রানু বলিল–খাচ্ছিস না যে? খা–
কাজল বলিল–রানুপিসি, আমার বাবা এই গ্রামকে প্রাণেব মতো ভালোবাসতেন, তাব লেখাতেও এই গ্রামকে অমর করে রেখে গিয়েছেন। আমিও এক্ষুনি বুঝতে পারলাম আমাকেও একদিন আবার এখানে ফিরে আসতে হবে। তুমি দেখো, আমি ঠিক নিশ্চিন্দিপুবে এসে বাস করবো।
রানু যেন কেমন অবাক হইয়া কাজলের দিকে তাকাইল, তারপর বলিল—তোর বাবাও গাঁ ছেড়ে যাবার সময় ঠিক এই কথা বলে গিয়েছিল, কিন্তু কথা রাখে নি—
-বাবা যে অল্পবয়েসেই চলে গেল পিসি, নইলে ঠিক ফিরে আসত—
–তুই সত্যি আসবি? সত্যি করে বলছিস?
-–ঠিক আসবো পিসি। দেরি হবে হয়তো, কিন্তু সত্যি আসবো। আর—
কাজল চুপ করিয়া আছে দেখিয়া রানু বলিল—আর কী?
—তুমি ততদিন বেঁচে থেকো পিসি। নইলে আমার ফিরে আসবার মানে থাকবে না। কার কাছে, কার জন্য ফিরে আসবে বলো? কেউ তো নেই, যারা আছে তারাও বন্ধু নয়—
রানু বলিল—হারে, তোদর ভিটের চারপাশের জমিগুলো নাকি চনু ঘিরে নিচ্ছে? সত্যি?
–হ্যাঁ পিসি। কে ঘিরহে জানতাম না, খবর পেয়ে এসেছিলাম, এসে দেখি চনুর কাণ্ডচনু তোর ছোটবেলার বন্ধু না?
একসঙ্গে খেলতাম, খুব বন্ধুত্ব ছিল দুজনের।
-তোর সঙ্গে দেখা হয়েছে? কী বলল?
—এখনও দেখা হয়নি। এসেই যখন খবর পেলাম যে চনু জমি ঘিরছে, তখন ভাবলাম আগে ওর কাছেই যাই, দেখি ওর কী বলার আছে। তা ডাকাডাকি করতে চনুর ছেলে বেরিয়ে এসে বলল—বাবা বাড়ি নেই, বৈরামপুর গিয়েছে। কাল সকালে আর একবার যাবো
সামান্য বিশ্রাম করিয়া কাজল বলিল–পিসি, যাই একবার আমাদের ভিটের দিক থেকে ঘুরে আসি। ফিরে এসে চা খাবো। আজ সন্ধেবেলা চালভাজা খাওয়াবে পিসি? অনেকদিন খাইনি
কথাটা সম্পূর্ণ সত্য নয়। মালতীনগরে রোজ সে চালভাজা খায় না সত্য, কিন্তু ইচ্ছা হইলেই মাঝে মাঝে সে মাকে বলে। হৈমন্তী ছেলের জন্য কাঠখোলায় চাল ভাঙ্গিয়া দেয়। আসলে সে জানে কোন আরদার করিলে রানুপিসি খুশি হইবে। রানু বলিল—একটু দাঁড়া, কাপড়টা বদলে নিই, আমিও তোর সঙ্গে যাবে।
বাঁশবাগানের ভিতর দিয়া পথ। বেলা এখনও বেশ আছে, কিন্তু বাঁশবনের মধ্যে কেমন একটা রহস্যময় আলোছায়ার জগৎ। প্রাণের শিকড় যে জমিতে আছে সেখানে উপস্থিত হইলে মানুষ যুক্তি ভুলিয়া যায়, প্রাচীন ঐতিহ্য রক্তের মধ্যে অশান্ত কল্লোল তোলে। কাজলের মনে হইল প্রতি পা ফেলিবার সঙ্গে সঙ্গে সে এক অদ্ভুত জগতে প্রবেশ করিতেছে-যেখানে সবই সম্ভব। এখুনি সে তাহার ঠাকুমা কিংবা ঠাকুরদাকে দেখিতে পাইবে, তাহার বাবাকে কিশোররূপে খেলা করিতে দেখিতে পাইবে। অনেকদিন আগের সে যুগটা আবার পুরাতন নাটকের মতো তাহার সামনে অভিনীত হইবে। বাহিরের পৃথিবীটা এখানে তাহার বুঢ় প্রভাব বিস্তার কবিতে পারে নাই। এখানে মেঘের ছাযাব মতে, ফুলের হাল্কা গন্ধের মতো, দূরত বাঁশির শব্দের মতো, মায়ের স্নেহের মতো নরম আলোয় পবিবেশ পরিপূর্ণ। সত্য জীবন এখানেই বিকশিত, যে জীবন হাজার বছর ধরিয়া নির্জনে শান্ত স্রোতস্বিনীর মতো প্রবাহিত।
রানু বলিল—ঠিক এইখানটায় ছিল তোদর খিড়কির দরজা। তোর ঠাকুমা ঘুমিয়ে পড়লে দুগগা এই দরজা দিয়ে পালিয়ে আসত, আমরা পুরোনো দীঘির আমবাগানে বসে গল্প করতাম, তেঁতুল মেখে খেতাম
আবার সেই বুনো গন্ধটা বাহির হইয়াছে, এখানে আসিলেই কাজল যেটা পায়।
বাড়ির সব দেওয়ালই পড়িয়া গিয়াছে, ঢুকিবাব আর কোনো পথ নাই। ঘেঁটু, কালকাসুলে আর আসশেওড়ার জঙ্গলে ভিটা ঢাকা পড়িয়াছে, গাছপালার ফাঁকে ফাঁকে ধ্বংসস্তূপের দু-একখানা ইট দেখা যায়। শান্ত অপরাহু। ওপাশের সজিনা গাছের ডালে বসিয়া কী একটা পাখি ডাকিতেছে।
কাজলের বুকের ভিতরটা অদ্ভুত এক অনুভূতিতে ভরিযা উঠিল। তাহার পিতা-পিতামহপ্রপিতামহ যেন মহাকালের স্রোতে কোথায় ভাসিয়া গিয়াছে, তেমনই একদিন সেও কোথায় অনির্দেশ্য ভবিষ্যতের অলিন্দপথে মিলাইয়া যাইবে। আজকের আনন্দ, ভালোবাসা, ওই নাম-না-জানা পাখিটা, সামান্য কয়েককাঠা জমি লইয়া বাল্যবন্ধুর ষড়যন্ত্র—এসব কোথায় থাকিবে সেই দূর ভবিষ্যতে?
থাকিবে বিশুদ্ধ আনন্দ আর থাকিবে মহাজীবন। সে থাকিবে না, মহাজীবন থাকিবে।
সন্ধ্যার পর চনুর সঙ্গে দেখা হইল। তাহার কথাবার্তার ধরনে কাজলের দৃঢ় বিশ্বাস হইল সে মিথ্যাকথা বলিতেছে। সে বৈরামপুর যায় নাই, বাড়িতেই ছিল। কাজল যে খবর পাইয়া হঠাৎ আসিয়া পড়িবে, এটা সে ভাবে নাই, কাজেই কী বলিবে তাহা ঠিক করিবার জন্য দেখা করিবার সময়টা পিছাইয়া দিতেছিল।
শুক্লপক্ষ। চমৎকার জ্যোৎস্নায় চারদিক মায়াময় দেখাইতেছে। এমন সুন্দর পরিবেশে কাজল চনুর সঙ্গে বৈষয়িক আলোচনায় বসিল। কাজল জিজ্ঞাসা করিল—কেমন আছিস বল, অনেকদিন দেখা হয় না—
–ওই একরকম। আমাদের আবার থাকা! তোমরা শহরে বড়ো বড়ো ব্যাপার নিয়ে থাকো, তোমাদের ব্যাপারই আলাদা। আমরা ভাই গাঁয়ের মানুষ খেটে খেতে হয়, আমাদের দুঃখ তোমরা বুঝবে না–
চনুর ঠেস দেওয়া কথার ধরনে কাজলের মনটা খারাপ হইয়া গেল। একটু কুশল প্রশ্ন নাই, কিছু নাই, বহুদিন পর প্রথম দেখায় শৈশবের বন্ধুর মুখে এসব কী কথা? আর শহরে থাকে বলিয়া সে কি শ্রম করে না? হয়তো মাঠে চাষের কাজ করে না, কিন্তু যে কাজ সে করে তাহাতে যথেষ্ট পরিশ্রম করিতে হয়। যাহার যা কাজ!
সে বলিল—তুই আমাকে তুমি করে কথা বলছিস যে বড়ো? আমরা ছোটবেলার বন্ধু না?
