হাঁড়িয়ার কথা শুনিয়া প্রথমটা কেহ উৎসাহ প্রকাশ করিল না, চুপ করিয়া এ উহার মুখের দিকে চাহিয়া রহিল।
বিমলবাবু ব্যাপার বুঝিয়াও কোন কথা বলিলেন না, একেবারে অ্যাকাউন্ট্যান্ট অচিন্ত্যবাবুকে ডাকিয়া বলিয়া দিলেন, একখানা দশ টাকার ভাউচার করুন তো। সাঁওতালদের বকশিশ। আর মদের দোকানের ভেণ্ডারকে একখানা স্লিপ লিখে দিন, সাঁওতালদের যে যত মদ খেতে পারে মদ দেয় যেন-আপ-টু-টেন রুপীজ।
টাকাটা হাতে পাইয়া সাঁওতালদের মন ঈষৎ চাঙ্গা হইয়া উঠিল। তারপর মদের দোকানে আসিয়া তাহারা পরস্পরের মধ্যে খানিকটা জোর তর্ক আরম্ভ করিয়া দিল; কেহ কাহারও কথার প্রতিবাদ করিতেছিল না, অথচ উত্তেজিত কলরবে তুমুল তর্ক। সকলেই বলিতেছিল।
রাঙাবাবু কি বুলবে?
উয়ার শ্বশুরটি? বাবা রে বাঘের মতন তাকানি উয়ার। উ কি বুলবে?
রাগ করবে, ধরে লিয়ে যাবে। তখুন কি হবে?
ইধরে সায়েব রাগ করছে। বাবা রে, উ তো কম লয়। উয়ার আবার বন্দুক আছে, মেরে ফেলাবে গুলি দিয়ে।
এই তর্কের মধ্যেই মদ আসিয়া পৌঁছিল। কিছুক্ষণ পর তাহাদের তর্ক ভীষণাকার ধারণ করিল, উচ্চকণ্ঠে আস্ফালন করিয়া সকলেই বলিতেছিল, কি করবে রাঙাবাবুর শ্বশুর আমাদের? আমরা উয়াকে মানি না।
আমাদের সায়েব রইছে, উয়াকেই আমরা মানব, হেঁ।
অতঃপর মেয়েদের জন্য প্রকাণ্ড জালাতে করিয়া মদ লইয়া তাহারা পাড়ায় ফিরিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই মাদল-করতাল-বাঁশী বাজাইয়া প্রচণ্ড উৎসাহে নাচগান জুড়িয়া দিল।
***
ও-দিকে বউভাতের খাওয়ান-দাওয়ানের জের তখনও মেটে নাই, তবে প্রধান অংশ শেষ হইয়া আসিয়াছিল। ইন্দ্র রায় এখন কেবল পরিবেশনকারীর দল ও ঠাকুর-চাকরদের খাওয়ানোর তদারক করিতেছেন। মাদল-করতাল-বাঁশীর উচ্ছ্বসিত ধ্বনি আসিয়া কানে প্রবেশ করিতেই তিনি গম্ভীর হইয়া উঠিলেন। মনে মনে ব্যাপারটা তিনি অনুমান করিয়া লইলেন।
অমল কর্মান্তরে ব্যস্ত ছিল, তাহাকে ডাকিয়া খাওয়ান-দাওয়ানের ভার দিয়া তিনি রামেশ্বরের ঘরের গিয়া প্রবেশ করিলেন। রামেশ্বর খোলা জানলায় দাঁড়াইয়া কৃষ্ণা-দ্বিতীয়ার প্রায়-পূর্ণচন্দ্রের পরিপূর্ণ জ্যোৎস্নায় আলোকিত উন্মত্ত সঙ্গীত-মুখর ওই চরটার দিকেই চাহিয়া ছিলেন।
রায় ডাকিলেন, রামেশ্বর!
রামেশ্বর চমকিয়া উঠিয়া ফিরিয়া দাঁড়াইলেন, কে?
আমি ইন্দ্র।
ইন্দ্র! এস, এস ভাই। খাওয়া-দাওয়ান সব হয়ে গেল?
হ্যাঁ। আমি নিজে দাঁড়িয়ে সব শেষ করে তোমার কাছে আসছি। যারা কাজকর্ম করেছে, তারাই খাচ্ছে। এখন; অমল দাঁড়িয়ে দেখছে সেখানে।
রামেশ্বর অত্যন্ত ব্যস্ত হইয়া ডাকিলেন, বউমা! বউমা!
রায় হাসিলেন, উমার শ্বশুর উমাকে ডাকিতেছেন! বধূবেশিনী উমা আসিয়া ঘরে ঢুকিয়া বাবাকে দেখিয়া একটু হাসিল, হাসিয়া শ্বশুরের কাছে দাঁড়াইয়া মৃদুস্বরে বলিল, আমাকে ডাকছিলেন?
রামেশ্বর বলিলেন, হ্যাঁ রে বেটী, হ্যাঁ। আমার মা হয়ে তোর কোন বুদ্ধিসুদ্ধি নেই! দেখছিস না, কে এসেছেন! সমস্ত দিন তোর বাড়িতে খাটলেন, এখনও মুখে জল দেন নি। দে, হাত-পা-মুখ ধোবার জল দে। খাবার জায়গা করে দে। এ ঘরে নয়, অন্য ঘরে-অন্য ঘরে। চকিত তাঁহার দৃষ্টি একবার আপনার হাত দুইখানির দিকে নিবদ্ধ হইয়া আবার ফিরিয়া আসিল।
রায় হাসিয়া বলিলেন, হাত-মুখ আমি ধুয়েছি; খাবার জায়গা করতে নেই, ও থাক!
চকিত হইয়া রামেশ্বর প্রশ্ন করিলেন, কেন, ইন্দ্র খাবার জায়গা করতে নেই কেন?
তুমি একটা মূর্খ। রায় হাসিয়া বলিলেন, কাকে কোলে করে খেতে বসব? দাঁড়াও আমার দাদুভাইয়ের আগমন হোক, তবে তো!
বার বার ঘাড় নাড়িয়া রায়ের কথা স্বীকার করিয়া রামেশ্বর বলিলেন, বটে, বটে। তুমি যেদিন দাদুভাইকে কোলে নিয়ে খেতে বসবে ইন্দ্র, সেদিন যে আমার ঘরের কি শোভাই হবে হে, আমি কল্পনাই করতে পারছি না। কবি কালিদাসও এর উপমা দিয়ে যান নি। কুমার কার্তিকেয়কে গিরিরাজের কোলে দিয়ে তিনি দেখেন নি। সূর্যবংশের রাজারা তো পুত্র উপযুক্ত হলে আর গার্হস্থ্যাশ্রমে থাকতেন না। আমাকেই একটা শ্লোক রচনা করতে হবে দেখছি।
উমা একালের মেয়ে হইলেও বাঙালীর মেয়ে- সে লজ্জায় ঘামিয়া উঠিতেছিল। লজ্জায় রক্তোচ্ছ্বাসে তাহার সুন্দর মুখের প্রসাধন-শুভ্রতাও রক্তাভ হইয়া উঠিয়াছিল, তাহার উপর সারাটা মুখ ভরিয়া বিন্দু বিন্দু ঘাম। ইন্দ্র রায় তাহাকে পরিত্রাণ দিলেন, তিনি বলিলেন, উমা, যা মা, তোর শাশুড়ির খাওয়া-দাওয়া হল কিনা দেখ। তোর মাকেও বল্, একটু তাড়াতাড়ি সেরে নিতে।
উমা পলাইয়া আসিয়া যেন বাঁচিল, ঘর হইতে বাহির হইয়া দরদালানের নির্জনতায় আসিয়া পুলকিত সলজ্জ হাসিতে তাহার মুখ ভরিয়া উঠিল।
বাড়িতে বাহিরের দিকের টানা বারান্দায় রেলিঙের উপর মাথা রাখিয়া সুনীতি স্তব্ধ হইয়া দাঁড়াইয়া ছিলেন। খাওয়া-দাওয়া শেষ হইয়া গেলে তিনি অবসর পাইয়া কাঁদিতে আসিয়া ছিলেন মহীনের জন্য।
তাঁহার মহীন-দীর্ঘদেহ, সবলপেশী, উদ্ধতদৃষ্টি, উন্নতিশির মহীন্দ্র।
প্রথমে তো তাহারই বধূর কল্যাণঘট কাঁখে করিয়া এ-ঘরে প্রবেশ করিবার কথা। অহীন্দ্রের বিবাহে, তাহারই দৃপ্ত উচ্চ আদেশ-ধ্বনিতে এ-বাড়ির প্রতিটি কোণ মুখরিত হইয়া থাকিবার কথা।
এ সর্বনাশ না হইলে হতভাগ্য ননী পালও আজ এ বাড়িতে খাইয়া হাসিমুখে বলিত, আঃ খুব খেলুম বাপু।
