বাবার আগুনের মতো রঙ, বড়ো বড়ো চোখ, লম্বা উন্নত চেহারা।
বনের মধ্যে আলো পড়িয়া আসিতেছে।
বহু পিছনে ফেলিয়া আসা শৈশবের সেই দিনটা আর একবার ফিরিয়া আসে না?
কোনদিকে কেহ নাই। নির্জন বনভূমিতে আশ্চর্য অলৌকিক সন্ধ্যা নামিতেছে। একটা বড়ো অর্জুনগাছের নিচে একখানি শিলাখণ্ডের ওপর সে বসিল। অনেকদিন পরে এমন নির্জনতা সে উপভোগ করিতেছে। পৃথিবীর সমস্ত বড়ো শিল্প, তা সে সাহিত্যই হউক বা সংগীত কিংবা দর্শকই হউক, জন্ম লইয়াছে এই নির্জনতা, একাকীত্ব আর যন্ত্রণা হইতে। সে আজকাল বড়ো বেশি শহুরে হইয়া পড়িয়াছে। কোথায় গেল হোটবেলার সেই সহজ আনন্দ, সেই দিগন্তবিস্তীর্ণ মাঠ, আলোর মধ্যে আরও এক আলো, চোখের মধ্যে আরও এক চোখ? জীবনকে সার্থক করিবার জন্য কী করিতেছে সে? হ্যাঁ, কিছু ভালো ভালো বই পড়িতেছে বটে, কিন্তু এই বিশাল বিশ্বজগৎটার দৃশ্যমান কর্মকাণ্ডের আড়ালে যে রহস্যময় শক্তি ক্রিয়াশীল, তাহার কতটুকু জানা হইল? সময় বড়ো কম, প্রতিদিন একদিন করিয়া সময় কমিয়া আসিতেছে।
কিছু করিতে হইবে না–ব্ল্যাকবোর্ডে বড়ো বড়ো দুর্বোধ্য অঙ্ক কষিবার প্রয়োজন নাই, ল্যাবোরেটরিতে জটিল যন্ত্র লইয়া নাড়াচাড়া করিবার দরকার নাই, দর্শনের দুরুহ তত্ত্বের জালে জড়াইবার আরশ্যকতা নাই, কেবলমাত্র এইরকম শান্ত পরিবেশে থাকিয়া দুই চোখ ভরিয়া বিশ্বের সৌন্দর্য দেখিলেই চলিবে। জন্ম হইতে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিদিনের বাঁচার ইতিহাস, প্রতি সকালের স্নিগ্ধ আমন্ত্রণ, মায়ের ভালোবাসা, প্রথম প্রণয়ের শিহরণ জাগানো পবিত্র অনুভূতি, মহাকাল ও মহাবিশ্ব সম্বন্ধে গভীর অনুধ্যানএই থাকিলেই চলিবে। দেহের মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী, কিন্তু প্রত্যেক চিন্তাশীল মানুষের উচিত পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নিজের অভিজ্ঞতার ইতিহাস লিপিবদ্ধ করিয়া বাখা। কীর্তিই মানুষকে অমর করে, স্বল্পকালের জীবন নহে।
আলো একেবারেই কমিয়া আসিয়াছে। সন্ধ্যার সময় বনকাটি আর বাসাডেরা পাহাড় হইতে বুনো হাতি নামে। কাজল ফিরিবার পথ ধরিল।
পেছনে শুষ্ক ঝরাপাতার ওপর কাহার যেন পায়ের শব্দ। সে ফিরিয়া তাকাইল। না, কিছু নাইকেহ নয়। হয়তো বাতাস। অথবা অতীত। অতীত তো পেছনেই থাকে।
মাঝে মাঝে একই ধরনের বিপর্যয় মানুষের জীবনের ওপর আসিতে থাকে। মৌপাহাড়ি হইতে ফিরিয়া কাজল খবর পাইল নিশ্চিন্দিপুরে তাহাদের ভিটা ও সংলগ্ন জমি কাহারা বেড়া দিয়া ঘিরিয়া লইতেছে। নিশ্চিন্দিপুরেরই একজন লোক, তাহাকে কাজল চেনে না, সে আসিয়া সংবাদটা দিয়া গেল। কোনো কোনো মানুষ দুঃসংবাদ দেওয়ার সুযোগ পাইলে ভারি খুশি হয় এমনিতে তাহারা কোনো যোগাযোগ রাখে না, কিন্তু কারুকে চিন্তিত করিয়া তুলিবার মতো পরিস্থিতি হইলে একেবারে দৌড়াইয়া আসে।
দিনদুয়েক পরে কাজল নিশ্চিন্দিপুর রওনা হইল। এখন আর আগের মতো অবস্থা নাই, একেবারে গ্রামে ঢুকিবার পথ পর্যন্ত বাস চলিতেছে। পথে-ঘাটে প্রায়ই মোটরগাড়ি দেখা যায়, গ্রামের ছেলেমেয়েরা অবাক বিস্ময়ে ছুটিয়া আসে না। তাহার বাবা কিংবা পিসির মতো আর কি তাহারা রেলগাড়ি দেখিবার জন্য মাঠঘাট ভাঙিয়া আগ্রহে ছুটিয়া যায়? পৃথিবী বদলাইতেছে, মানুষ বদলাইতেছে, সবকিছুই বদলাইতেছে।
গ্রামে পৌঁছাইয়া কাজলের মন আরও খারাপ হইয়া গেল। পরিবর্তন এভাবে পরিচিত জীবনকে গ্রাস করে? নিশ্চিন্দিপুরের সেকালের আর বিশেষ কেহ বাঁচিয়া নাই, যাহারা আছে তাহারাও অনেকেই বিদেশে বাস করে। রানুপিসির বয়েস হইয়া গিয়াছে, চুলে পাক ধরিয়াছে, তবু সমস্ত নিশ্চিন্দিপুরে রানুপিসিই তাহার একমাত্র আশ্রয়—যাহার সঙ্গে বাল্যের একটা সম্পর্ক রহিয়াছে।
কিন্তু গ্রামে জনসংখ্যা বাড়িয়াছে। অচেনা সব লোক। এরা কোথা হইতে আসিল? দুপুরবেলা খাইতে খাইতে প্রশ্নটা সে রানুপিসিকে করিল।
রানু বলিল—আর বলিস না, আমাদের ছোটবেলার সে গা আর নেই, সব পালটে গিয়েছে। দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গ থেকে দলে দলে লোক এসে জমি কিনে গাঁয়ে বাস করছে। যশোর খুলনা ঢাকা বরিশাল—আরও কত সব জেলা থেকে। আমরাই সবাইকে চিনি না, তা তুই চিনবি কোথা থেকে? অত বড়ো কুঠির মাঠ, গিয়ে দেখ তার সব প্রায় ভর্তি–
—বাড়ি উঠেছে?
—সার সার বাড়ি উঠেছে, মুদির দোকান হয়েছে, তিন-চারটে বড়ো পাড়া বসে গিয়েছে, তুই দেখলে আর চিনতে পারবি না—
তাহার পর কিছুটা যেন আত্মগত স্বরে বলিল—তোর পিসি দুর্গা আমার খুব বন্ধু ছিল। দুর্গা আর আমি মাঝেমাঝেই কুঠির মাঠে বেড়াতে যেতাম, জানিস? কত সুন্দর ছিল সে সব দিন! একটা এড়াঞ্চির ঝোপের পাশে বসে দুজনে গল্প কবতাম-বিরাট বড়ো ঝোপ। গতবছর সুন্দরপুর যাচ্ছিলাম তোর পিসেমশাইয়ের এক আত্মীয়ের বাড়িতে, কুঠির মাঠের পাশ দিযেই পথ, দেখলাম আমাদের ছোটবেলার সে ঝোপটা আর নেই, কাবা যেন কেটে ফেলেছে। হয়তো ব্যাপারটা কিছুই না, বুঝলি? কিন্তু তোর বাবা আমার চোখ খুলে দিয়েছিল। হঠাৎ এমন মন-কেমন করে উঠল ঝোপটার জন্য যে কী বলব!
কাজল দেখিল রানুর চোখে জল আসিয়া টলটল করিতেছে।
কাজলের গলায় ভাত আটকাইয়া যাইতে লাগিল। রানুপিসির কাছে যেন তাহার এবং তাহার বাবার শৈশব জমা রহিয়াছে। কত স্মৃতি, বাবার কাছে শোনা কত গল্প, কত তুচ্ছ হাসিকান্নার মালায় গাঁথা বিস্মৃত অতীতদিন! সে বুঝিতে পারিল, পৃথিবীতে যেখানেই সে বাস করুক না কেন, আসলে তাহার আশ্রয় এই গ্রামে।
