সমস্ত কাহিনীটি বলিয়া কমল বিজ্ঞভাবে হাসিয়া বলিল, বুঝলি বাবু? ই সব তুকে শিখতে হবে।
সাঁওতালদের এই পুরাণকথা শুনিয়া অহীন্দ্র আশ্চর্য হইয়া গেল। ইহাদের এমন পুরাণকথা আছে, সে তাহা জানিত না। সে মুগ্ধ বিস্ময়ে নীরবে গল্পটি মনে মনে স্মরণ করিয়া আয়ত্ত করিয়া লইতে আরম্ভ করিল।
কমল মাঝিও নীরবে তাহার মুখের দিকে চাহিয়া ছিল তাহার তারিফ শুনিবার প্রত্যাশায়। পিছন হইতে কাঠের পুতুলের ওস্তাদ বলিল, বাঃ, তুমি যে গল্পে মজিয়া গেলে গো সর্দার। জমির কথাটা বলিয়া কথাটা পাকা করিয়া লও! এই লোকটি জ্ঞানে-গরিমায় কমলের প্রতিদ্বন্দী। সর্দারের এই বিদ্যা জাহির করাটা তার সহ্য হয় না, তা ছাড়াও লোকটি খাঁটি সংসারী মানুষ, বিষয়বুদ্ধিতে পাকা। অন্য মাঝিরাও কাঠের পুতুলের ওস্তাদের কথায় সায় দিয়া উঠিল।
কমল একটু রুষ্ট হইয়াছিল, কিন্তু সকলের সমর্থন দেখিয়া সে কোন প্রতিবাদ করিল না। অহীন্দ্রের মুখের দিকে চাহিয়া বলিল, বাবুমশায়!
অহীন্দ্র হাসিয়া বলিল, তোমার একথা খুব ভাল কথা মাঝি। ভারী সুন্দর।
হু গো, খুব ভাল বটে তা- হা বাবু, আমাদের তবে কি করবি?
বললাম তো লোক পাঠিয়ে দেব।
উঁ-হুঁ। তুকে নিজে যেতে হবে! উয়ারা সব চোর বটে।
কমলের চোখ দুইটি হঠাৎ জ্বলিয়া উঠিল, বলিল, শুন রাঙাবাবু, ইয়ার লেগ্যে একবার আমরা খেপলম। এই বড় বড় হাঁড়িতে ঘি নিয়ে যেতম, দোকানীরা ঘি লিথো, তা এক সেরের বেশী কখুনও হত না। মহাজনেরা কাই হড় বটে, পাপী মানুষ, মাঝিদের হাডিড চিবায়ে খেলে। গোমস্তাতে টাকা লিলে, রসিদ দিলে না। খাজনা লিলে আবার জমি লিলেম করালে। জমা বাড়ালে। বললম, জমি বাড়ুক, তবে জমা বাড়বে, লইলে কেনে বাড়বে? বাবা দাদা বন কেটে জমি করলে, আমরা খাজনা দিলম, তবে লিলেম হবে কেনে জমি? তা শুনলে না। তখন আমরা খেপলম। সিধু, কানু সুভা ঠাকুর (সুবেদার) হল- এক রাতে হল। জানিস বাবু, রাতেই লোক বড় হয়, আবার রাতেই লোক ছোট হয়। সুভা, সিধু, কানু হুকুম দিলে, আমরা খেপব। তুর দাদা-বাবার বাবা-রাঙাঠাকুর বললে, খেপ তুরা, খেপ। এই টাঙ্গি লিয়ে রাঙাঠাকুর খেপল, আমাদের বাবাদের সাথে। তখুন ধরলুম মহাজনদিকে, একটি করে আঙুল কাটলুম, আর বললাম, বাজা, টাকা বাজা! দাড়িওলা মহাজনকে জমিদারকে ধরলম, ভাল পাঁঠা বলে বোঙার কাছে কাটলম। একটো গোমস্তা জলে নামল, তীর দিয়ে তাকে বিঁধলম। তারপর টেনে তুলে- পেরথম কাটলাম পা। বললম, এই লে চার আনা সুদ। তারপর কাটলম কোমর থেকে, বললম, এই লে আট আনা, সুদ আর খাজনা। কাটলাম হাত দুটো, বললম, এই বারো আনা, সুদ, খাজনা, তোর তহুরী। তারপর কাটলাম মাথা, বললম, এই লে ষোল আনা, লিব্যাধি! ফারখত!
কমল চুপ করিল। সমস্ত বাড়িটা যেন স্তব্ধ হইয়া গেল; যেন সব উদাস হইয়া গিয়াছে। অহীন্দ্র নীরব বিস্ময়ে চাহিয়া ছিল স্তব্ধ আগ্নেয়গিরির মত ওই কমলের দিকে। সাঁওতালরাও নীরব। তাহাদের উপরেও যেন কেমন নীরব বিষণ্ণতা নামিয়া আসিয়াছে।
কমলই আবার বলিল-এবার তাহার মুখও বিষণ্ণ, কণ্ঠস্বরে মিনতির অনুনয়-বলিল, তাথেই বুলছি বাবু
অহীন্দ্র এতক্ষণে বলিল, আবার তোমাদের ঠকালে তোমারা খেপবে?
খেপব? কমল বিষণ্ণভাবে ঘাড় নাড়িয়া বলিল, না।
কেন?
রাঙাঠাকুর মল, সিধু সূভাঠাকুর মল, রাঁচিতে বিসরা মহারাজ ম’ল আর কে খেপাবে বল্? কে। হুকুম দিবে? আর বাবু
কমল আপনাদের সঙ্গীদের দেখাইয়া বলিল, ইহারা সব আর সি সাঁওতাল নাই। ইয়ারা মিছা কথা বলে, কাজ করতে গিয়ে গেরস্তকে ঠকায়, খাটে না, ইয়ারা লোভী হইছে। পাপ হইছে উয়াদের। উয়ারা খেপতে পারবে না। উয়ারা ধরম লস্ট করলে।
শেষের দিকে কমলের কণ্ঠস্বর সকরুণ হইয়া উঠিল। সব কথা শেষ করিয়া সে উদাস দৃষ্টিতে চাহিয়া কিছুক্ষণ চুপ করিয়া বসিয়া রহিল। তাহার পিছনে মাঝির দল মাথা হেঁট করিয়া দাঁড়াইয়া ছিল। তাহাদের সর্দারের অভিযোগ তাহাদের লজ্জা দিয়াছে।
কথা বলিল সেই চূড়া মাঝি-পুতুল নাচের ওস্তাদ, সে লোকটা অনেকটা বাস্তবপন্থী, সে ঈষৎ হাসিয়া বলিল, টাকা লইলে কিছু হয় না বাবু, টাকা নাই, খেপে কি করব? আর বাবু খেপে মরেই যদি যাব তো খেপলম কেনে বল্? বুদ্ধি করলাম ইবার আমরা।
কমল তাহার মুখের দিকে ঘৃণার দৃষ্টি হানিয়া মুখ ফিরাইয়া লইল, তারপর অহীন্দ্রকে বলিল, আর উয়ারা খেপবে না বাবু। খেপলম, তারপর হাজারে হাজারে সাঁওতাল ম’ল গুলিতে। যারা বাঁচল, তারা ভাত পেলে না। সাঁয়ো ঘাস খেলে। বাবু, আমি তখন গিধরা-ছেলেমানুষ-তবু মনে লাগছে (পড়ছে), ইঁদুরের দড় (গর্ত) থেকে ধান বার করলম-গুণে চারটি ধান, জলে সিজলাম (সিদ্ধ করলাম), সেই জল খেলম, ফেন বলে। আর উয়ারা খেপবে না। তাথেই সাহস হচ্ছে না। বুলছে চেক রসিদটি না হলে উয়াদের চাষে মন লাগছে না। তা বাদে আমাদের বিয়া আছে। ওই যে আমার লাতিনটি-সেই লম্বা পারা, তারই বিয়া হবে। তাথেই সব মাতন আছে আমাদের, হাঁড়িয়া খাবে সব, নাচবে, গান করবে। তাথেই সব তাড়াতাড়ি করছে।
অহীন্দ্র বলিল, বেশ, তাড়াতাড়ি করে নেব- কাল কি পরও। কিন্তু তোর নাতনীর বিয়েতে আমাদের নেমন্তন্ন করবি না?
মাঝি শিহরিয়া উঠিয়া বলিল, বাবা রে, আমাদের রাজা তুমি, রাঙাঠাকুরের লাতি, তেমুনি আগুনের পারা রঙ, তেমনি চোখ, তেমনি চুল। আপোনাকে তাই বলতে পারি? আমরা সব কত কি খাই-মুরগী শুয়োর ছি!
