রায় হাসিয়া বলিলেন, রাগটুকু আছে খুব!
হেমাঙ্গিনী বলিলেন, দেখ, একটা কথা বলছিলাম।
বল।
বলছিলাম, আর কেন?
রায় ওইটুকুতেই সব বুঝিলেন, তিনি একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া পাশ ফিরিয়া শুইলেন, কোন উত্তর দিলেন না। রামেশ্বরের প্রতি হেমাঙ্গিনীর স্নেহের কথা তিনি জানেন। সে স্নেহ হেমাঙ্গিনী আজও ভুলিতে পারেন নাই।
হেমাঙ্গিনী একটু অপ্রতিভের মতই বলিলেন, মুখ ফিরিয়ে শুলে যে? ভাল, ও কথা আর বলব না! এখন আর একটা কথা বলি, শোন। এটা আমার না বললেই নয়।
ফিরিয়াই রায় বলিলেন, বল।
দৃঢ়তার সহিত হেমাঙ্গিনী বলিলেন, বিবাদ করবে, কর, কিন্তু অন্যায় অধর্ম তুমি করতে পাবে না। আমার অনেকগুলি সন্তান গিয়ে অবশিষ্ট অমল আর উমা; ওদের অমঙ্গল আমি হ’তে দিতে পারব না।
রায় এবার সঙ্কুচিত হইয়া পড়িলেন। তাঁহার কয়েকটি সন্তানই শৈশব অতিক্রম করিয়া বালক হইয়া মারা গিয়াছে। তাহাদের অকালমৃত্যুর হেতু বিশ্লেষণ করিতে বসিয়া হেমাঙ্গিনী যখন তাহার পাপপুণ্যের হিসাব করিতে বসেন, তখন তাঁহার মাথাটা যেন মাটিতে ঠেকিয়া যায়।
হেমাঙ্গিনী বলিলেন, আমাকে ছুঁয়ে তুমি শপথ কর, কোন অন্যায় অধর্ম তুমি করবে না?
রায় দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন, কেন তুমি প্রতি কাজে ওই কথা স্মরণ করিরে দাও, বল তো?
রুদ্ধকণ্ঠে হেমাঙ্গিনী বলিলেন, এতগুলো সন্তান যাওয়ার দুঃখ যে রাবণের চিতার মত আমার বুকে জ্বলছে। তুমি ভুলেছ, কিন্তু আমি তো ভুলতে পারি না। তাই তোমাকে মনে করিয়ে দিতে হয়।
রায় উঠিয়া বসিলেন, জানলাটা খুলে দাও দেখি। বেলা বোধ হয় পড়ে এল।
হেমাঙ্গিনী জানলা খুলিয়া দিলেন, রোদ অনেকটা পড়িয়া আসিয়াছে, পাখিরা থাকিয়া থাকিয়া সমবেত স্বরে ডাকিয়া উঠিতেছে, বিশ্রাম তাহাদের শেষ হইয়া গেল- এ ইঙ্গিত তাহারই। রায় জানলা দিয়া নদীর ওপারে ওই চরটার দিকে চাহিয়া ভাবিতে ছিলেন ওই কথাই। অমল-উমা, রাধারানী-রামেশ্বর, রায়-বাড়ি। এ কি দ্বিধার মধ্যে তাঁহাকে টানিয়া আনিয়া নিক্ষেপ করিল হেমাঙ্গিনী!
হেমাঙ্গিনী বলিলেন, বল।
রায় দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন, তাই হবে। তিনি স্থির করিলেন, অপরাহ্নেই ননীকে ডাকাইয়া পাট্টা কবুলতি স্বহস্তে নাকচ করিয়া দিবেন।
হেমাঙ্গিনী চোখ মুছিতে মুছিতে বাহির হইয়া গেলেন, বোধ করি আবেগ তাঁর ধৈর্য্যের কূল ছাপাইয়া উঠিতে চাহিতেছিল। রায় নীরবে ওই চরের দিকে চাহিয়াই বসিয়া রহিলেন। মনটা কেমন উদাস হইয়া গিয়াছে। দীপ্ত সূর্যালোকের কালীর বালি ঝিকমিক করিতেছে। চরের উপরে বেনাঘাস দমকা বাতাসে হাজার হাজার সাপের ফণার মত নাচিতেছে। আকাশ ধূসর। এত বড় প্রান্তরের মধ্যে কোথাও একটা মানুষ দেখা যায় না। অথচ মাটি লইয়া মানুষের কাড়াকাড়ি সেই সৃষ্টির আদিকাল হইতে চলিয়া আসিতেছে, কোন কালেও বোধ করি এ কাড়াকাড়ির শেষ হইবে না। নাঃ, ভাল বলিয়াছে হেমাঙ্গিনী-কাজ নাই; রায়হাটের সঙ্গে রায়বাড়ি না হয় কালীর গর্ভেই যাইবে। ক্ষতি কি!
হেমাঙ্গিনী ফিরিয়া আসিলেন, অত্যন্ত সহজ স্বাভাবিকভাবে বলিলেন, অমলকে টাকা পাঠিয়েছ?
অমল মামার বাড়িতে থাকিয়া পড়ে। রায় অন্যমনস্কভাবেই বলিলেন, পাঠিয়েছি।
দেখ।
বল।
এ দিকে ফিরেই চাও। দোষ তো কিছু করি নি আমি।
অল্প একটু হাস্যের সহিত মুখ ফিরাইয়া রায় বলিলেন, না, তুমি ভালই বলেছ। আর কি হুকুম, বল?
উমাকে আমি দাদার ওখানে পাঠিয়ে দেব। শহরে থেকে একটু লেখাপড়া শিখবে, একটু সহবৎ শিখবে। জামাই আমি ভাল করব। এখানে থাকলে গেঁয়ো মেয়ের মত ঝগড়া শিখবে, আর যত রাজ্যের পাকামো।
রায় বলিলেন, হ্যাঁ, রায়-বাড়ির মেয়ের অখ্যাতিটা আছে বটে। তাঁহার মুখে এক বিচিত্র করুণ হাসি ফুটিয়া উঠিল। মনে পড়িয়া গেল সেদিনের কথা, রামেশ্বরের পিতামহী বলিয়াছিলেন রাধারানীর প্রসঙ্গে, রায় বাড়ির মেয়ের ধারাই ওই, চিরকেলে জাঁহাবাজ!
হেমাঙ্গিনী স্বামীর মুখের দেখিয়া বুঝিলেন, স্বামী কথাটায় আহত হইয়াছেন, তিনি অপ্রতিভ হইয়া স্বামীর মনোরঞ্জনের জন্য ব্যাকুল হইয়া দুই হাতে তাঁহার গলা জড়াইয়া ধরিয়া বলিলেন, রাগ করলে?
পত্নীর কণ্ঠে সাদরে একখানি হাত ন্যস্ত করিয়া রায় তাঁহার মুখের দিকে চাহিয়া বলিলেন, না না, তুমি সত্য কথা বলেছ।
প্রৌঢ়-দম্পতির উভয়ের চোখে অনুরাগভরা দৃষ্টি। কিন্তু সহসা চমকাইয়া উঠিয়া দুইজনেই পরস্পরকে ছাড়িয়া দিলেন। এ কি, এত গোলমাল কিসের? গ্রামের মধ্যে কোথাও একটা প্রচণ্ড কলরব উঠিতেছে! কোথাও আগুন লাগলো নাকি? রায় বিছানা ছাড়িয়া নামিয়া ব্যস্ত হইয়া কাপড় চোপড় ছাড়িতে আরম্ভ করিলেন।
কর্তাবাবু!–নীচে কে ডাকিল, নায়েব মিত্র বলিয়াই মনে হইতেছে।
কে? মিত্তির?
আজ্ঞে হ্যাঁ।
গোলমাল কিসের মিত্তির?
আজ্ঞে, রামেশ্বরবাবুর বড় ছেলে মহীন্দ্রবাবু ননী পালকে গুলি করে মেরে ফেলেছেন।
রায় কাপড় পরিতেছিলেন, সহসা তাঁহার হাত স্তব্ধ হইয়া গেল, তিনি অদ্ভুত দৃষ্টিতে হেমাঙ্গিনীর মুখের দিকে চাহিলেন। হেমাঙ্গিনীর চোখ দিয়া জল ঝরিয়া পড়িতেছিল, তিনি বলিলেন, তুমি করলে কি? ছি ছি!
রায় দ্রুতপদে নামিয়া গেলেন।
.
০৭.
মহীন্দ্র যোগেশ মজুমদারকে সঙ্গে লইয়া, পূর্বদিন রাত্রেই আসিয়া পৌঁছাইয়াছিল। বার্তা নাকি বায়ুর আগে পৌঁছিয়া থাকে- এ কথাটা সম্পূর্ণ সত্য না হইলেও মিথ্যা বলিয়া একেবারেই অস্বীকার করা চলে না। পঞ্চাশ মাইল দূরে বর্হিজগতের সহিত ঘনিষ্ঠসম্পর্কহীন একখানি পল্লীগ্রামেও কেমন করিয়া কথাটা গিয়া পৌঁছিল, তাহা ভাবিলে সত্যই বিস্মিত হইতে হয়। সুনীতির পত্রও তখন গিয়া পৌঁছে নাই। সরীসৃপ-সঙ্কুল জঙ্গলে পরিপূর্ণ চরটার নাকি সাঁওতালরা আসিয়া সব সাফ করিয়া ফেলিয়াছে, আশেপাশের চাষীরা নাকি চরের মাটি দেখিয়া বন্দোবস্ত লইবার জন্য পাগল হইয়া উঠিয়াছে; এমন কি শহর-বাজার হইতে সঙ্গতিপন্ন লোকেও চরের জমি বন্দোবস্ত পাইবার জন্য প্রচুর সেলাম দিতে চাহিতেছে-এমনিধারা স্ফীত-কলেবর অনেক সংবাদ। শেষ এবং সর্বাপেক্ষা গুরুতর সংবাদ-চর দখল করিবার জন্য রায়-বংশীয়েরা কৌরবের মত একাদশ অক্ষৌহিনী সমাবেশের আয়োজন করিতেছে; চক্রবর্তী-বাড়ির কাহাকেও নাকি ও-চরের মাটিতে পদার্পণ করিবার পর্যন্ত অধিকার দেওয়া হইবে না।
