হেমাঙ্গিনী বলিলেন, কত দিন ভেবেছি, আসব, আপনাকে দেখে যাব, কিন্তু পারি নি। আবার ভেবেছি, যাক, মুছেই যখন গেছে সব, তখন মুছেই যাক। কিন্তু সেও হল না, মুছে গেল না। পাথরে দাগ ক্ষয় হয় মুছে যায় কিন্তু মনের দাগ কখনও মোছে না। আজ আর থাকতে পারলাম না। অপরাধ আমাদেরই। এর জন্য দায়ী যে উনি।
কে? ইন্দ্র? না না রায়-গিন্নী, দায়ী আমি। হেতু ইন্দ্র। সব আমি খতিয়ে দেখেছি। চিত্রগুপ্তের খাতায় মাঝে মাঝে আমি উঁকি মেরে দেখি কিনা।
হেমাঙ্গিনী একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া চুপ করিয়া রহিলেন, কিছুক্ষণ পরে বলিলেন, কিন্তু এমনভাবে ভেঙে লুটিয়ে পড়লে তো চলবে না আপনার চক্রবর্তী মশায়। সুনীতির দিকে, ছেলের দিকে একবার তাকিয়ে দেখুন তো তাদের মুখ।
বুক ফেটে যায় রায়-গিন্নী, বুক ফেটে যায়। কিন্তু কি করব বলুন, আমার উপায় নেই।
উপায় আপনাকে করতে হবে, উঠে দাঁড়াতে হবে।
কি করে উঠে দাঁড়াব? দিনের আলোতে আমার চোখে অসহ্য যন্ত্রণা, তার ওপরে, আপনার কাছে গোপন করব না, রায়-গিন্নী, হাতে আমার কুষ্ঠ হয়েছে।
হেমাঙ্গিনী স্তম্ভিত হইয়া গেলেন।
রামেশ্বর বলিলেন, এরা কেউ বিশ্বাস করে না; কবরেজ বলেন না, ডাক্তার বলেন, না। রক্তপরীক্ষা ক’রে তারা বলে, না; সুনীতি বলে, না। মূর্খ সব। রায়-গিন্নী, ভগবানের বিধানের দুর্জ্ঞেয় রহস্য এরা বোঝে না। আয়ুর্বেদে আছে কি জানেন? যেখানে মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী, রোগ যেখানে কর্মফল, সেখানে চিকিৎসকের ভুল হবে। একবার নয়, শতবার দেখলে শতবার ভুল হবে।
হেমাঙ্গিনী সতর্ক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে রামেশ্বরের সর্বাঙ্গ দেখিতেছিলেন, কোথাও একবিন্দু বিকৃতি তিনি দেখিতে পাইলেন না। তিনি শুনিয়াছিলেন, আজ প্রত্যক্ষ বুঝিলেন, রোগের ধারণাই মস্তিষ্কবিকৃতির উপসর্গ। বলিলেন, না চক্রবর্তী মশায়, এ আপনার মনের ভুল। কই কোথাও তো একবিন্দু কিছু নাই।
হাতের দশটা আঙুল প্রসারিত করিয়া দিয়া রামেশ্বর বলিলেন, এই আঙুলে আঙুলে।
অহীন্দ্রের খাওয়া প্রায় শেষ হইয়া আসিয়াছিল। সুনীতি একটা পাখা লইয়া বাতাস করিতেছিলেন। হেমাঙ্গিনী উপর হইতে নামিয়া আসিলেন, বলিলেন, আজ তা হ’লে আসি ভাই।
সুনীতি বলিলেন, সারাক্ষণ নন্দাইয়ের সঙ্গেই বসে গল্প করলেন, আমার কাছে একটু বসবেন না দিদি?
হেমাঙ্গিনী বলিলেন, তোমার সঙ্গে যে কত গল্প করতে সাধ, সে কথা আর একদিন বলব সুনীতি। চক্রবর্তী মশায় যখন তোমাকে বিয়ে করে আনলেন, তখন তোমার ওপরই রাগ হয়েছিল। অকারণ রাগ। তারপর যত দেখলাম, ততই তোমার সঙ্গে কথা বলে তোমাকে বুকে জড়িয়ে ধরতে সাধ হয়েছে। সে অনেক কথা, পরে একদিন বলব। আজ যাই, বুঝতেই তো পারছ লুকিয়ে এসেছি। তবে একটা কথা বলে যাই, যেটা বলতে আমার আসা। তুমি ভাই মজুমদারকে সরাও। ওঁর কাছে আমি শুনেছি, সম্পত্তি ও-ই নিজে বেনাম করে ডেকেছে।
সুনীতি একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন, জানি দিদি। আমি ওঁকে জবাবও দিয়েছি। কিন্তু আশ্চর্যের কথা কি জানেন, তবুও উনি আসছেন, না বললেও কাজকর্ম করে দিয়ে যাচ্ছেন।
হেমাঙ্গিনী বলিলেন, সে ও বন্ধ করা দরকার বোন, যে এমন বিশ্বাসঘাতক হতে পারে, তাকে বিশ্বাস কি?
এখন বার বার বলছেন, চরটা বেচে ফেলুন, অনেক টাকা হবে।
না, এমন কাজও করো না ভাই। আমি ওঁর কাছে শুনেছি, চরটায় তোমাদের অনেক লাভ হবে, আয় বাড়বে।
কিন্তু চর নিয়ে যে গ্রাম জুড়ে বিবাদ দিদি, আমি কেমন করে সে সব সামলাব? আর বিবাদ না মিটলেই বা বন্দোবস্ত করব কি করে বলুন?
সাঁওতালদের ডেকে তোমরা খাজনা আদায় করে নাও সুনীতি। আমি এইটুকু বলে গেলাম যে, তোমার দাদা আর কোন আপত্তি তুলবেন না। আর কেউ যদি তোলে, তবে তাতেও তিনি তোমাকেই সাহায্য করবেন।
সুনীতি কৃতজ্ঞ দৃষ্টিতে হেমাঙ্গিনীর দিকে চাহিয়া বলিলেন, তাঁকে আমার প্রণাম দেবেন দিদি, বলবেন
বাধা দিয়ে হেমাঙ্গিনী বলিলেন, পারব না ভাই। বললাম তো লুকিয়ে এসেছি।
***
মানদা ঝি যায় নি, বাড়িঘর নাই বলিয়া এখানেই এখনও রহিয়াছে। আপনার কাজগুলি সে নিয়মিতই করে। সুনীতি আপত্তি করিলেও শোনে না। বরং কাজ তাহার এখন বাড়িয়া গিয়াছে, বাড়াইয়াছে সে নিজেই। সদর কাছারি বাড়ির চাকর চলিয়া গিয়াছে, নায়েবও নাই, কিন্তু তবুও অনেক পরিস্কারের প্রয়োজন আছে। সে প্রয়োজন সে নিজেই আবিস্কার করিয়া কাজটি আপনার ঘাড়ে লইয়াছে। তাহার উপর সকালে সন্ধ্যায় দুয়ারে জল, প্রদীপের আলো, ধূপের ধোঁয়া এগুলো তো না দিলেই নয়। হিন্দুর বাড়ি, মা লক্ষ্মী রুষ্ট হইবেন যে!
সুনীতি আপত্তি করিয়াছিলেন, কিন্তু মানদা বলিয়াছিল, যতদিন আছি আমি করি তারপর আপনার যা খুশি হয় করবেন। আপনি যদি তখন নিজে হাতে গোবর মেখে ঘুঁটে দেন পয়সা বাঁচাবার জন্যে–দেবেন, আমি তো আর দেখতে আসব না।
কাছারি বাড়ি সে পরিস্কার করে দিনে দ্বিপ্রহরে; খাওয়া-দাওয়ার পর মানুষের একটা বিশ্রামের সময় আছে, এই সময়টার বাহিরে লোকজন থাকে না, সেই অবসরে নিত্য কাজটা সারিয়া লয়। লজ্জাটা তাহার নিজের জন্য নয়, চাকরের বদলে ঝি কাছারি সাফ করিলে অন্য কেহ কিছু না বলুক, ওই রায়-বাড়ির ছেলেগুলি হয়তো ছড়া বাঁধিয়া বসিবে। সেদিন সে তক্তপোশের উপর পাতা ফরাশ হইতে আরম্ভ করিয়া মেঝে পর্যন্ত সমস্ত পরিপাটী করিয়া ঝাঁট দিতেছিল, আর গুনগুন করিয়া গান গাহিতেছিল। এতবড় নির্জন ঘরগুলোর মধ্যে একা একা কাজ করিতে করিতে কেমন গান পাইয়া বসে। দুই-একবার বড় আয়নাটার সম্মুখে দাঁড়াইয়া জিভ ও ঠোঁট বাহির করিয়া দেখে, পানের রসটা কেমন ঘোরালো হইয়াছে। স্নানের পর হইতেই চুল খোলা থাকে, খোলা চুলও এই সময়ে বাঁধিয়া লয়। আজ সহসা তাহার গান থামিয়া গেল, অনেক লোক যেন কাছারির বাহিরের প্রাঙ্গনে কথা বলিতেছে। ঝাঁট দেওয়া বন্ধ রাখিয়া উঠিয়া খড়খড়ি-দেওয়া দরজাটার খড়খড়ি তুলিয়া সে দেখিল, সাঁওতালেরা দল বাঁধিয়া দাঁড়াইয়া আছে। জনহীন রুদ্ধদ্বার কাছারির দিকে চাহিয়া তাহারা চিন্তিত হইয়া কি বলাবলি করিতেছে। মানদা ঘরের ভিতরে ভিতরেই অন্দরে চলিয়া গিয়া সুনীতিকে বলিল, সাঁওতালরা সব দল বেঁধে এসে দাঁড়িয়ে আছে মা, কি সব বলাবলি করছে। আমি এই গলি গলি গিয়ে ডাকব নায়েবকে?
