থাক এখন।
আচ্ছা, থাক। আর ভাবছি, পাঁচ রকম মিশিয়ে অম্বলের ওষুধ একটা বের করব। বাংলাদেশে এখন অম্বলটাই, মানে ডিসপেপ্ সিয়াটাই হ’ল প্রধান রোগ।
রায় ওকথা গ্রাহ্যই করিলেন না, তিনি ডাকিলেন নায়েবকে, মিত্তির! একবার ননীচোরা পালকে তলব দাও তো, বল জরুরী দরকার। আর–আচ্ছা, আমিই যাচ্ছি ভেতরে। রায় উঠিয়া কাছারি-ঘরের ভিতর চলিয়া গেলেন। নায়েবকে বলিলেন, দুখানা ডেমিতে একটা বন্দোবস্তির পাট্টাকবুলতি করে ফেল। আমরা ননী পালকে কুড়ি বিঘে চর বন্দোবস্ত করছি। ননী আমাদের বরাবর কবুলতি দিচ্ছে।
নায়েব বলিল, যে আজ্ঞে।
ননী পাল একজন সর্বস্বান্ত চাষী। দাঙ্গা-হাঙ্গামায়, ফৌজদারি মকদ্দমায় তাহার যথাসর্বস্ব গিয়াছে, জেলও সে কয়েকবার খাটিয়াছে। এখন করে পানবিড়ি-মুড়ি-মুড়কির দোকান। লোকে বলে, চোরাই মালও নাকি সে সামলাইয়া থাকে, বিশেষ করিয়া চোরাই ধান। একবার দারোগার নাকে কিল মারিয়া সে তাহার নাকটা ভাঙিয়া দিয়াছিল, একবার দুই আনা ধারের জন্য রায়েদেরই ফুলবাড়ির একটি ছেলের সহিত বচসা করিয়া তাহার কান দুইটা মলিয়া দিয়া বলিয়াছিল, এতেই আমার দুআনা শোধ হ’ল। এমনি প্রকৃতির লোক ননীচোরা পাল। রায় কন্টক দিয়া কন্টক তুলিবার ব্যবস্থা করিলেন। বিশ বিঘা জমির জন্য তাঁহাকে জমিদার স্বীকার করিয়া চক্রবর্তীদের সহিত বিবাদ করিতে ননী বিন্দুমাত্র দ্বিধা করিবে না।
এই লইয়া আরও দুই-চারিটি কথা বলিয়া রায় বাহিরে আসিলেন। অচিন্ত্যবাবু তখন কাছারিবাড়ি হইতে বাহির হইয়া যাইতেছিলেন, রায় বলিলেন, চললেন যে?
অচিন্ত্যবাবু সংক্ষেপে বলিলেন, হ্যাঁ।
রায় হাসিয়া বলিলেন, বসুন বসুন, আপনার প্ল্যানটা শোনা যাক।
আজ্ঞে না, দুর্জন আসবার আগেই স্থান ত্যাগ করা ভাল। ননী পালটা বড় সাংঘাতিক লোক। ব্যাটা মেরে বসে!
পাগল নাকি আপনি? দেখছেন, দেওয়ালে কখানা তলোয়ার ঝুলছে?
শিহরিয়া উঠিয়া অচিন্ত্যবাবু বলিলেন, খুলে ফেলুন, খুলে ফেলুন, ওগুলো বড় সাংঘাতিক জিনিস। বাঙালির হাতে অস্ত্র, গভর্মেন্ট অনেক বুঝেই আইন ক’রে কেড়ে নিয়েছে। ওগুলোর লাইসেন্স আছে তো আপনার?
বলিতে বলিতেই তিনি বাহির হইয়া গেলেন। অল্পক্ষণ পরেই কন্যা উমা আপন মনেই হারাধনের দশটি ছেলের ছড়া বলিতে বলিতে আসিয়া ওই ছড়ার সুরেই বলিল, বাবা, আপনাকে মা ডাকছেন, বেলা অনেক হয়েছে স্নান করুন।–বলিয়া খিলখিল করিয়া হাসিয়া উঠিল। আবার হাসি থামাইয়া গম্ভীরভাবে বলিল, কানে কানে একটা কথা বলি বাবা।
উমা মেয়েটি একটু তরঙ্গময়ী। রায় তাহার মুখের কাছে কান পাতিয়া দিলেন। সে ফিসফিস করিয়া বলিল, প-অন্তস্থায়- দন্ত্য সয়ে আকার।
হাসিয়া রায় বলিলেন, আচ্ছা আচ্ছা তুমি বাড়ির মধ্যে চল, আমার যেতে একটু দেরি হবে, তোমার মাকে বল গিয়ে।
উমা প্রশ্ন করিল, কয়ে একার দন্ত্য ন?
কাজ আছে মা।
না, চলুন আপনি।
ছি! ওরকম করে না, কাজ আছে শুনছ না? ওই দেখ লোক এসেছে কাজের জন্যে।
ননী পাল আসিয়া একটি সংক্ষিপ্ত প্রণাম করিয়া দাঁড়াইল। বেঁটেখাটো লোকটি, লোহার মত শক্ত শরীর, চওড়া কপালের নীচেই নাকের উপর একটা খাঁজ; ওই খাঁজটা একটা নিষ্ঠুর হিংস্র মনোভাব তাহার মুখের উপর ফুটাইয়া তুলিয়াছে।
গ্রামে কিন্তু ততক্ষণে ননী পালকে জমি-বন্দোবস্তের সংবাদ রটিয়া গিয়াছে। অচিন্ত্যবাবু গাছগাছড়ার ব্যবসার কল্পনা পরিত্যাগ করিয়া ফেলিয়াছেন।–সর্বনাশ, চরের উপর ব্যাটা কোন্ দিন খুন ক’রেই দেবে আমাকে।
.
হেমাঙ্গিনী স্বামীর জন্য প্রতীক্ষা করিয়া বসিয়া ছিলেন। কাজ শেষ করিয়া স্নান সারিয়া রায় যখন ঘরে প্রবেশ করিলেন, তখন প্রায় দুপুর গড়াইয়া গিয়াছে। স্বামীর পূজা-আহ্নিকের আসনের পাশে বসিয়া বাহিরের দিকে চাহিয়া হেমাঙ্গিনী কি যেন ভাবিতেছিলেন। রায়কে দেখিয়া বলিলেন, এত বেলা কি করে! খাবেন কখন আর?
রায় পত্নীর মনোরঞ্জনের জন্যই অকারণে একটু হাসিয়া বলিলেন, হ্যাঁ, দেরি একটু হয়ে গেল। জরুরী কাজ ছিল একটা।
বেশ, স্নান-আহ্নিক সেরে নাও দেখি আগে। এখন পর্যন্ত বাড়ির কারও খাওয়া হয় নি। উমাই কেবল খেয়েছে
স্নান সারিয়া রায় আহ্নিকে বসিলেন। তারা, তারা মা!
আহারাদির পর শয্যায় শুইয়া গড়গড়ায় মৃদু মৃদু টান দিতেছিলেন। সমস্ত বাড়িটা একরূপ নিশ্চিন্ত হইয়াছে। বাহিরে চৈত্রের রৌদ্র তরল বহ্ন্যুত্তাপের মত অসহ্য না হইলেও প্রখর হইয়া উঠিয়াছে, পাখিরা এখন হইতেই এ সময় ঘনপল্লব গাছের মধ্যে বিশ্রাম শুরু করিয়া দিয়াছে। বাড়ির বারান্দায় মাথায় ঘুলঘুলিতে বসিয়া পায়রাগুলি গুঞ্জন করিতেছে। মধ্যে মধ্যে রুদ্ধদ্বার জানলায় খড়খড়ি দিয়া উত্তপ্ত এক-একটা দমকা বাতাস আসিতেছে; উত্তপ্ত বাতাসের মধ্যে বয়রা ও মহুয়া ফুলের উগ্র মাদক গন্ধ। বাহিরে ঝরঝর সরসর শব্দে বাতাসে ঝরা পাতা উড়িয়া চলিয়াছে। সূর্য আর পবন দেবতার খেলা চলিতেছে বাহিরে। দুইটি কিশোরের মিতালির লীলা।
হেমাঙ্গিনী ভাঁড়ারে ও লক্ষ্মীর ঘরে চাবি দিয়া আসিয়া স্বামীর শয্যার পার্শ্বে বসিলেন। রায় প্রশ্ন করিলেন, সারা হ’ল সব?
হ’ল।
খুব ক্ষিদে পেয়েছিল, তোমার, না?
হ্যাঁ, খুব। মনে হচ্ছিল, বাড়ির ইঁট-কাট ছাড়িয়ে খাই-হ’ল তো?
