উমা লজ্জায় স্থানুর মত হইয়া না গেলেও সঙ্কুচিত অনেকটুকুই হইল। রক্তাভ মুখে সে নীরবে দাঁড়াইয়া রহিল, হেমাঙ্গিনী ওডিকোলনের পাত্রটি হাতে তুলিয়া দিয়া বলিলেন, তোমার তো লজ্জা করলে চলবে না মা; বাড়িতে একটি ননদ-দেওর নেই যে, তাকে পাঠিয়ে দেবেন তোমার শাশুড়ী। যাও, দিয়ে এস।
উমা পাত্রটি হাতে করিয়া চলিয়া গেল। হেমাঙ্গিনী সুনীতির দিকে চাহিয়া ফিক করিয়া হাসিয়া বলিলেন, এ কি আর আমাদের কাল আছে ভাই? সেকালে আর একালে অনেক তফাত।
সুনীতি মৃদু ম্লান হাসি হাসিলেন, বসিলেন, তারপর বলিলেন, ভাল আর মন্দ ভাই, যে কালের যে ধারা। এরপর আবার কত হবে, নাতি-নাতনীর আমলে বেঁচে থাকলে সেও দেখতে হবে। এ প্রসঙ্গ শেষ করিয়া ক্ষণিক স্তব্ধ থাকিয়া আবার বলিলেন, চল, চক্রবর্তী মশায়কে একবার দেখে আসি। আজই একবার দেখা হয়েছে, তবু যখন এসেছি চল।
অহীন্দ্র চোখ বুজিয়াই শুইয়া ছিল, ঠিক ঘুমায় নাই-কিন্তু সজাগও ঠিক ছিল না। জাগ্রত পৃথিবীর সকল সংস্পর্শকে দূরে সরাইয়া দিয়া সে যেন আপন অন্তরের চিন্তালোকের গভীর-গর্ভ রুদ্ধদ্বার এক কক্ষের মধ্যে স্তব্ধ হইয়া বসিয়া ছিল। অকস্মাৎ কপালের উপর শীতল একটি স্পর্শ যেন করাঘাত করিয়া তাহাকে বাহির। হইতে ডাকিল। উমা আসিয়া তাহাকে ঘুমন্তই মনে করিয়াছিল; ডাকিয়া ঘুম না ভাঙাইয়া সন্তর্পণে ওডিকোলনের পটিটি কপালে বসাইয়া দিয়াছিল।
অহীন্দ্র স্বপ্নচচ্ছন্ন চোখ মেলিয়া উমার মুখের দিকে চাহিল।
উমা লজ্জা পাইল, আরক্তিম মুখে বলিল, ওডিকোলনের পটি! আমি ভেবেছিলাম, ঘুম আর ভাঙাব না।
স্মিত হাসিতে অহীন্দ্রের মুখ ঈষৎ দীপ্ত হইয়া উঠিল, সে বলিল, আমি ঘুমুই নি।
ঘুমোও নি? তবে এমন ভাবে শুয়ে ছিলে যে? মাথা বুঝি খুব ধরেছে?
মাথার যন্ত্রণা অনেকটা কমেছে; কিন্তু মন যেন কেমন vacant হয়ে গেছে।
উমা মৃদু হাসিয়া এবার বলিল, সায়েবলোকের কিন্তু এ-রকম দুর্বল হওয়া উচিত নয়। রাগ দুর্বলচিত্তের একটি লক্ষণ।
অহীন্দ্রের মুখের হাসি এবার আরও একটু উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। সে বলিল, কথাটা তোমার মুখে শোভন হল না, হে বাঙালিনী শ্রীমতি উমা দেবী। যেহেতু স্মরণ কর, পুরাকালে পর্বত দুহিতা উমার প্রিয়তম পরম যোগী শঙ্করেরও একদা ক্রোধ হয়েছিল, যে ক্রোধের অগ্নিতে কাম হয়েছিল ভস্মীভূত।
উমা হাসিয়া বলিল, তুমি কি ওই কলওয়ালাটিকে ভস্মীভূত করতে চাও নাকি?
একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলিয়া অহীন্দ্র বলিল, তখন তাই চেয়েছিলাম। কিন্তু আর তা চাই না। একটু আগে মনকে ওই চিন্তা থেকে মুক্ত করবার জন্যে পড়ছিলাম, রবীন্দ্রনাথের ‘গান্ধারীর আবেদন’, তার কটা লাইন আমাকে পথ দেখিয়ে দিলে। লাইন কটি মুখস্থ হয়ে গেছে আমার–
দণ্ডিতের সাথে–
দণ্ডদাতা কাঁদে যবে সমান আঘাতে,
সর্বশ্রেষ্ট সে বিচার। যার তরে প্রাণ
কোন ব্যাথা নাহি পায়-তারে দণ্ড দান
প্রবলের অত্যাচার।
আমি লোকটাকে শাস্তি দিতে চাই, তার অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চাই, কিন্তু তার ওপর কোন বিদ্বেষ আমি রাখতে চাই না।
অহীন্দ্রের কথাগুলি শুনিতে শুনিতে উমার মুখ উজ্জ্বল হইয়া উঠিল। সে এ যুগের মেয়ে, তাহার তরুণ মন আদর্শের স্বপ্নে উচ্ছ্বসিত হইয়া উঠিল। অহীন্দ্রের গৌরবে সে গরবিনী হইয়া উঠিয়াছে।
ও-দিকে রামেশ্বরের ঘর হইতে ফিরিয়া নীচে নামিবার পথে সিঁড়ির একটি গোপন স্থানে সুনীতি ও হেমাঙ্গিনী আপনা-আপনিই যেন দাঁড়াইয়া উমা ও অহীন্দ্রকে লক্ষ্য করিয়া দেখিতে ছিলেন। হেমাঙ্গিনী আত্মসম্বরণ করিতে পারিলেন না, সুনীতিকে স্পর্শ করিয়া ফিসফিস করয়া বলিলেন, দেখলে?
সুনীতি বলিলেন, ফাজ্জনের প্রথমেই দিন ঠিক করুন দিদি। আমার অদৃষ্টকে আমার সর্বদাই ভয় হয়। আমার সম্বলের মধ্যে অহি। উমার হাতে ওর ভার দিয়ে আমি নিশ্চিন্ত হতে চাই।
***
হেমাঙ্গিনী উৎসাহে ব্যগ্র হইয়া উঠিলেন, রণবাদ্যে উৎসাহিত যুদ্ধের ঘোড়ার মত। ফাল্গুনেই বিবাহ। দিবার জন্য তিনিও ব্যস্ত হইয়া পড়িলেন। বিবাহের মধ্যে যেন একটা কল্পলোকের মাদকতা আছে, পাড়াপড়শি পর্যন্ত নিদ্রা বিসর্জন দিয়া মাতিয়া উঠে, এ-ক্ষেত্রে তো মেয়ের মা এবং ছেলের মা। সুনীতিও সঞ্জীবিত হইয়া উঠিলেন। রায়ের মনেও উৎসাহের সীমা ছিল না। রাধারাণীর অন্তর্ধানের লজ্জায় ক্ষোভে আগুন ধরিয়া পুড়িতে আরম্ভ করিয়াছে, কিন্তু এখনও তাহাতে পূর্ণাহুতি পড়ে নাই। কিন্তু তিনি পুরুষমানুষ, সাত-পাঁচ ভাবিয়া বৈশাখে বিবাহ দিবার সঙ্কল্প করিয়াছিলেন। ফাৰ্জুন ও চৈত্র দুই মাস জমিদারদের দারুণ ঝাটের সময়। বাকিবকেয়া আদায়, বৎসরান্তে আখেরী হিসাবনিকাশ লইয়া মাথা তুলিবার অবসর থাকে না। সেই সব ঝঞ্জাট মিটাইয়া তিনি বৈশাখে বিবাহ দিবার সঙ্কল্প করিয়াছিলেন।
কিন্তু হেমাঙ্গিনী কিছুতেই শুনিবেন না, বলিলেন, বোশেখ মাস গরমের সময়, গা প্যাচ-প্যাচ করবে ঘামে–
বাধা দিয়া রায় হাসিয়া বলিলেন, আমি নিজে তোমার পাংখা-বরদার হব। পাখা নিয়ে পেছনে পেছনে বাতাস করে ফিরব, তা হলে হবে তো?
না। খেয়ে-দেয়ে কোথায় কার বদহজম হবে—
বাড়িতে একটা ডাক্তার আমি বসিয়ে রাখব, খাওয়ার পর প্রত্যেককে একদাগ হজমী ওষুধ দেওয়া হবে।
