হেমাঙ্গিনী রাগ করিয়া উঠিয়া গেলেন, যাইবার সময় বলিলেন, ছেলের মায়ের মতটা তো মানতে হবে। যত খাতিরই তোমাকে সুনীতি করুক, তুমি মেয়ের বাপ, সে ছেলের মা।
রায় হাসিয়া পাঁজি খুলিয়া বসিলেন।
ফাল্গুনের প্রথম সপ্তাহেই বিবাহের দিন পাওয়া গেল, শুক্লা ত্রয়োদশী তিথি। রায় উৎসব-আয়োজনের ত্রুটি রাখিলেন না; গ্রামস্থ লোক, প্রজা সজ্জন সমস্ত নিমন্ত্রিত হইল।
সাঁওতালদেরও সমস্ত দলটিকে বরযাত্রী যাইবার জন্য নিমন্ত্রণ করা হইল। কিন্তু তাহারা কেহ আসিল না।
অচিন্ত্যবাবু আসিয়াছিলেন, তিনি ফিসফিস করিয়া বলইলেন, বারণ করে দিয়েছে মশায়। যে আসবে, তার জরিমানা হবে।
চক্রবর্তী-বাড়ির নায়েব বিস্মিত হইয়া প্রশ্ন করিল, বারণ করে দিয়েছে! কে? জরিমানাই বা কে করবে শুনি?
মুখার্জি সাহেব-মিস্টার মুখার্জি।
নায়েব গম্ভীরভাবে ডাকিল, কে রয়েছিস রে, বাগদী পাইকদের ডাক্ তো এখানে।
অচিন্ত্যবাবু বলিলেন, ঠকবেন মশায়, ঠকবেন। এমন কাজটি করবেন না। সাঁওতালদের প্রজাই-স্বত্ব এখন মুখার্জি সায়েবের। তারা এখন মুখার্জি সায়েবের প্রজা। আপনাদের প্রজা হল মুখার্জি সায়েব, সাঁওতালরা মুখার্জি সায়েবের প্রজা, মজুর, আশ্রিত, তিনিই এখন ওদের মা-বাপ, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর সব।
কথাটা অহীন্দ্রের কানেও উঠিল। বরবেশে চতুর্দোলে বসিয়া, কুঞ্চিত ললাটে সে জ্যোৎস্নার আলোকে আলোকিত চরখানির দিকে চাহিয়া দেখিয়া, গভীর বেদনা অনুভব করিল। দলিলের কৌশলে সাঁওতালদের বিচিছন্ন করিয়া লইল। জাল দলিলে মানুষ বিকাইয়া গেল।
রাঙা ইঁটের তৈয়ারী সুদীর্ঘ চিমনিটা শাসনরত তর্জনীর মত উদ্যত হইয়া আছে।
ও-দিকে সংবাদটা শুনিয়া ইন্দ্র রায় সারাদিনের উপবাসে পরিশ্রমে ক্লান্ত দেহখানিকে টানিয়া মুহূর্তে সোজা হইয়া উঠিয়া দাঁড়াইলেন। কিন্তু তিনি কিছু বলিবার বা করিবার পূর্বেই হেমাঙ্গিনী আসিয়া মৃদুস্বরে বলিলেন, আজ তুমি কিছু করতে পাবে না, আজ আমার উমার বিয়ে।
.
২৯.
ইন্দ্র রায় বউভাত উপলক্ষ করিয়া আবার সাঁওতালদের নিমন্ত্রণ করিলেন।
কিন্তু সে নিমন্ত্রণও সাঁওতালরা গ্রহণ করিতে সাহস করিল না। শুভার্থী সকলেই নিষেধ করিয়াছিল, হেমাঙ্গিনী বার বার বলিয়াছিলেন, দেখ আমি বারণ করছি, ও তুমি করো না। বিয়ের রাত্রে যখন আসতে দেয় নি ওদের, তখন আবার নেমন্তন্ন করে বেচারাদের বিপদে ফেলা কেন? ‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়।
সুনীতি সকরুণ দৃষ্টিতে চাহিয়া বলিয়াছিলেন, ঝগড়া বিবাদ করে কাজ নেই দাদা।
ইন্দ্র রায় কাহারও কথায় কর্ণপাত করিলেন না, চোখ বুঝিয়া গভীর চিন্তায় কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ থাকিয়া ধীরভাবে ঘাড় নাড়িয়া অনুরোধ অস্বীকার করিলেন, বলিলেন, উলুখাগড়ার প্রাণ যায় বলে দুঃখ করছ, কিন্তু ও মিথ্যে দুঃখ। এমনি ভাবে মরবার জন্যেই উলুখাগড়ার সৃষ্টি। তিনি হাসিলেন।
হেমাঙ্গিনী, সুনীতি দুজনেই ইন্দ্র রায়ের হাসির ভঙ্গি দেখিয়া নীরব হইয়া রহিলেন; ক্ষুরের মতই ক্ষুদ্ৰপরিসর এবং মর্মান্তিক তীক্ষ্ণধার সে হাসি। ধীরে ধীরে সে হাসিটুকু রায়ের মুখ হইতে মিলাইয়া গেল। গম্ভীরভাবে আবার বলিলেন, এ-সংসারে যার ইজ্জত নেই, তার জাত নেই। এ হল চক্রবর্তী-বাড়ি রায় বাড়ির ইজ্জত নিয়ে কথা, এ ব্যাপারে তোমরা কথা বলো না।
তিনি ও-পারের চরে নিমন্ত্রণ পাঠাইলেন, শুধু সাঁওতালদের নিকটই নয়, চরের সকলের নিকট- এমন কি বিমলবাবুর নিকট পর্যন্ত। নিমন্ত্রণ লইয়া গেল একজন গোমস্তা ও একজন পাইক। বিমলবাবু ব্যাতীত সকলের নিকট মৌখিক নিমন্ত্রণই পাঠানো হইল, কেবল বিমলবাবুর নিকট পাঠানো হইল একখানি পত্র।
চূড়া মাঝি বিব্রত হইয়া কিছুক্ষণ চুপ করিয়া দাঁড়াইয়া রহিল; অন্যান্য সাঁওতালরা নীরব চিন্তান্বিত মুখে চূড়ার দিকে চাহিয়া রহিল, মুখরা মেয়েগুলি শুধু মৃদুস্বরে আপনাদের মধ্যে দুই-চারিটা কথাবার্তা আরম্ভ করিয়া দিল।
গোমস্তাটি বলিল, যাস যেন সব, বুঝলি?
এতক্ষণে চূড়া বলিল, কি করে যাব গো বাবু? দু বেলা খাটতে হচ্ছে যি সাহেবের কলে।
গোমস্তা একটু হাসিয়া বলিল, ভাল। যাস নে তা হলে। আর কোন কথা না বলিয়া সে চলিয়া আসিল। কিছুদূর সে আসিয়াছে এমন সময় পিছন হইতে চূড়া তাহাকে ডাকিল, বাবু মশায়! গোমস্তাবাবু!
কি?
বাবু মশায়, সায়েব যি রাগ করেছে গো, বুলছে-তুদের বাড়ি গেলে পরে ইখান থেকে তাঁড়িয়ে দেবে।
আচ্ছা, তাই বলব আমি কর্তাবাবুকে।
চূড়ার বুক ভয়ে কাঁপিয়া উঠিল, সে বলিল, না গো বাবু মশায়; তা বুলিস না গো; সায়েব রাগ করবে গো।
গোমস্তা কোন উত্তর দিল না, অতি অবজ্ঞা ও ঘৃণার হাসি হাসিয়া সে চলিয়া গেল। চূড়া হতভম্বের মত দাঁড়াইয়া রহিল, ভয়ে তাঁহার পা দুইটি ঠকঠক করিয়া কাঁপিতেছে; আঃ, কেন এ কথাটা সে উহাকে বলিল?
সাঁওতালরা আসিল না।
শুধু আসিল না নয়, সন্ধ্যা হইতেই চরের বুকে মাদল, করতাল ও বাঁশীর সমবেত ধ্বনিতে একটি উৎসবের বার্তা ঘোষণা করিয়া দিল। বিমলবাবু পাকা ব্যবসায়ী লোক; এই নিমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করিতে সাঁওতালদের মনঃক্ষুণ্ণতার কথা তিনি বেশ বুঝিয়াছিলেন। তিনি অপরাহ্নে তাহাদের ডাকিয়া প্রচুর পরিমানে মদের এবং দুইটা শূকরের ব্যবস্থা করিয়া দিলেন, বলিলেন খুব নাচগান করতে হবে তোদের।
