তর্কটা আর অগ্রসর হইতে পারিল না, নায়েব আসিয়া বাধা দিল। বলিল, অচিন্ত্যবাবু আপনি একটি থামুন মশায়, একটি বাইরের ভদ্রলোক এসেছেন, ধনী মহাজন লোক; কি ভাববেন বলুন তো?
অচিন্ত্যবাবু মুহর্তে তর্ক থামাইয়া দিয়া ভদ্রলোক সম্বন্ধে উৎসুক হইয়া উঠিলেন, এ-ঘর ছাড়িয়া ও-ঘরে ভদ্রলোকটির সম্মুখে গিয়া চাপিয়া বসিয়া বলিলেন, নমস্কার, মহাশয়ের নিবাসটি জানতে পারি কি?
প্রতি নমস্কার করিয়া ভদ্রলোক বলিলেন, আমার বাড়ি অবশ্য কলকাতায়, তবে কর্মস্থল আমার এখন এই জেলাতেই। সদর থেকেই আমি এসেছি।
এখানে-মানে, কি উদ্দেশ্যে-যদি অবশ্য
আমি এখানে একটা চিনির কল করতে চাই। শুনেছি নদীর ওপারে একটা চর উঠেছে, সেখানে আখের চাষ ভাল হতে পারে, তাই দেখতে এসেছি জায়গাটা।
অচিন্ত্যবাবু গম্ভীর হইয়া উঠিলেন। তাঁহার বেনার মূলের ব্যবসায়ের প্রতিবন্ধকতা অনুভব করিয়া নীরবে গম্ভীর মুখে বসিয়া রহিলেন। নায়েব বলিল, আপনি বসুন একটু, আমি দেখি, কর্তাবাবুর সন্ধ্যা শেষ হয়েছে কিনা।
নায়েব বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করিয়া ডাকিলেন, মা!
হেমাঙ্গিনী মাথার ঘোমটা অল্প বাড়াইয়া দিয়া ঘর হইতে বারান্দায় আসিয়া দাঁড়াইলেন, বলিলেন, কিছু বলছেন?
আজ্ঞে, কর্তাবাবুর সন্ধ্যা শেষ হয়েছে?
তা হয়ে থাকবে বৈকি। কোনও দরকার আছে?
আজ্ঞে হ্যাঁ, একটি ভদ্রলোক এসেছেন, চক্রবর্তী-বাড়ির ওই চরটা দেখবেন। তিনি একটা চিনির কল বসাবেন। আমাদের এখানে এসে উঠেছেন।
ও। আচ্ছা, আমি খবর দিচ্ছি, আপনি যান। চা জলখাবারও পাঠিয়ে দিচ্ছি।
নায়েব চলিয়া গেল। হেমাঙ্গিনী চায়ের জল বসাইয়া দিতে বলিয়া উপরে উঠিয়া গেলেন। অর্ধেকটা সিঁড়ি উঠিয়াই তিনি শুনিতে পাইলেন মৃদুস্বরে রায় আজ গান গাহিতেছেন- সকলই তোমার ইচ্ছা, ইচ্ছাময়ী তারা তুমি। তিনি একটু বিস্মিত হইয়া গেলেন, গান তো রায় বড় একটা গান না। অভ্যাসমত তিন পাত্র ‘কারণ’ পান করিলে তিনি কখনও এতটুকু অস্বাভাবিক হন না। পর্ব বা বিশেষ কারণে তিন পাত্রের অধিক পান করিলে কখনও কখনও গান গাহিয়া থাকেন। হেমাঙ্গিনী ঘরের মধ্যে প্রবেশ করিয়া দেখিলেন, সম্মুখে সুরাপূর্ণ পাত্র রাখিয়া রায় মৃদুস্বরে গান গাহিতেছেন। তিনি বেশ বুঝিলেন, সন্ধ্যা শেষ হইয়া গিয়াছে, রায় আজ নিয়মের অতিরিক্ত পান করিতেছেন। হেমাঙ্গিনী বলিলেন, এ কি? সন্ধ্যে তো হয়ে গেছে, তবে যে আবার নিয়ে বসেছ?
মত্ততার আবেশমাখা মৃদু হাসি হাসিয়া রায় হাত দিয়া পাশেই স্থান নির্দেশ করিয়া দিয়া বলিলেন, বস বস। মাকে ডাকছি আমার। আমার সদানন্দময়ী মা। তিনি আবার পূর্ণপাত্র তুলিয়া লইলেন।
হেমাঙ্গিনী বলিলেন, ওই শেষ কর। আর খেতে পাবে না।
রায় বলিলেন, আজ আনন্দের দিন। চক্রবর্তী-বাড়ি আর রায়-বাড়ির বিরোধের শেষ কাঁটাও আজ মা তুলে দিলেন। আনন্দ করব না? পাঁচ হয়েছে সাত শেষ করব হেম, সাত-পাঁচ ভাবা আজ শেষ করে দিলাম।
বলিয়া হেমাঙ্গিনীর মুখের সম্মুখে হাত নাড়িয়া আবার গান ধরিলেন, সকলই তোমার ইচ্ছা, ইচ্ছাময়ী তারা তুমি।
২১-২৫. চিনির কল ব্যবসায়ী
চিনির কল ব্যবসায়ী ভদ্রলোকটির নাম বিমলবাবু। বিমলবাবু পরদিন সকালে গিয়া চর দেখিয়া আসিলেন। রাত্রের মধ্যে বান অনেক কমিয়াছে, তবুও চরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এখনও জলমগ্ন; সেই অবস্থাতেই তিনি চরটি দেখিয়া খুশি হইয়া উঠিলেন। সকলের চেয়ে বেশী খুশি হইলেন তিনি সাঁওতালদের দেখিয়া। ছোট রায় বাড়ির নায়েব মিত্তির ছিল তাঁহার সঙ্গে, বিমলবাবু মিত্তিরকে বলিলেন, অদ্ভুত জাত মশায় এরা, যেমন স্বাস্থ্য, তেমনি কি খাটে! আমাদের দেশী লোকের মত নয়, ফাঁকি দেয় না।
মিত্তির মৃদু হাসিয়া বিমলবাবু অপেক্ষা অধিক অভিজ্ঞতার পরিচয় দিয়া বলিল, তাও অনেক ফাঁকি দিতে শিখেছে মশায়, আজকাল। ধীরে ধীরে শিখছে, বুঝলেন না? যখন ওরা প্রথম এল এখানে, তখন একটা লোকে যা কাজ করত, এখন সেই কাজ করে দুটো লোকে; দেড়টা লোক তো লাগেই।
বিমলবাবু ব্যবসায়ী লোক, কয়েকটি কলের মালিক, শ্রমিক মজুরদের সম্বন্ধে তাঁহার অভিজ্ঞতা প্রচুর। তাহার উপর তিনি উচ্চশিক্ষিত বৈজ্ঞানিক; মিত্তিরের কথা শুনিয়া তিনি একটু হাসিলেন, বলিলেন, কিন্তু এখনও ওরা একজন যা করে, সে-কাজ করতে আমাদের দেশী লোক অন্তত দেড়টা লাগে। দুটোই বলতাম, তা আপনার ভয়ে দেড়টাই বলছি।
মিত্তির আবার সন্তোষের হাসি হাসিল। বিমলবাবু তাহাকে ভয় করিয়া কথা বলিতেছেন, এইটুকু তার বেশ ভালই লাগিল। হাসিয়া বিমলবাবুর কথা মানিয়া লইয়া সে এবার বলিল, তা বটে।
বিমলবাবু বলিলেন, চলুন, একবার ওদের পাড়ার মধ্যে যাওয়া যাক। একটু আলাপ করে রাখা যাক। কল চালাতে হলে ওদের না হলে তো চলবে না।
শ্রীবাসের দোকানের সম্মুখ দিয়াই পথ, দোকানের সম্মুখে আসিয়াই মিত্তির বলিল, ওরে বাপ রে। এখানেই যে সব ভিড় লাগিয়ে রয়েছিস মাঝিরা! কি করছিস সব এখানে?
শ্রীবাসের দোকানে বসিয়া মাঝিরা বাকির খাতায় টিপ-সহি দিতেছিল। শ্রীবাস একটি হুঁকা হাতে বসিয়া সমস্ত দেখিয়া লইতেছিল। মিত্তির ও অপরিচিত বিমলবাবুকে দেখিয়া সে শঙ্কিত হইয়া উঠিল। তাড়াতাড়ি হুঁকাটি রাখিয়া উঠানের পথে নামিয়া আসিল, অর্ধনত হইয়া একটি নমস্কার করিয়া বলিল, পেনাম। তারপর, মিত্তির মশায়, কোন দিকে? এই বনের মধ্যে? আর এই বাবুটি?
