সুনীতি বলিলেন, আমি বলি কি অহীন,আমাদের খাসে যে জমিটা আছে, যেটা সাঁওতালরাই ভাগে চাষ করছে, ওইটে ওদের বন্দোবস্ত করে দেওয়া হোক। তা হলে ওদের দুঃখও ঘুচবে, আর কলের মালিককে বুঝিয়ে বলে দিলেই হবে যে, ওটাতে যেন আর তিনি হাত না দেন।
অমল হাসিয়া এবার বলিল, পিসীমার ধর্মটি কিন্তু বড় ভাল। ও ধর্মের মহিমায় সকল সমস্যার সমাধান জলের মত পরিষ্কার হয়ে যায়।
সুনীতি লজ্জা পাইলেন, কিন্তু হেমাঙ্গিনী বলিলেন, পড়িলে ভেড়ার শিঙে ভাঙে রে হীরার ধার! গোঁ ধরা শাক্ত-তান্ত্রিকের বংশ তোমাদের, তোমরা আর এ ধর্মের মহিমা কি বুঝবে বল? ওরে, ও-ধর্ম যদি সকলে বুঝত, তবে কি পৃথিবীতে এত দুঃখ থাকত?
অমল হাসিয়াই উত্তর দিল, সে তো অস্বীকার করছি না মা, কিন্তু পিসিমার ধর্মে মুশকিল কি জান? মুশকিল হচ্ছে, নিঃসম্বল অবস্থায় আর ও-ধর্ম নিয়ে চলা যায় না। মানে, ব্রহ্মাণ্ড যাঁর উদরভাণ্ড, সেই তিনি যখন ননীগোপাল সেজে ননীলোলুপ হয়ে ওঠেন, তখন যশোদাকে মুশকিলে পড়ে ও-ধর্ম ছেড়ে বিপরীত ধর্ম গ্রহণ করতে হয়, দায়ে পড়ে তখন ননীগোপালকে খুঁটির সঙ্গে বাঁধতে হয়। পৃথিবীতে মানুষ মাত্রেই যে ব্রহ্মাণ্ড ভণ্ডোদর বিষয়-গোপাল-বিপদ যে ওইখানে।
অমলের কথার ভঙ্গিতে সবাই হাসিল, হাসিল না কেবল অহীন্দ্র, সে যেমন গম্ভীর মুখে অবসন্ন ভঙ্গিতে ডেক-চেয়ারে এলাইয়া পড়িয়া ছিল, তেমন ভাবেই রহিল। হেমাঙ্গিনী হাসিতে হাসিতে বলিলেন, তুই কিন্তু ভারী জ্যাঠা হয়েছিস অমল।
অহীন্দ্র চোখ বুজিয়াই ঘাড় নাড়িতে নাড়িতে বলিল, তুমি ভুল বুঝেছ অমল, মায়ের ধর্ম যশোদার ধর্ম নয়, মায়ের ধর্ম গান্ধারীর ধর্ম। দাদার গুলিতে যখন ননী পাল মল, তখন মা ননী পালের জন্যে কেঁদেছিলেন, কিন্তু দাদার দ্বীপান্তরের হুকুম যেদিন হল, এক ফোঁটা চোখের জল তিনি ফেলেন নি। শুধু পাথরের মূর্তির মত বসে রইলেন।
লজ্জা এবং দুঃখ একই সঙ্গে সুনীতিকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিল। হেমাঙ্গিনী বলিলেন, সেই তো বাবা, হাজার অপরাধ করলেও তোমার মা কখনও কারও ওপর রাগ করেন না। অন্যায় করেও কেউ দণ্ড পেলে তোমার মা তার জন্যে কাঁদেন। সেই মায়ের ছেলে তুমি, রাগ করা তো তোমার সাজে না।
অহীন্দ্র নীরবে কিছুক্ষণ চিন্তা করিয়া বলিল, হ্যাঁ, রাগ করাটা আমার অন্যায় হয়েছে। কিন্তু রাগ তো আমি ইচ্ছে করে করি নি, হঠাৎ যেন কেমন হয়ে গেলাম আমি। তা নইলে অত্যাচার অবিচার কোথায় নেই বলুন? ধনী দরিদ্রও পৃথিবীর সর্বত্র, অত্যাচার অবিচারও সর্বত্র। কজনের ওপর রাগ করব?
হেমাঙ্গিনী বলিলেন, না না না, তা বললে চলবে কেন? যতটুকু তোমার আয়ত্তের মধ্যে, তার ভেতর অন্যায়ের প্রতিকার করতে হবে বৈ কি। আর সে হবেও। লোকটিকে ভালমত শিক্ষা দেবার জন্যে উনি উঠে পড়ে লেগেছেন। তবে আমাদের তরফ থেকে যাতে অন্যায় না হয়, সেজন্যে আমি বার বার করে বলেছি। বলেছি, ও লোকটি অন্যায় করেছে, তাকে শাস্তি দিতে হলে ন্যায়পথে চলে শাস্তি দিতে হবে, কৌশল অবলম্বন করতে পারবে না।
অহীন্দ্র এ কথার কোন জবাব দিল না, নীরবে চোখ বুজিয়া চেয়ারে হেলান দিয়া শুইয়া রহিল। হেমাঙ্গিনী বলিলেন, মাথা কি এখনও ধরে রয়েছে তোমার? এক কাজ কর, ওডিকোলনের একটা পটি দাও কপালে, না হয় পিপামেন্ট জলে গুলে কপালে বুলিয়ে নাও। তারপর সুনীতির দিকে ফিরিয়া বলিলেন, চল, আমরা যাই, একবার চক্রবর্তী মশায়ের সঙ্গে দেখা করে আসি চল।
সুনীতি গভীর চিন্তায় দিশাহারা হইয়া বলিলেন, আমার বড় ভয় দিদি। ওই চরটা সর্বনাশা চর; যখনই চর নিয়ে কোন হাঙ্গামা বাধে, আমার বুক থরথর করে কেঁপে ওঠে। অহি আবার চর নিয়ে যে কি করবে, ওর ভাবগতিক আমার ভাল লাগল না দিদি। কেমন উদাসী মন হয়ে গেছে দেখলেন!
হেমাঙ্গিনী হাসিয়া বলিলেন, ও তুমি কিছু ভেবো না সুনীতি, ও সব ঠিক হয়ে যাবে। উমার আমার স্বামীভাগ্য খুব ভাল; তাছাড়া উমা একালের লেখাপড়া জানা চালাক মেয়ে। বিয়ে হোক না, কেমন মন-উদাসী থাকে, দেখব। দেখবে? এক্ষুনি বাবার মন ভাল করে দিচ্ছি বলিয়াই তিনি উচ্চকণ্ঠে ডাকিলেন, অমল!
অমল আসিতেই বলিলেন, একটা কাজ যে ভুলেছি বাবা! এক্ষুনি তোকে বাড়ি যেতে হবে, গিয়ে স্যাকরাকে বলে পাঠাতে হবে যে, উমার রুলির প্যাটার্নটা অন্য রকম হবে; আজই সেটা আরম্ভ করার কথা, সেটা যেন আজ আরম্ভ না করে। কাল সকালে আমার কাছে এলে আমি সব বুঝিয়ে দেব। তিনি ইচ্ছা করিয়াই অহীন্দ্রের নিকট হইতে সরাইয়া অমলকে বাড়ি পাঠাইয়া দিলেন।
অমল চলিয়া গেল; হেমাঙ্গিনী ওডিকোলনের জল তৈয়ারি করিয়া ডাকিলেন, উমা!
উমা মানদা ঝির পাল্লায় পড়িয়াছিল, ভাবী বউদিদিকে মানদা ছোটদাদাবাবুর বাল্যকালের কথা বলিয়া নিজের গুরুত্ব এবং প্রবীণত্বের দাবি প্রতিষ্ঠিত করিতেছিল। উমারও শুনিতে মন্দ লাগিতেছিল না। মায়ের আহ্বান শুনিয়া সে উপরে আসিয়া সুনীতি ও হেমাঙ্গিনীর সম্মুখে দাঁড়াইল। হেমাঙ্গিনী বলিলেন, এই ওডিকোলনের জলটা আর এই ন্যাকড়ার ফালিটা দিয়ে আয় তো মা। আমরা দুজনে চক্রবর্তী মশায়ের ঘরে যাচ্ছি। তুই বরং ন্যাকড়াটা ভিজিয়ে কপালে একটা পটিই লাগিয়ে দিয়ে আসবি। বড্ড মাথা ধরেছে অহির।
