কালীর তটভূমির ভাঙনের দিকে চাহিয়া অমল বলিল, ওদের সংস্কারের কথা বাদ দিয়েও কথাটা সত্যি, ভাঙনের দিকে চেয়ে দেখ দেখি।
মৃদু হাসিয়া অহীন্দ্র বলিল, এদিকে ভাঙছে ও-দিকে গড়ছে। ও-পারের চরটা বছর বছর পরিধিতে অল্প অল্প করে বেড়ে চলেছে। সঙ্গে সঙ্গে মানুষের সঙ্গে মানুষের কলহ বাড়ছে। গোড়া থেকেই ব্যাপারটা আমি জানি। আমি হলপ করে বলতে পারি অমল, যে, এ গ্রামে শুধু এ গ্রামে কেন, আশেপাশে এমন লোক নেই, যার লোভ নেই ওই চরটার মাটির ওপর।
চরটার দিকে চাহিয়া অমল বলিল, চরটি কিন্তু সত্যি লোভনীয় হয়ে উঠেছে, তা ছাড়া মাটিও বোধ হয় খুব উর্বর।
খুব উর্বর। রংলাল বলছিল, ও মাটিতে সোনা ফলে
চল একদিন দেখে আসি। কাল চল।…আরে আরে, অত সব চেঁচামেচি করছে কেন? আরে বাপ রে, দল বেঁধে চাপে যে! নৌকাখানা ডুবে যাবে!
ও-পারের চরের পার-ঘাটে দল বাঁধিয়া সাঁওতালদের মেয়েরা নৌকায় চড়িতে চড়িতে কলরব করিতেছে। নৌকায় উঠিয়া মেয়েরা দল বাঁধিয়া বাসিয়াছে, সেই ভারে এবং চাঞ্চল্যে নৌকাটা টলমল করিতেছে, তাহাতেই তাহারা সভয় কৌতুকে কলরব করিতেছে। এ-পার হইতে ঘাটের ঠিকাদারও শঙ্কিত হইয়া চীৎকার আরম্ভ করিয়া দিল, অই, অই, এরা করছে কিরে বাপু? হে-ই! হেই!
কিন্তু তাহার কণ্ঠধ্বনি নদীর কল্লোল ভেদ করিয়া ও-পারের দলবদ্ধ সাঁওতালদের কলরবের মধ্যে আত্মঘোষণা করা দূরের কথা, বোধহয় পৌঁছিতেই পারিল না। শেষ পর্যন্ত বেচারা কাশিয়া সারা হইল। কাশিতে কাশিতেই সে বলিল, মর, তবে মর তোরা ডুবে, নিক, নিক, কালী নিক তোদিগে। অসীম বৈরাগ্যের সহিত সে নদীর দিকে পিছন ফিরিয়া বসিয়া নূতন করিয়া তামাক সাজিতে শুরু করিল।
অহীন্দ্রের মুখে একটি পুলকিত হাসির রেশ ফুটিয়া উঠিল, সে নৌকাভরা সাঁওতাল মেয়েদের দিকে চাহিয়া বলিল, একটা মজা দেখবে দাঁড়াও।
হঠাৎ মজাটা কোত্থেকে আসবে?
ওই নৌকায় চড়ে আসছে।
বল কি? ব্যাপারটা কি?
আমার পূজারিণীর দল আসছে। আমি ওদের রাঙাবাবু।
অমল মুগ্ধ হইয়া গেল, বলিল, বিউটিফুল। চমৎকার নাম দিয়েছ তো। কিন্তু এ যে একটা রোমান্স হে!
অহীন্দ্র হাসিয়া বলিল, রোমান্সই বটে। আবার চরটার নাম দিয়েছে রাঙাঠাকুরের চর। আমার ঠাকুরদার সাঁওতাল হাঙ্গামায় যোগ দেওয়ার কথা জান তো? তাঁর প্রতি ওদের প্রগাঢ় ভক্তি। তাঁকে বলত ওরা রাঙাঠাকুর। আমি নাকি সেই রকম দেখতে। চোখগুলো খুব বড় বড় করে বলে, তেমনি আগুনের পারা রং।
ঘাটের ঠিকাদারটি তামাক সাজিতে সাজিতে অহীন্দ্র ও অমলের কথাবার্তা সবই কান পাতিয়া শুনিতেছিল, সে আর থাকিতে পারিল না, বলিয়া উঠিল, তা আজ্ঞে, ওরা ঠিক কথাই বলে, বাবুমশায়। আমাদের চক্কবর্তী-বাবুদের বাড়ির মত রং এ চাকলায় নাই, তার ওপর আপনার রং ঠিক আগুনের পারাই বটে।
অমল ফিসফিস করিয়া বলিল, মাই গড! লোকটা আমাদের কথা সব শুনেছে নাকি?
হাসিয়া অহীন্দ্র বলিল, অসম্ভব নয়। চুরি করে পরের কথা শোনায় মানুষ চুরির আনন্দ পায়।
ঠিকাদারটা এবার বাহির হইয়া আসিয়া অহীন্দ্র ও অমলের সম্মুখে সবিনয় ভঙ্গিতে উবু হইয়া বসিয়া বলিল, বাবুমশায়!
অহীন্দ্র বলিল, বল।
আজ্ঞে। বলিয়াই সে একবার সঙ্কোচভরে মাথা চুলকাইয়া লইল, তারপর আবার বলিল, আজ্ঞে, বাদলের দিন, আমার কাছে সিগারেট তো নাই। তামুকও খুব কড়া, তা বিড়ি ইচ্ছে করুন কেনে।
অমল খিলখিল করিয়া হাসিয়া উঠিল, অহীন্দ্র ঈষৎ হাসিল, হাসিয়া সে বলিল, না, আমরা বিড়ি সিগরেট তামাক-এইসব খাই নে, ওসব কিছু দরকার নেই আমাদের।
লোকটি অপ্রস্তুত হইয়া অপ্রতিভভাবে হাসিয়া বলিল, আমি বলি-। কিছুক্ষণ অপ্রতিভর হাসি হাসিয়া সে আবার বলিল, আমি আজ্ঞে একটা কথা নিবেদন করছিলাম।
অমল হাসিয়া ইংরেজীতে বলিল, হোয়াট নেক্সট? এ প্লাস অব ওয়াইন?
লোকটি কিছু বুঝিতে না পারিয়া সবিস্ময়ে প্রশ্ন করিল, আজ্ঞে?
গম্ভীরভাবে অহীন্দ্র বলিল, কিছু না, ও উনি আমাকে বলছেন। তুমি কি বলছ, বল?
হাত দুইটি জোড় করিয়া এবার লোকটি বলিল, আজ্ঞে, ওই চরের ওপর খানিক জমির জন্যে বলছিলাম।
একটি মৃদু হাসি অহীন্দ্রের মুখে ফুটিয়া উঠিল, বলিল, জমি?
আজ্ঞে হ্যাঁ। বেশী আমার দরকার নেই, এই বিঘে দশ-পনেরো।
এ-কথার জবাব তো আমি দিতে পারব না বাপু। আমার মুরুব্বীরা রয়েছেন, তাঁরা যা করেন তাই হবে।
আজ্ঞে আমার বিঘে পাঁচেক হলেও হবে।- লোকটি কাকুতি করিয়া এবার বলিয়া উঠিল, আমি একটি দোকান ও-পারে করব মনে করছি।
দোকান? দোকান তো একটা আছে ও-পারে। শ্রীবাস মোড়ল করেছে।
আজ্ঞে হ্যাঁ, আমারও ইচ্ছে, একখানা দোকান করি। লোকও তো ক্রেমে ক্রেমে বাড়ছে। আর চিবাস আপনার গলা কেটে লাভ করে। দরে তো চড়া পাবান না, মারে ওজনে। সেরকরা আধপো ওজন কম। দু রকম বাটখারা রাখে আজ্ঞে। ধান-চাল নেয় যে বাটখাড়ায় সেটা আবার সের-করা আধপো বেশী।
অমল এবার বলিল, সেই মতলবে তুমিও দোকান করতে চাও, কেমন?
আজ্ঞে না। এই আপনাদের চরণে হাত দিয়ে আমি বলতে পারি আজ্ঞে। ও-রকম পয়সা আমার গোরক্ত ব্রহ্মরক্তের সমান। আমি আপনার ষোল-আনার ওজন দেব, ষোলআনা পয়সা নেব-বলিয়া সে বুড়ো আঙুলটি একত্র করিয়া ওজন করিবার ভঙ্গিতে ডান হাতখানি তুলিয়া ধরিল যেন সে এখনই ওজন করিতেছে। অমল অহীন্দ্র উভয়েই সে ভঙ্গি দেখাইয়া হাসিয়া ফেলিল।
