মজুমদার বলিল, আপনার মত ব্যক্তিকে আমার বেশী বলাটা ধৃষ্টতা। গ্রাম জুড়ে বিবাদ হ’লে তো মঙ্গল কারু হবে না। এদিকে কাগজপত্র, কার কি স্বত্ব, এখানকার সমস্ত হাল হদিস আপনার নখদর্পণে, আপনিই এর বিচার করে দিন।
রায় বলিলেন, রামেশ্বরের ছোট ছেলেটি সত্যিই বড় ভাল ছেলে। ক্ষুরের ধারের মত স্বচ্ছন্দে কেটে চলে, কোথাও ঠেকে যায় না। ছেলেটি ওদের বংশের মতও নয় ঠিক, চক্রবর্তীবংশের চুল কটা, চোখ কটা, কিন্তু গায়ের রংটা তামাটে। এ ছেলেটি বোধ হয় মায়ের রং পেয়েছে, না হে?
মজুমদার বলিল, হ্যাঁ, গিন্নী-ঠাকরুন আমাদের রূপবতী ছিলেন এক কালে, আর প্রকৃতিতেও বড় মধুর। ছেলেটি মায়ের মতই বটে, তবে আমাদের কর্তাবাবুর বাপের রং ছিল এমনি গৌরবর্ণ!
হ্যাঁ, সাঁওতালেরা সেইজন্যেই তাঁর নাম দিয়েছিল-রাঙাঠাকুর। একেও নাকি সাঁওতালেরা নাম দিয়েছে রাঙাবাবু?
মাঝির দল এতক্ষণ চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া ছিল, এবার সর্দার কমল মাঝি বলিল, হুঁ, আমি দিলাম সি নামটি। রাঙাঠাকুরের লাতি, তেমূনি আগুনের পারা গায়ের রং-তাথেই আমি বললাম, রাঙাবাবু।
রায় গম্ভীরভাবে চুপ করিয়া রহিলেন, সাঁওতালের কথার উত্তর তিনি দিলেন না। সুযোগ পাইয়া মজুমদার আবার বর্তমান প্রসঙ্গ উত্থাপন করিয়া বলিল, তা হ’লে সেই কথাই হ’ল। গ্রামের সকল শরিককে ডেকে চণ্ডীমণ্ডপে বসে এর মীমাংসা হয়ে যাক। চর যাঁর হবে তিনিই খাজনা নেবেন ওদের কাছে। ওরা এখন যা গরীব দুঃখী লোক, যতক্ষণ খাটবে ততক্ষণ ওদের অন্ন।–বলিয়া রায় কোন কথা বলিবার পূর্বেই মজুমদার মাঝিদের বলিয়া দিল, যা, তাই তোরা এখন বাড়ি গিয়ে আপন আপন কাজকর্মে করগে। আমরা সব নিজেরা ঠিক করি কে খাজনা পাবে, তাকেই তোরা কবুলতি দিবি, খাজনা দিবি।
মাঝির দল প্রণাম করিয়া তাহাদের নিজস্ব ভাষায় বোধ করি এই প্রসঙ্গ লইয়াই কলকল করিতে করিতে চলিয়া গেল। রায় গম্ভীর মুখে একই দিকে দৃষ্টি রাখিয়া বসিয়া ছিলেন বসিয়া রহিলেন। সাঁওতালের দল বাহির হইয়া গেলে তিনি বলিলেন, সেই ভাল মজুমদার, ও বেচারাদের কষ্ট দিয়ে লাভ কি, যাক ওরা। আগে এই বিবাদের মীমাংসাই হয়ে যাক
আজ্ঞে হ্যাঁ, একদিন গ্রামের সমস্ত শরিককে ডেকে
বাধা দিয়া রায় বলিলেন, শরিকরা তো তৃতীয় পক্ষ, সর্বাগ্রে হোক ছোট তরফ আর চক্রবর্তীদের মধ্যে।
বেশ, তাই হোক। একদিন প্রমাণ-প্রয়োগ দেখুন, তাতে যা বলে দেবেন, তাই হবে।
না। একদিন প্রমাণী লাঠি প্রয়োগ করে, তাতে শক্তিতে যার হবে, সেই নেবে চর। তারপর মামলা মকদ্দমা পরে কথা।
হাতজোড় করিয়া মজুমদার বলিল, না না বাবু, এ কথা কি আপনার মুখে সাজে? আপনি হলেন ও বাড়ির মুরব্বী; ছেলেদের
বাধা দিয়া রায় বলিলেন, ও কথা বলো না মজুমদার। বার বার আমার অপমান তুমি ক’রো না। ওকথা মনে পড়লে আমার বুকের ভেতর আগুন জ্বলে ওঠে।
মজুমদার স্তব্ধ হইয়া গেল; কিছুক্ষণ পর আবার সবিনয়ে বলিল, আপনি বিজ্ঞ বিবেচক ব্যক্তি, বড়লোক; আপনার চাকর বলেই সাহস করে বলছি, এ আগুন কি জ্বেলে রাখা ভাল বাবু?
অস্থির হইয়া বার বার ঘাড় নাড়িয়া রায় বলিল, রাবণের চিতা মজুমদার ও নিববে না, নেববার নয়।
মজুমদার আর কথা না বাড়াইল না, তাহার চিত্তও ক্ষুব্ধ হইয়া উঠিয়াছিল। আপন প্রভুবংশের মানমর্যাদা আর সে খাটো করিতে পারিল না, সবিনয়ে হেঁট হইয়া রায়কে প্রণাম করিয়া এবার বলিল, আজ্ঞে বেশ। আপনি যেমন আদেশ করলেন, তেমনি হবে।
রায় বলিলেন, ব’সো। বেলা অনেক হয়েছে, একটু শরবৎ খেয়ে যাও। না খেলে আমি দুঃখ পাব মজুমদার।
মজুমদার আবার আসন গ্রহণ করিয়া বলিল, আজ্ঞে, এ তো আমার চেয়ে খাবার ঘর।
মজুমদার চলিয়া গেল। রায় গভীর চিন্তায় মগ্ন হইয়া গেলেন। কুক্ষণে অহীন্দ্র তাঁহার সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইয়াছিল। রাধারাণীর সুপ্ত স্মৃতি সুপ্তি ভাঙিয়া জাগিয়া উঠিয়াছে। সঙ্গে সঙ্গে চক্রবর্তীদের উপর দারুণ আক্রোশে ও ক্রোধে তিনি ফুলিয়া ফুলিয়া উঠিতেছেন। রামেশ্বরের মস্তিষ্কবিকৃতি দৃষ্টি রুগ্ন হওয়ার পর তিনি শান্ত হইয়াছিলেন। আবার ওই চর উপলক্ষ্য করিয়া অহীন্দ্র তাঁহার সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইতেই সে আক্রোশ আবার জাগিয়া উঠিয়াছে। রাধারাণীর সপত্নীপুত্রের জন্য তিনি পথ ছাড়িয়া দিবেন? আজ এই ছেলেটি যদি রাধারাণীর হইত, তবে অমনি দ্বন্দের অভিনয় করিয়া তিনি গোপনে হাসিতে হাসিতে পরাজয় স্বীকার করিয়া ঘরে ঢুকিতেন। লোকে বলিত ইন্দ্র রায় ভাগিনেয়ের কাছে পরাজিত হইল। এ ক্ষেত্রে, পরাজয়ে রাধারাণীর গৃহত্যাগের লজ্জা দ্বিগুণিত হইয়া লোকসমাজে তাঁহার মাথাটা ধুলায় লুটাইয়া দিবে। আর তাঁহার সরিয়া দাঁড়ানোর অর্থই হইল রাধারাণীর সপত্নীপুত্রের পথ নিষ্কন্টক করিয়া দেওয়া।
অচিন্ত্যবাবু রায়বাড়ির ভিতর হইতেই বাহির হইয়া আসিলেন। রায়ের দশ বৎসরের কন্যা উমাকে তিনি পড়াইয়া থাকেন। উমাকে পড়াইয়া কাছারিতে আসিয়া রায়ের সম্মুখে তক্তপোশটার উপর বসিয়া বলিলেন, চমৎকার একটা প্ল্যান করে ফেলেছি রায় মশায়। দেশী গাছ গাছড়া সাপ্লাইয়ের ব্যবসা। চরটার ওপর নাকি হরেক রকমের গাছগাছড়া আছে। যা শুনলাম, তাতে শতকরা দু’শ লাভ। দেখবেন নাকি হিসেবটা
