দলের তরুণীগুলি সকলেই সমস্বরে সায় দিয়া উঠিল, হ্যাঁ হ্যাঁ। হুই লদীর উ পারে বসে রইছে। আমরা দেখলাম। আমাদের রাঙাবাবু।
শ্রীবাসের খরগোশ মাংসের উপর প্রলোভন ছিল, সে তাড়াতাড়ি বলিল, হ্যাঁ মাঝি, আমি যে বললাম একটা খরগোশের জন্য, আমাকে একটা দে।
কমলের নাতনীই শ্রীবাসকে জবাব দিল। কেহ কিছু বলিবার পূর্বেই সে বলিল, কেনে, তুকে দিব কেনে? তুকে দিব তো আমরা কি খাব?
শ্রীবাস ভ্রূ কুঞ্চিত করিয়া বলিল, এ তো আচ্ছা মেয়ে রে বাবা। ওই তো তোরা দিতে যাচ্ছিস রাঙাবাবুকে। তা আমাকে দিবি না কেনে?
কমলের নাতনী পরম বিস্ময়ের সহিত একটা আঙুল শ্রীবাসের দিকে দেখাইয়া আপনাদের ভাষায় বলিয়া উঠিল, এ লোকটা পাগল, না খ্যাপা?
মেয়ের দল খিলখিল করিয়া হাসিয়া উঠিল। শ্রীবাসের ছেলে গনেশ সাঁওতালী ভাষা বুঝিতে পারে; তাহার মুখ-চোখ লাল হইয়া উঠিল, সে কঠিন স্বরেই বলিয়া উঠিল, এই সারী, যা-তা বলিস না বলছি।
কমলের ওই নাতনীর নাম সারী; শুকসারীর সারী নয়-উহাদের ভাষায় সারীর অর্থ উত্তম ভাল। সারী বলিল, কেনে বুলবে না? ই কথা উ বলছে কেনে? রাঙাবাবুর সাথে সাথ করছে কেনে? উ আমাদের জমিদার, আমাদিগে জমি দিলে, আমাদিকে ধান দেয়; তুদের মত সুদ লেয় না।
সারীর কথার ভঙ্গিতে কমলও এবার লজ্জিত হল, সে যথাসম্ভব মোলায়েম করিয়া বলিল, উনিকে সবাই খুব ভালবাসে মোড়ল, উনি আমাদের রাঙাঠাকুরের লাতি।
মেয়েগুলো মুগ্ধ বিস্ময়ের সুরে বলিয়া উঠিল আপনাদের ভাষায়, তিমুনি আগুনের পারা রং!-আঃ য় গো! বিস্ময়সূচক ‘আয়-গো’ শব্দটির দীর্ঘায়িত ধ্বনির সুর তাহাদের কণ্ঠে সঙ্গীতধ্বনির মতই বাজিয়া উঠিল।
.
১৯.
একা অহীন্দ্র নয়, অমল এবং অহীন্দ্র দুইজনেই প্রাতঃকালে কালিন্দীর ঘাটে আসিয়া বসিয়াছিল। বর্ষার জলে ভিজিবার জন্যে দুইজনে বাড়ি হইতে বাহির হইয়াছিল। নদীর ঘাটে আসিয়া কালীর বন্যা দেখিয়া সেইখানে তাহারা বসিয়া পড়িল। খেয়াঘাটের উপরে পথের পাশেই এক বৃদ্ধ বট; বটগাছটির শাখাপল্লব এত ঘন এবং পরিধিতে এমন বিস্তৃত যে, বৃষ্টির জলধারা তাহার তলদেশের মাটিকে স্পর্শ করিতে পারে না, গাছের পাতা ঝরা জল স্থানে স্থানে ঝরিয়া পড়ে মাত্র। গাছের গোড়ায় মোটা মোটা শিকড়গুলি আঁকিয়া বাঁকিয়া চারিপাশের মাটির মধ্যে প্রবেশ করিয়াছে; কিন্তু তাহাদের উপর খানিকটা অংশ অজগরের পিঠের মত মাটির উপরে জাগিয়া আছে, সেই শিকড়ের উপর বসিয়া তাহারা দুইজনে কালীর খরস্রোতের মধ্যে ঢিল ছুঁড়িতে ঘুড়িতে কথা বলিতেছিল। গাছটারই তলায় তাহাদের হইতে কিছু দূরে, খান-দুই গরুর গাড়ি খেয়ানৌকার অপেক্ষা করিয়া রহিয়াছে। বর্ষার বাতাসে গরুগুলির সর্বাঙ্গের লোম খাড়া হইয়া উঠিয়াছে, গাড়োয়ান দুইজন এবং আর জন কয়েক খেয়ার যাত্রী ভিজা কাঠের আগুনের ধোঁয়ার সম্মুখে উবু হইয়া বসিয়া তামাক টানিয়া কাশিতেছে, গল্প করিতেছে।
বহুদিনের প্রাচীন বট, গাছের তলায় বহু বৎসর হইতেই পথের রাহীরা এমনই করিয়া আশ্রয় গ্রহণ করে। গাছটার নামই ‘আঁটের বটতলা’। পথের মধ্যে অপরিচিত পথিকেরা জোট বাঁধিয়া এই স্থানে আশ্রয় লইয়া থাকে-এই আশ্রয় লওয়াকে এ-দেশে বলে আঁট দেওয়া। গাছের তলাতেই একটা গরুর গাড়ির টাপর বা ছই পাতিয়া তাহারই আশ্রয়ের তলে উবু হইয়া বসিয়া খেয়াঘাটের ঠিকাদারও তামাক টানিতেছিল।
আপনার বক্তব্যের উপর জোর দিয়াই অমল কথা বলিতেছিল। সে এবার ধরিয়াছে, অহীন্দ্রকে কলকাতায় পড়িতে হইবে। অহীন্দ্রের কোন অজুহাতই সে শুনিতে চায় না; সে বার বার বলিতেছে, তোমার মত স্টুডেন্টের পক্ষে মফঃস্বল কখনও উপযুক্ত ক্ষেত্র হতে পারে না।
কৌতুকভরে অহীন্দ্র বলিল, বল কি?
নিশ্চয়। অন্তত তিন ধাপ যে খাটো, সেটা তো প্রামাণিত হয়েই গেছে তোমার রেজাল্টে?
মানে?
ভেরি ইজি। কলকাতায় থাকলে তোমার নাম থাকত সর্বাগ্রে-এ আমি নিঃসংশয়ে বলতে পারি। ক্ষেত্রের উর্বরতা-অনুর্বরতা তোমার সায়েন্সের স্বীকৃত সত্য, বীজের অদৃষ্টের ঘাড়ে দোষ চাপানোর মত। অবৈজ্ঞানিক মতবাদ নিশ্চয় তুমি পোষণ করতে পার না।
এবার অহীন্দ্র কিছুক্ষণ চুপ করিয়া থাকিয়া বলিল, তুমি সবটা বুঝতে পারছ না অমল। তবে তোমাকে বলতে আমার বাধা নেই। আমাকে মাসে মাসে এবার থেকে মাকে কিছু করে না পাঠালে চলবে না। নিয়মিত আদায়পত্র তো হয় না, টাকার অভাবে মা অনেক সময় বিব্রত হয়ে পড়েন। আর মাকে আমার রান্না করতে হয়, মানদা ঝি বিনা মাইনেতে কাজ করে, অন্ততঃ এ দুটো খরচ আমাকে পাঠাতেই হবে।
অমল চুপ করিয়া গেল। কথাগুলির মধ্যে যে একটা বেদনাদায়ক সঙ্কোচ লুকাইয়া আছে, সেই সঙ্কোচে সে সঙ্কুচিত হইয়া পড়িল। প্রাণঢালা অন্তরঙ্গতায় সে অহীন্দ্রের অন্তরঙ্গ, তবুও তাহার মনে হইল, এ কথাটা জোর করিয়া অহীন্দ্রের কাছে শুনিয়া সে অনধিকার চর্চা করিয়াছে। এদিকে ও-পার হইতে নৌকাখানা আসিয়া পড়ায় খেয়াঘাট কলরবে মুখরিত হইয়া উঠিল। গাছতলায় গাড়ি লইয়া গাড়োয়ানেরা ব্যস্ত হইয়া পড়িল। শীতার্ত গরু কয়টাকে গাড়িতে জুড়িবার পূর্ব হইতেই ঠ্যাঙাইতে আরম্ভ করিয়া দিয়াছে, চীৎকার শুরু করিয়া দিয়াছে। যাত্রী যাহারা নামিতেছে তাহারা চীৎকার করিতেছে কম নয়।
