সুনীতি বলিলেন, না। অহিকে ডাক্ তুই, ওপরে নিজের ঘরেই আছে সে।
অহীন্দ্র আসিয়া সম্মুখে উপস্থিত হইতেই মাঝির দল কলরব করিয়া উঠিল, রাঙাবাবু। অহীন্দ্র সাধারণতঃ এখানে থাকে না, তাহারা প্রত্যাশা করিয়াছিল মজুমদারকে। অপ্রত্যাশিত ভাবে তাহাদের রাঙাবাবুকে পাইয়া তাহারা খুব খুশি হইয়া উঠিল। অহীন্দ্র বলিল, কি রে, তোরা সব কেমন আছিস?
ঠকঠক তখন প্রণাম হইয়া গিয়াছে। কমল মাঝি জোড়হাত করিয়া বলিল, ভাল আছি আজ্ঞা। আপুনি কেমন করে এলি বাবু? আমরা সব কত বুলি, কত খুঁজি তুকে! বুলি, আমাদের রাঙাবাবু আসে না কেনে? মেয়েগুলা সব শুধায়।
হাসিয়া অহীন্দ্র বলিল, আমি যে পড়তে গিয়েছিলাম মাঝি।
ক খ অ আ সেই সব। রিংজী ফার্সী, নাকি বাবু?
হ্যাঁ, অনেক পড়তে হয়। তার পর তোরা কোথায় এসেছিস?
আপনার কাছে তো এলাম গো বুলছি আমাদের জমি কটির খাজনা তুরা লে, আমাদিগকে চেক-রসিদ দে। তা নইলে কি করে থাকবো গো?
খাজনা কে পাবেন, এখনও যে তার ঠিক হয় নি মাঝি। সে ঠিক
বাধা দিয়া কমল বলিল, না গো, সে সব ঠিক হয়ে গেল। দিলে সব ঠিক করে উই সেই রায়-হুঁজুর, আমাদিকে বুললে, চরটি তুদের রাঙাবাবুদেরই ঠিক হল মাঝি। খাজনা তুরা সেই কাছারিতে দিবি। তাথেই তো আজ ছুটে এলম গো।
দ্বিপ্রহরে হেমাঙ্গিনীর কথা অহীন্দ্রের মনে পড়িয়া গেল। সে এবার দ্বিধা না করিয়া বলিল, দে, তবে দিয়ে যা।
কিছুক্ষণ অবাক হইয়া চাহিয়া থাকিয়া মাঝি বিনয় করিয়া হাসিয়া বলিল, হা বাবু, ইটি আপনি কি বুলছিস? জমি কটি মাপতে হবে, তা বাদে হিসাব করতে হবে, তুদের খাতিতে নাম লিখতে হবে, সি সব কর আগে! লইলে কি করে দেব?
অহীন্দ্র বিব্রত হইয়া বলিল, সে তো আমি পারব না মাঝি, আমি তো জানি না ওসব। তবে আমি তার ব্যবস্থা করছি, বুঝলি?
মাঝি বিস্মিত হইয়া গেল, তবে আপনি কি বিদ্যে শিখলি গা?
হাসিয়া অহীন্দ্র বলিল, সে সব অনেক বই মাঝি, নানা দেশের কথা, কত বীরের কথা, কত যুদ্ধের কথা।
হাঁ, তা সি কোন গাঁয়ের কথা বটে গো?-বীর বুললি-কারা বটে সি সব?
সে সব পৃথিবী জুড়ে নানা দেশ আছে, সেই সব দেশ, আর সেই সব দেশের বড় বড় বীর-তাদের কথা মাঝি। আরও সব কত কথা-ওই আকাশে সূয্যি উঠছে, চাঁদ উঠছে, সেই সব কথা।
হ্যাঁ! মাঝির মুখ-চোখ বিস্ময়ে ভরিয়া উঠিল, সে মুখ ফিরাইয়া দলের সকলকে আপন ভাষায় বলিল, রাঙাবাবু কত জানে দেখ।
সঙ্গীর দল আপন ভাষায় রাঙাবাবুর তারিফ করিয়া মৃদু কলরব আরম্ভ করিয়া দিল, কমল বলিল, হ্যাঁ বাবু, এই যে পিথিমীটি, এই যি ধরতি-মায়ী-ইকে কে গড়লে? কি লেখা আছে পুঁথিতে তাদের?
অহীন্দ্র বলিল, পৃথিবী হল গ্রহ, বুঝলি? আকাশে রাত্রে সব তারা ওঠে না? এও তেমনি একটা তারা। আগে পৃথিবী দাউ দাউ করে জ্বলত। যেমন কড়াইতে গুড় কি রস টগবগ করে ফোটে তেমনি করে ফুটত।
মাঝি বিষণ্ণভাবে ঘাড় নাড়িয়া বলিল, উঁহু, তুকে এখনও অনেক পড়তে হবে। পিথিমীতে আগে ছিল জল। কিছুই ছিল না, শুধুই জল ছিল। তার পরে হল কি জানিস? বলি শোন্ বলিয়া সে মোটা গলায় আরম্ভ করিল
অথ জনম কু ধরতি লেণ্ডং
অথ জনম্ কু মানোয়া হড়
মান মান কু মানোয়া হড়
ধরতি কু ডাবাও আ-কাদা,
ধরতি সানাম্ কু ডাবাও কিদা।
গান শেষ করিয়া মাঝি বলিল, পেথমে ছিল জল-কেবল জল। তার পর হল-অথ জনম্ কু ধরতি লেণ্ডং; বুলছে, লেণ্ডং গায়ে থেকে মাটি বার করে ধরতিকে বানালে-মাটি করলে। লেণ্ডং হল-ওই যে মাছ ধরিস তুরা, কেঁচো গো, কেঁচো। দেখিস কেনে-আজও উহার গায়ে থেকে মাটি বার করে। তারপর হল- ‘অথ জম কু মানোয়া হড়’। বুলছে, মাটিতে হল মানুষ। ‘মান মান কু মানোয়া হড়’, কিনা মানুষ মানুষ-কেবলই মানুষ। তখন তুর ‘ধরতি কু ডাবাও আ-কাদা’ কিনা-মানুষ করলে ধরতি-মাটি খুঁড়ে চাষ;-ফসল হল। ‘ধরতি সানাম কু ডাবাও কিদা’- একেবারে তামাম ধরতিতে চাষ হয়ে অ্যানেক ফসল হল।
অহীন্দ্র হাসিল, কিন্তু বড় ভাল লাগিল এই গান ও গল্প। মাঝি আবার বলিল, ধরতি-মাটি বানালে তুর ‘লেণ্ডং’-কেঁচোতে, পোকাতে।
অহীন্দ্র তাহাকে উৎসাহিত করিয়া বলিল, এ সব কথা তো আমি জানি মাঝি।
উৎসাহ পাইয়া মাঝি জাঁকিয়া বসিয়া বলিল, তবে শুনো আপুনি, বুলি আপনাকে। ঠাকুর বুঝো তো বাবু, ঠাকুর-ভগোমান? সি পেথমে জল করলে–সব জল হয়ে গেল। তখুন ঠাকুর দুটি হাঁস-হাসিল বানালে। হাঁস-হাসিল হল পাখী, বুঝলিন বাবু? তা সি পাখী দুটি ঠাকুরকে বুললে, হাঁ ঠাকুর, আমাদিগে তো বানালি তা আমরা থাকব কুথা, খাব কি? ঠাকুর বললে, হেঁ, তা তো বেটে! তখন ঠাকুর ডাকলে তুর কুমীরকে। বুললে তুমি মাটি তুলতে পারিস? কুমীর বুললে, হেঁ, আপুনি বুললে পারি। কুমীর মাটি তুললে, সি-সব মাটি জলে গলে ফুরিয়ে গেল। তখন ঠাকুর ডাকলে-ইচা হাকোকে-বোয়াল মাছকে, তা উয়ার মাটিও গলে গেল। তার বাদে এল কাটকম। কি বুলিস তুরা উয়াকে? আ-হা!… কাটকমের বাংলা ভাবিয়া না পাইয়া মাঝি চিন্তিত হইয়া পড়িল।
কাঠের পুতুলের ওস্তাদ কথাটা যোগাইয়া দিল, কাঁকড়ি। কাঁকড়া বলে বাবুরা। সেই যি লম্বা লম্বা পা। হেঁ। কমল মাঝি বলিল, হেঁ। কাঁকুড়িকে ডাকলে তখুন। বুললে, মাটি তুলো তুমি! উ মাটি তুললে,
তা সিটোও গলে গেল। তখুন ঠাকুর ডাকলে লেণ্ডংকে-কেঁচোকে। শুধালে, তুমি মাটি তুলতে পারিস? উ। বললে, পারি; তা ঠাকুর, হারোকে সমেত ডাক আপুনি। হারো হল তুমার ‘কচ্ছপ’ গো। কচছপ এল। কেঁচো করলে কি- উয়াকে জলের উপর দাঁড় করালে, লিয়ে উয়ার পা কটা শিকল দিয়ে বেঁধে দিলে। তা বাদে, কেঁচো আপন লেজটি রাখলে উয়ার পিঠের উপর, আর মুখটি ডুবায়ে দিলে জলের ভিতর। মুখে মাটি খেলে আর লেজ দিয়ে বার করে কচ্ছপের পিঠের উপর রাখলে। তখুন আর গলে না। এমুনি করে মাটি তুলতে তুলতে পৃথিমী ভরে গেল।
