড়ি বাঁধিয়া ধরিয়া বসিয়া আছে। মহা উৎসাহ তাহাদের; আপনাদের ভাষায় অতিমাত্রায় মুখর পাখীর মত একসঙ্গে পাখীর মত কলরব করিয়া বকিয়া চলিয়াছে। মিত্তির বলিল, ওরে বাপ রে। এতগুলো মুরগী আজ তোরা খাবি নাকি?
সারী বলিল, কেনে, উ কথা বুলছিস কেনে? তুর লোভ হচ্ছে নাকি?
মিত্তির বৈষ্ণব মানুষ, সে ঘৃণায় থুথু ফেলিয়া বলিয়া উঠিল, রাম রাম রাম। অ্যাঁ, ই হারামজাদা মেয়ে বলে কি গো?
সারী বলিল, তবে তু খাবার কথা বুলছিস কেনে? উ আমরা দেবতাকে দিব। কাটব এই দেবতা-থানে। তারপর কুটিকুটি করে একটি মাটিতে পুঁতব, আর সবগুলা বাঁধব। আগে থেকে খাবার কথা তু বুলছিস কেনে?
মিত্তির মুখ বিকৃত করিয়া বলিল, চলুন মশায়, চলুন, আমার গা ঘিনঘিন করছে।
বিমলবাবু দেখিতেছিলেন সারীকে। চলিবার জন্য পা বাড়াইয়া তিনি বলিলেন, বাঃ, মেয়েটির দেহখানি চমৎকার, tall, graceful,–youth personified.
সারী ভ্রূ-কুঞ্চিত করিয়া বলিল, কি বুলছিস তু উ-সব?
মৃদু হাসিয়া বিমলবাবু অগ্রসর হইয়া গেলেন, কথার কোন উত্তর দিলেন না। নদীর পারঘাটের পাশেই অপেক্ষাকৃত বড় বড় সাঁওতাল ছেলেগুলি গরু-মহিষগুলিকে পরিপাটি করিয়া স্নান করাইতেছিল কয়টা ছেলে আজও লম্বা লাঠি লইয়া জলের ধারের গর্তগুলিতে খোঁচা দিয়া শিকারের সন্ধান করিয়া ফিরিতেছে।
***
মিত্তির ও বিমলবাবু চলিয়া যাইতেই শ্রীবাস গম্ভীর চিন্তান্বিত মুখে দোকানের সামনে ঘুরিতে আরম্ভ করিল। এখানে চিনির কল হইবে। চরখানা বাড়িঘর লোকজনে ভরিয়া যাইবে। হ্যাঁ, দোকানটা বড় করিতেই হইবে। বর্ষার শেষেই একখানা লম্বা তিনকুঠারী ঘর আরম্ভ করিয়া দেওয়া চাইই। ঘরের বনিয়াদ ও মেঝেটা পাকা করিলেই ভাল হয়। যে ইঁদুরের উপদ্রব! ওই বাবুর ইঁট তো অনেক হইবে, পনেরো লাখ। তাহা হইতে ভাঙা চোরা যাহা পড়িয়া থাকিবে, তাহাতেই তো একটা প্রকাণ্ড দালান তৈয়ারি হইতে পারিবে। আর লোকজনের সঙ্গে একটু যাহাকে বলে সুখ, সেই সুখ থাকিলে- সঙ্গে সঙ্গে শ্রীবাসের ঠোঁটের ডগায় অতি মৃদু। একটি হাসির রেখা ফুটিয়া উঠিল। পরমুহর্তেই আবার সে গম্ভীর হইয়া পড়িল। আঃ, আরও খানিকটা জমি যদি সে দখল করিয়া রাখিত! জমির দাম হু-হু করিয়া বাড়িয়া যাইবে। দুই শ আড়াই শ টাকা বিঘে তো কথাই নাই!
