ঘাটের ঠিকাদার গরুর গাড়ির টাপরের ভিতর বসিয়াই পারের পয়সা আদায় করিতে করিতে একজনের সঙ্গে বিতণ্ডা জুড়িয়া দিয়াছে, একটি ছেলের পারানির পয়সা লইয়া। লোকটি বলিতেছে, কোম্পানির র্যালে ছেলের জন্যে হাফ-টিকিট, আর তোমার লৌকাতে নাই বললে চলবে কেনে হে বাপু? মগের মুলুক পেয়েছ লেকিনি তুমি?
গরুর গাড়ির গাড়োয়ান অত্যন্ত সাবধানতার সহিত গরুগুলিকে চালনা করিতে করিতে চেঁচাইতেছিল, অ-ই–হ-হ! ইদিগেই
নিতান্ত প্রয়োজনীয় সময়ে এমনি কলরবমূর্খর একটি বিষয়ান্তরে সুযোগ পাইয়া অমল অহীন্দ্র দুইজনেই যেন বাঁচিয়া গেল। হাফটিকিট-যুক্তিবাদী লোকটির কথায় অকস্মাৎ প্রচুর কৌতুক অনুভব করিয়া অমল বেশ খানিকটা হাসিয়া লইয়া বলিল, ফাইন আর্গুমেন্ট কিন্তু।
যাত্রী গাড়ি বোঝাই করিয়া খেয়ানৌকা আবার ও-পারের দিকে রওনা হইল। খেয়ার মাঝি লগির একটা খোঁচা দিয়া নৌকাখানাকে তটভূমির সংস্পর্শ হইতে ঠেলিয়া জলে ভাসাইয়া উচ্চকণ্ঠে বলিল, হরিহরি বল সব। মিঞাসাহেবরা আল্ল-আল্লা বল।
হিন্দুর সংখ্যাই বেশি ছিল অথবা সবাই বোধ হয় হিন্দু ছিল, সমবেত কণ্ঠের একটা উচ্চ কলরোল উঠিল, হরি-বোল।
আবার ঘাট নিস্তব্ধ হইয়া গেল। শুধু নদীর আবর্তের কুটিল নিম্ন কলকল শব্দ একই ভঙ্গিতে একটানা ধ্বনিত হইয়া চলিল। সে মৃদু ধ্বনি উঠিলেও জনবিরল খেয়াঘাটের উপর যে দুই তিনটি মানুষ বসিয়া ছিল, তাহাদের অন্তরের স্তব্ধতা সে-ধ্বনিতে ক্ষুণ্ণ হইল না; জনবিরল খেয়াঘাটের শান্ত উদাসীনতার মধ্যে নদীর নিম্নস্বর সুশোভনরূপে অঙ্গীভূত হইয়া গিয়াছিল। কানে বাজিলেও মনে ধরা পড়িবার মত ধ্বনি সে নয়।
অমল ও অহীন্দ্রের মনের বহিদ্বারে অকস্মাৎ-আসিয়া পড়া কৌতুক ফুরাইয়া গিয়াছে; আবার তাহারা দুজনেই গম্ভীর হইয়া উঠিয়াছে। একটি কাঠি দিয়া অমল বালির উপর আঁকিতেছে একটা অর্থহীন চিত্র। অহীন্দ্র স্থিরদৃষ্টি নদীর বুকের উপর। অমল সহসা বলিল, আচ্ছা, আমি যদি একটা টুইশানি যোগাড় করে দিই? এক ঘন্টা দেড় ঘন্টা পড়াবে, পনেরো টাকা কি কুড়ি টাকা তাঁরা দেবেন। তা হলে তো তোমার আপত্তি থাকতে পারে না?
অমলের মুখের দিকে স্থিরদৃষ্টিতে চাহিয়া অহীন্দ্র বলিল, আরও পরিষ্কার করে বল। তুমি কি উমাকে পড়াবার কথা বলছ?
অমলও অহীন্দ্রের মুখের দিকে চাহিয়া ঈষৎ হাসিয়া বলিল, তাই যদি বলি?
পারব না।-দৃঢ়স্বরেই অহীন্দ্র জবাব দিয়া বসিল।
এবারও অমল হাসিল, বলিল, জানি। তবু কথাটা ভাল করেই জেনে নিলাম। যাক, সে কথা নয়; আমি বলছি আমার মামাতো ভাইকে পড়াবার কথা। ছেলেটা থার্ড ক্লাসে পড়ছে, তাকে পড়াবার জন্যে তাঁরা মাস্টার খুঁজছেন।
কিছুক্ষণ চিন্তা করিয়া লইয়া বলিল, ভাল রাজী হলাম। তারপর অল্প হাসিয়া বলিল, চল, দেখি তোমার কলকাতা কেমন। মফঃস্বলের চেয়ে কতখানি ওপরে অবস্থান করছেন, পরখ করে দেখা যাক।
অমল হাসিয়া বলিল, অনেক-অনেক অনেক ওপরে অহি, তিন ধাপ নয়, আরও বেশী ওপরে। দেখছো না, প্রাইভেট টুইশানির কথা বলতেই তুমি ধরে নিলে উমাকে পড়াবার কথা। অর্থাৎ মনে করে নিলে উমাকে পড়াবার ভানে আমরা তোমাকে সাহায্য করতে চাই। যে দৃষ্টিতে আমার দিকে চাইলে, তাতে পুরাকাল হলে আমার ভস্ম হয়ে যাবার কথা। কিন্তু জিজ্ঞাসা করি, কেন? ধর, যদি তাই হত তাতেই বা ক্ষতি কি ছিল? শ্রমবিনিময়ে মূল্য নেবে, তাতে মর্যাদার হানিটা কোথায়? এই হল তোমার মফঃস্বল-মেন্টালিটি।
অহীন্দ্র রাগ করিল না, হাসিয়াই বলিল, এ কথায় কিন্তু কলকাতার লোকেরই হার হল অমল। মূল্য অপেক্ষা অমূল্য বস্তুর দাম বেশি এবং মূল্য না নিলে তবেই সংসারে অমূল্য বস্তু মেলে– এ সত্য কলকাতার লোক জানে না, মফঃস্বলের লোকেরাই জানে প্রমাণ হচ্ছে।
অমল হাসিয়া বলিল, বিজ্ঞানের ছাত্রের অযোগ্য কথা বললে অহীন। বৈজ্ঞানিকের কাছে অমূল্য শব্দের অ অক্ষরটা অঙ্কের পূর্ববর্তী শূণ্য ছাড়া আর কিছুই নয়। যতই উচ্চ মূল্যের বস্তু হোক, একটা মূল্য সে নির্ধারিত করবেই করবে। সেইটাই তার জ্ঞানের বৈশিষ্ট্যের পরিচয়।
অহীন্দ্র হাসিয়া বলিল, আমার মূল্য তোমার কাছে তা হলে কত তুমি বলতে পার?
অমল বলিল, তোমার কাছে আমার যত মূল্য, সেইটে ইনটু টেন।
আমার কাছে তুমি তো অমূল্য। অমূল্য ইনটু টেনের ভ্যালু কত, বল তো?
তুমি একটা বোগাস, যত কুটবুদ্ধি তোমার।–অমূল্য হাসিয়া এবার পরাজয় মানিয়া লইল।
এতক্ষণ তাহারা সহজ স্বছন্দ হইয়া উঠিল, বাহির এতক্ষণে অন্তরে প্রবেশ করিল।
নদীর বন্যা, আকাশে ঘনঘোর মেঘ, স্রোতের নিম্ন কলস্বর, বাতাসের শব্দস্পর্শ, ভিজামাটির গন্ধ এতক্ষণে তাহারা স্পষ্ট করিয়া অনুভব করিল। আবর্তকুটিল, গৈরিকবর্ণের বিশাল জলস্রোতের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে চাহিয়া অমল বলিল, কালিন্দী আমাদের অদ্ভুত, বহরূপা রহস্যময়ী! অনেক দিন আগে, ছেলেমানুষ ছিলাম, তখন দেখেছি কালিন্দীর বান। আর এই দেখছি।
অহীন্দ্র বলিল, এখানকার প্রবাদ কি জান? এখানকার লোক বলে, উনি নাকি যমের সহোদরা; অর্থাৎ যমুনার কাহিনীটা এঁর ওপর আরোপ করতে চায়। কালিন্দী নাকি যে বস্তুটিকে গ্রাস করতে বদন ব্যাদান করেন, তার রক্ষা কিছুতেই নেই। যম এসে সেখানে দোসর হয়ে ভগ্নীর পাশে দাঁড়ান। এক চাষী, তার নাম রংলাল, সেই আমাকে বলেছিল। অদ্ভুত বিশ্বাস, বললে, উনি যে-কালে হাত বাড়িয়েছেন, সে-কালে রায়হাটের আর রক্ষা নেই।
