Ill fares the land, to hastening ills a prey
Where wealth accumulates, and men decay,
Princes and lords may flourish, or may fade
A breath can make them, as a breath has made;
But a bold Peasantry, their country’s pride
When once destroyed, can never be supplied.
অহীন্দ্রেরও মনে পড়িয়া গেল। স্মৃতি-স্মরণের মধ্যে আবৃত্তি করিতে করিতে অস্কুটম্বরে আবৃত্তি করিয়া উঠিল–
His best companions, innocence and health,
And his best riches, ignorance of wealth.
ঠিক ঐ সাঁওতালদের ছবি। ওদের বাঁচাতেই হবে অমল, bold Peasantry কে রক্ষা করতেই হবে।
অমল বলিল, চল, আজ বাবাকে গিয়ে বলি। বাবাও লোকটার উপর খুব চটে আছেন। কালিন্দীর ওই বাঁধটা, ওই যে পাম্প করে জল তুলছে, ওটা নিয়ে বোধ হয় শিগগিরই একটা গোলমাল হবে। ফৌজদারিই হবে বলে মনে হচ্ছে।
অহীন্দ্র বার বার ঘাড় নাড়িয়া অস্বীকার করিয়া বলিল, নো নো অমল, নট অ্যাজ এ প্রিন্স অর এ লর্ড, জমিদার বা ধনী হিসেবে নয়। মানুষ হিসেবে মানুষের দুঃখ দূর করতে হবে। জমিদার আর কলওয়ালার তফাৎ কোথায়?
অমল বিস্মিত হইয়া অহীন্দ্রের মুখের দিকে চাহিয়া রহিল। কিছুক্ষণ নীরবে বসিয়া থাকার পর নদীর বালির উপর অর্ধশায়িত হইয়া অহীন্দ্র যেন আপনাকে এলাইয়া দিল, এমন আকস্মিক উগ্র উত্তেজনার ফলে তাহার দেহ ও মন যেন বিপর্যস্ত হইয়া পড়িয়াছে।
অমল বলিল, এ কি, শুয়ে পড়লে যে। চল, বাড়ি চল।
অহীন্দ্র ক্লান্তির একটা গভীর দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিল, চল।
.
২৮.
অমলের মুখে অহীন্দ্রের মাথা ধরার সংবাদ এবং অপরাহ্নের সমস্ত ঘটনার কথা শুনিয়া হেমাঙ্গিনী মাত্রতিরিক্তরূপে চিন্তিত হইয়া উঠিলেন। রায় তর্পণের আসনে নীরবে জপে ব্যাপৃত ছিলেন, তাঁহার সম্মুখে বসিয়াই কথা হইতেছিল, তাঁহার ধ্যানগম্ভীর মুখে একটু মৃদু হাসি ফুটিয়া উঠিল; বিশেষ একটা উপলব্ধির ভঙ্গিতেই হাসির মৃদুতার সহিত সমতা রাখিয়া মাথাটি বার কয়েক দুলিয়া উঠিল।
হেমাঙ্গিনী বলিলেন, অহীনের তো রাগ কখনও দেখি নি। ওর স্বভাব হল ওর মায়ের মত। অমল হাসিয়া বলিল, পূর্বে কখনও রাগ হয় নি বলে পরে কখনও রাগ হতে পারে না, এ তোমার অদ্ভুত যুক্তি মা!
হেমাঙ্গিনী দৃঢ় স্বরে বলিলেন, না, রাগ করতে পারে না। এমন মায়ের ছেলে সে কারও ওপর রাগ করবে কেন? সুনীতির দয়ামায়ার কথা তোরা জানিস, গোটা পৃথিবীর ওপর তার মায়া ছড়ানো আছে। তার ছেলে–
মায়ের স্বভাব কন্যার প্রাপ্য, গিন্নী, ছেলে পাবে পৈতৃক স্বভাব। তুমি ভুলে যাচ্ছ কেন, অহীন্দ্র হল শাক্ত জমিদার-বংশের সন্তান! তার স্বভাব হবে সিংহের মত। দুর্বলকে সে স্পর্শ করবে না, যুদ্ধ হবে তার সবলের সঙ্গে। অহীন্দ্রের তেজস্বিতায় আমি খুব খুশি হয়েছি। তারা, তারা মা!–রায়ের জপের এক পর্যায় শেষ হইয়াছিল, সেই অবসরে তিনি এই কথা কয়টি বলিয়া কারণ-পাত্র পুনরায় পূর্ণ করিয়া লইয়া ক্রিয়া আরম্ভ করিলেন।
হেমাঙ্গিনী কিন্তু অপ্রসন্ন হইয়া উঠিলেন, স্বামীর কথাগুলি তাঁহার ভাল লাগিল না। বলিলেন, তোমাদের ওই এক ধারার কথা। শাক্ত জমিদার-বংশের ছেলে হলে তাকে রাগ করে মাথা-ধরাতে হবে, কিংবা দাঙ্গাহাঙ্গামা করতে হবে কেন শুনি? এমন কিছু শাস্ত্রের নিয়ম আছে নাকি?
ক্রিয়ায় নিযুক্ত রায় কোন উত্তর দিতে পারিলেন না, কিন্তু মুখে তাঁহার মৃদু হাসির রেখা ফুটিয়া উঠিল। হেমাঙ্গিনী বলিলেন, ওদের গুষ্টির রাগকে আমার বড় ভয় করে বাপু। ওর বাপের রাগের সে থমথমে মুখ মনে হলে হাত-পা যেন গুটিয়ে আসে।
রায়ের মুখও গম্ভীর হইয়া উঠিল। হেমাঙ্গিনী বলিয়াই চলিয়াছিলেন, অহীনের এখন থেকে এ-সব মাথা ঘামানোই বা কেন? সে এখন পড়ছে পড়ে যাক। বিষয়-সম্পত্তির ব্যাপার, তুমি রয়েছ, যেমনই অসুস্থ হোন তার বাপ রয়েছেন, সে-সব তাঁরা যা হয় করবেন।
বলিয়াই তিনি উঠিয়া দাঁড়াইলেন, অমলকে লক্ষ্য করিয়া বলিলেন, চল, তুই আমার সঙ্গে চল, একবার দেখে আসি, আর বলে আসি। উমিটা কোথায় গেল? সেও চলুক।
***
অহীন্দ্র একখানা ডেক-চেয়ারে চোখ বুজিয়া ক্লান্তভাবে হেলান দিয়া শুইয়া ছিল। পদশব্দে চোখ খুলিয়া সে দেখিল; তাহার মা, এবং মায়ের পিছনে হেমাঙ্গিনী ও অমল! ব্যস্ত হইয়া সে উঠিবার উপক্রম করিল, হেমাঙ্গিনী বলিলেন, না, না, উঠতে হবে না। তোমার শরীর খারাপ হয়ে রয়েছে, শুয়ে থাক তুমি। তারপর, তুমি নাকি এত রাগ করেছিলে যে, তোমার মাথা ধরে উঠেছে? ছি বাবা, রাগ চণ্ডাল, তাকে এত প্রশ্রয় দিও না। যে-মায়ের ছেলে তুমি, তাতে রাগ তোমার শরীরে থাকাই উচিত নয়।
অহীন্দ্র দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিল, আপনারা জানেন না, কি অমানুষিক অত্যাচার ওই কলওয়ালাটি করেছে ওই নিরীহ সাঁওতালদের ওপর।
হেমাঙ্গিনী বলিলেন, বেশ তো, তার জন্য তোমার বাবা রয়েছেন, তোমার–। বলিয়াই তিনি হাসিয়া ফেলিলেন, হাসিতে হাসিতে বলিলেন, মামা বলা তো আর চলবে না, শ্বশুর বলতে হবে; তাই বলি, তোমার শ্বশুর রয়েছেন, তাঁরা তার প্রতিকার নিশ্চয় করবেন। গরিব প্রজা, তাদের বাঁচাতে হবে বই কি। এটা তো জমিদারের ধর্ম। যত কিছু দোষ রায়-হাটের বাবুদের থাক, ও-ধর্ম তাড়া কখনও অবহেলা করেন না। তোমার এখন পড়ার সময়, তুমি লেখাপড়া কর।
