মিত্তির হাসিয়া বলিল, ইনি হলেন কলকাতার লোক, এসেছেন চর দেখতে। এখানে একটা চিনির কল করবেন। তাই এসেছিলাম ওঁকে সঙ্গে নিয়ে। তারপর তোমার এখানে এত ভিড় কিসের?
চিনির কল করবেন? বিস্ময়ে শ্রীবাসের চোখ দুইটা বিস্ফারিত হইয়া উঠিল।
চিনির কলও হবে, সঙ্গে সঙ্গে আখের চাষও হবে। কিন্তু আপনার নামটা কি? দোকানটি আপনার? বিমলবাবু তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে শ্রীবাসের মুখের দিকে চাহিয়া প্রশ্ন করিলেন।
শ্রীবাসের মুখ কঠিন অসন্তোষে শুষ্ক হইয়া উঠিল, সে বলিল, কল কি এখানে চলবে আপনার? এত আখ পাবেন কোথা?
বিমলবাবু হাসিয়া বলিলেন, কল হলেই চারিদিকে আখের চাষ বেড়ে উঠবে। দোকান আপনার খুব ভাল চলবে দেখবেন। তার ওপর জমিও বোধ হয় আছে আপনার এখানে, তাতেও আরম্ভ করুন আখের চাষ। কল আপনাদের অনিষ্ট করবে না, ভালই করবে। ভাল কথা, এখানে এবারেই আমার পনেরো লাখ ইঁট হবে। আপনার তো দোকান এই চরের ওপরেই? আমার অনেক কুলী আসবে শহর থেকে ইঁট তৈরী করবার জন্যে, দু মাসের মধ্যেই এসে পড়বে, দোকান আপনি বাড়িয়ে ফেলুন।
শ্রীবাসের মুখ ধীরে ধীরে কোমল ও উজ্জ্বল হইয়া উঠিল, সে এবার বলিল, তা আপনাদের মত ধনী যেখানে আসবে, সেখানে তো দশের অবস্থা ভালই হবে। দোকান আমি হুকুম হলেই বাড়াব। আর দেখতে শুনতে যা-হয় আমিই সব দেখে-শুনে দেব। এই দেখুন এইসব সাঁওতাল বেবাক আমার তাঁবে। আমার কাছেই ধান খায় বছর বছর। এক নেয়, এক দেয়। ওদের সঙ্গে খুব সুখ আমার। লোকজন যা দরকার হবে, সব আমি ঠিক করে দেব।
মিত্তির বলিল, আজকে এত ভিড় কিসের হে?
আজ্ঞে আজ ওদের ‘রোয়া’ পরব। মানে, চাষের জল তো লেগে গেল, তা ধান রুইবার আগে ওরা পুজো-টুজো দেবে। তারপর চাষে লাগবে। তাই সব জিনিসপত্তর নিচ্ছে, আর খোরাকির ধানও নিচ্ছে।
বিমলবাবু বলিলেন, তাই নাকি, আজ ওদের পর্ব? তা হলে বড় ভাল দিনে এসে পড়েছি। বাঃ! কই ওদের সর্দার কই?
সাঁওতালদের সমস্ত দলটি নীরবে বসিয়া এক বিচিত্র দৃষ্টিতে বিমলবাবুকে দেখিতেছিল, বিস্ময়, ভয়, শ্রদ্ধা, সঙ্গে সঙ্গে আরও অনেক কিছু সে দৃষ্টির মধ্যে প্রকাশ পাইতেছিল। বিমলবাবুর আহ্বানেও কমল সাড়া দিল না, তাহার প্রকাণ্ড দেহ লইয়া সে বিমলবাবুকে দেখিয়া খানিকটা নড়িয়া চড়িয়া বসিল মাত্র, শ্রীবাস ব্যস্ত হইয়া উঠিল, সম্ভ্রম ও সাঁওতালদের উপর আধিপত্য দুইই একসঙ্গে দেখাইয়া বিরক্তিপূর্ণ কণ্ঠস্বরে বলিল, কমল মাঝি, কানে তোর ঢুকছে না, না কি? এইদিকে আয়। কত বড়লোক ডাকছেন, দেখছিস না?
কমল এবার উঠিয়া ধীরে ধীরে আসিয়া নত হইয়া প্রণাম জানাইয়া বলিল, কি বলছিস আপুনি?
হাসিয়া বিমলবাবু পরিষ্কার সাঁওতালী ভাষায় বলিলেন, তুমি এখানকার সর্দার?
উপবিষ্ট সাঁওতালদের বিস্ময়ের সীমা রহিল না, তাদের মধ্যে গুঞ্জন উঠিল, এই, এই, বাবু আমাদের কথা বুলছে, আমাদের কথা বুলছে! উ বাবা রে!
বিমলবাবু সাঁওতালীতেই বলিলেন, হ্যাঁ, তোমাদের ভাষাতেই কথা বলছি আমি।
কমল ভাঙা ভাঙা বাংলাতেই প্রশ্ন করিল, আমাদের ভাষা আপুনি কি করে জানলিন বাবু?
আমার কাছে অনেক সাঁওতাল কাজ করে। আমার তিনটে কল আছে। কল বুঝিস তো?
হঁ হঁ। আপুনি চলে, খুব ধুঁয়া উঠে হিসহিস করে। একটো এই মোটা, এই বড় লোহার চোঙা থেকে ধুঁয়া উঠে, গুমগুম শব্দ উঠে। বয়লা চলে, রিঞ্জি চলে
হ্যাঁ। বয়লার-এঞ্জিনে কাজ হয় কলে। এখানেও একটা কল করব আমি। তোরা সব কাজ করবি। তারপর, আজ তোদের রোয়া পরব বটে, নয়?
কমলের বড় বড় হলুদ রঙের দাঁতগুলি বাহির হইয়া পড়িল, বলিল, তাই তো করছি গো। জল তো অনেক হয়ে গেল। বীজ চারা-গুলান বড় হইছে, আর বসে থেকে কি হবে?
ঠিক ঠিক। তা, চিত কোপে জম গ্রুয়া? আজ কি খাওয়া দাওয়া হবে রে, অ্যাঁ?
হাসিয়া কমল এবার নিজের ভাষাতেই বলিল, জেল, দাকা, হাণ্ডি।
ওঃ তা হলে তো আজ ভোজ রে তোদের। মাংস, ভাত, পচুই-অনেক ব্যাপার যে! কত হাণ্ডি করেছিস?
সলজ্জভাবে কমল বলিল, করলম, তা মেলাই হবে গো। মেয়েগুলো খাবে, আমরা খাব, তবে তো আমোদ হবে।
ঠিক ঠিক। তা বেশ! এই নে, আজ তোদের পরবের দিন, খাওয়া-দাওয়া করবি।– বলিয়া মানিব্যাগ বাহির করিয়া ব্যাগ হইতে একখানি নোট বাহির করিয়া কমলের হাতে দিলেন। কমল সন্তর্পণে নোটখানির দুই প্রান্ত দুই হাতের আঙুল দিয়া ধরিয়া সবিস্ময়ে নোট খানার ছাপের দিকে চাহিয়া রহিল।
বিমলবাবু একটু হাসিয়া বলিলেন, ‘গেল টাকা, দশ টাকা পাবি ওটা দিলে।
সমস্ত দলটি সবিস্ময়ে কলরব করিয়া উঠিল।
বিমলবাবু হাসিয়া মিত্তিরকে বলিলেন, চলুন তাহলে এবার। আসি এখন দোকানী মশায়। চললাম রে মাঝি।
কমল বলিল, হঁ হঁ, আসুন গা আপনি। খাটব, আপোনার কলে আমরা খাটব।
সাঁওতাল পল্লীর মাঝখান দিয়া পরিচ্ছন্ন মেটে পথটি এই কয় দিনের প্রচণ্ড বর্ষণে ধুইয়া মুছিয়া পরিষ্কার হইয়াই ছিল; তাহার উপর পর্ব উপলক্ষে মেয়েরা পথের উপর ঝাঁটা বুলাইয়েছে। প্রত্যেক বাড়ির দুয়ারে মুখে মুখে একটি করিয়া মাডুলি দিয়াছে। আপনাদের উঠানে মেয়েগুলি আজ খুব ব্যস্ত। তৎপরতার সহিত কাজ করিয়া ফিরিতেছে। ছোট ছোট মেয়েগুলি আঁচলে ভরিয়া শাক সংগ্রহ করিয়া বেড়াইতেছে। আজিকার পর্বে শাক একটা প্রধান উপকরণ।
